ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় এভাবেই ক্যাম্প করে বাস করছিলেন অবিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ ফাইল ছবি: ইয়োহান গিরালট/এপি/পিকচার এলায়েন্স
ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলে প্রচণ্ড ঠান্ডায় এভাবেই ক্যাম্প করে বাস করছিলেন অবিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ ফাইল ছবি: ইয়োহান গিরালট/এপি/পিকচার এলায়েন্স

২০২০ সালের নভেম্বরে ডয়চে ভেলের সংবাদকর্মীরা বসনিয়ার ভেলিকা ক্লাদুসা এলাকা পরিদর্শনকালে দেশটির সীমান্তবর্তী জঙ্গলে আটকে থাকা প্রায় ছয়শ বাংলাদেশির অবর্নণীয় কষ্টের কথা তুলে ধরেছিলেন৷

বসনিয়ার ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত সংলগ্ন ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গল, সেখানকার মিরাল ক্যাম্প ও আশেপাশের পরিত্যাক্ত ভবনে দেড় বছর আগে প্রায় ছয়শ বাংলাদেশিসহ অনেক অভিবাসী ছিলেন৷ সে জায়গাটিতে এখন আর কেউ নেই৷ বছর দেড়েকের মধ্যে কোথায় গলেন এই অভিবাসীরা?

গত কয়েক বছর ধরে ঝুকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌছার চেষ্টা করছেন৷ অভিবাসন বিষয়ে ইউরোপের সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টস-এর তথ্যমতে, গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি জমানো অভিবাসীদের শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা৷ 

এসকল অভিবাসীদের একটি বড় অংশই ইটালি পৌঁছার চেষ্ট করে থাকেন৷ ইউরোপের বহিঃসীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রনটেক্স-এর এই হিসাবে ঝুঁকিপূর্ণ উপায়ে অবৈধভাবে ইটালি প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশিরা রয়েছেন দ্বিতীয় অবস্থানে৷  

ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পৌঁছার লক্ষ্যে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অস্থায়ী ক্যাম্পে আটকে আছেন এমন অনেক বাংলাদেশি৷ সেখানকার সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে বসনিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শন করছেন ডয়চে ভেলে বাংলার সাংবাদিক আরাফাতুল ইসলাম ও অনুপম দেব কানুনজ্ঞ৷ 

তারই অংশ হিসেবে বসনিয়ার সীমান্ত সংলগ্ন ভেলিকা ক্লাদুসার জঙ্গলটি পরিদর্শনে গেলে ডয়চে ভেলের সাংবাদিকদের সাথে দেখা হয় কয়েকজন বাংলাদেশির৷ 

দেড় বছর আগে যখন ডয়চে ভেলের বাংলার সাংবাদিকেরা এ জঙ্গলটিতে যান তখন শত শত বাংলাদেশির সাথে তারাও ছিলেন এই সেখানে৷ 

এ দুই বাংলাদেশির দাবি, জঙ্গলটিতে থাকা ছয়শ বাংলাদেশির প্রায় সবাইই ইতিমধ্যে ইটালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন৷ 


সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের একজন আশরাফুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওরা তো সবাই চলে গেছে৷ ইটালি, ফ্রান্সে চলে গেছে৷ কেউ কেউ ট্যাক্সি গেইমে, কেউ কেউ হেঁটে হেঁটে চলে গেছেন৷’’

অভিবাসীদের ভাষায়, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পছন্দমতো রাষ্ট্রে পৌঁছানোর নাম ‘গেইম’৷ সীমান্ত পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দেয়ে এভাবে অবৈধভাবে পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াটিকে তারা ‘গেইম মারা’ বলে থাকেন৷  

জানা গেছে, এমন ‘গেইম মারতে’ গিয়ে তারা পাচারকারীদের সহায়তা নেন৷ কেউ কেউ আবার নিজের চেষ্টায়ই এমন ঝুঁকি নিয়ে থাকেন৷ 

জঙ্গলে আটক থাকা প্রায় ছয়শ বাংলাদেশির মধ্যে আর মাত্র নয়জন আছে জানিয়ে আশরাফুজ্জামান বলেন, তিনি নিজেও ‘৩০-৩৫ বার এমন গেইম মারতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন৷’

যারা ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশে পৌঁছেছেন তাদের সাথে যোগাযোগ হয় কি না জানতে চাইলে আশরাফুজ্জামান বলেন, তাদের অনেকের সাথেই তার যোগাযোগ হয় এবং তারা ভাল আছেন৷ 

তবে তাদের অনেকেই দেশ থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে না পারার কারণে ঝামেলায় আছেন বলে দাবি তার৷    

নিজে ‘গেইম মারতে’ শিখে গেছেন

ইটালি পৌঁছার লক্ষ্যে আশরাফুজ্জামান বসনিয়া থেকে প্রায় দেড় বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন৷ প্রথম দিকে দালালদের সহায়তায় গেইম মারার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন৷ এক পর্যায়ে নিজেই গেইম মারতে শুরু করেন বলে জানান তিনি 

‘‘ইটালিতে পৌঁছার লক্ষ্যে বসনিয়া থেকে দালালদের সহায়তায় ১০ - ১৫ বার গেইম মারার চেষ্টা করেছি৷ যাইতে যাইতে শিখে গেছি কীভাবে যাইতে হয়৷ মোবাইলে লোকেশন দেখে হেঁটে হেঁটে চলে যাই৷’’    

তবে ‘গেইম মারতে’ গিয়ে বার বারই স্লোভেনিয়াতে আটকে গেছেন তিনি৷ যে কারণে এত বার চেষ্টার পরও ইটালি পৌঁছাতে পারছেন না৷  

‘‘আমি বেশিরভাগই স্লোভেনিয়াতে ধরা খাইছি৷ স্লোভেনিয়াতে গাড়িতে উঠতে গিয়ে, গাড়িতে উঠার আগেই পুলিশ এসে, আবার কুকুর এসে ধরে ফেলছে৷’’

জানা গেছে, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া পুলিশ সীমান্ত পাহারায় তৎপর রয়েছে৷ পুলিশের হাতে ধরা পড়লে নানা ধরনের নির্যাতনের মুখেও পড়তে হয় বলে দাবি অভিবাসীদের৷  

কেন জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন তারা?

আট বছর ধরে ইউরোপে পৌঁছার চেষ্টা করছেন বাংলাদেশের রাজু৷ বর্তমানে আটকে আছেন বসনিয়াতে৷ ২০১৪ সালে তিনি বাংলাদেশ ত্যাগ করে আড়াই বছর ওমানে থাকার পর চার বছর ইরানে কাটান৷

কেন আট বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ এমন চেষ্টা- জানতে চাইলে তিনি বলেন ‘‘টেকা পয়সা কম, আছে কষ্ট৷ তারপর ফ্যামিলিরে দিলেও হয় না, নিজেরও হয় না৷ এ কারণে এই পথে রওয়ানা দিছি৷’’ 

আট বছর ধরে এতো কষ্ট করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপে পৌছার চেষ্টা করার কি দরকার- এমন প্রশ্নের জবাবে রাজু বলেন, ‘‘ফ্যামিলিকে সুখে রাখতে গিয়ে কষ্ট করা লাগে৷ বাংলাদেশে তো কাজ নাই যে তাদেরকে কাজ করে খাওয়াব৷ এ কারণেই এই পথে আসা৷’’

আর আশরাফুজ্জামান জানান, ২০১৮ সালে তিনি ইউরোপের পথে যাত্রা শুরু করেন৷ যাত্রাপথের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি জানান, প্রায় প্রায় ৫-৬ লাখ টাকা খরচ করে তিনি বসনিয়া এসেছেন৷ চার বছর আগে যাত্রার শুরু করে তিনি ওমান থেকে ইরান হয়ে তুরস্কে পৌঁছান৷ তুরস্ক থেকে গ্রিস হয়ে সার্বিয়া এবং সবশেষ তিনি বসনিয়া এসে পৌঁছান৷

কেন জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে আশরাফুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশে যদি ব্যবস্থা ভালো হতো তাহলে তো আসা লাগত না৷ মাস্টার্স পাশ করেও কাজ পাওয়া যায় না৷ তরুণেরা নিজে ঠিকে থাকবে বা ফ্যামিলিকে ঠিক রাখবে সেই ব্যবস্থা নেই৷’’

আরাফাতুল ইসলাম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন