বসনিয়ার সবচেয়ে বড় অভিবাসী ক্যাম্প ব্লাজুয়-এ ডয়চে ভেলে বাংলার প্রতিবেদক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ
বসনিয়ার সবচেয়ে বড় অভিবাসী ক্যাম্প ব্লাজুয়-এ ডয়চে ভেলে বাংলার প্রতিবেদক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

বসনিয়ার সবচেয়ে বড় অভিবাসী ক্যাম্প ব্লাজুয়-এ (নিউ ক্যাম্প) এখনো রয়েছেন ১০০-এর কাছাকাছি বাংলাদেশি৷ এদের মধ্যে রয়েছেন ক্রোয়েশিয়া সীমান্তে আহতদের কয়েকজন৷ নিউ ক্যাম্প থেকে ডয়চে ভেলে বাংলার প্রতিবেদকের বিশেষ প্রতিবেদন৷

সিলেটের নবীগঞ্জে বড় হয়েছেন সায়েম সিদ্দিকী৷ এখন তিনি রয়েছেন বসনিয়ার ব্লাজুয়-এর অভিবাসী ক্যাম্পে৷ এই ক্যাম্পটি নিউ ক্যাম্প নামে বেশি পরিচিত৷ পায়ে মারাত্মক চোট পেয়েছিলেন এই বাংলাদেশি যুবক৷ ক্রোয়েশিয়ায় পুলিশের অত্যাচারে পা ভেঙে গিয়েছিল৷ হাঁটতে গেলে এখনও ক্রাচ লাগছে৷ কোনোমতে খুঁড়িয়ে হাঁটাচলা করছেন৷ কিন্তু বাংলাদেশে স্নাতকোত্তর সায়েম বসনিয়ায় এলেন কেন? এই প্রশ্নের উত্তরে ডয়চে ভেলে বাংলাকে তিনি বলেন, ‘‘দেশে বিসিএস পরীক্ষা দিয়েছি৷ অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু চাকরি পাইনি৷ এত শিক্ষিত বেকার পড়ে রয়েছে দেশে৷ চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে আমি ক্লান্ত৷’’

কীভাবে বসনিয়ার ক্যাম্পে?

সায়েম জানান, ছাত্র ভিসায় তুরস্কে এসেছিলেন তিনি৷ তবে ওখানে বাস করা কঠিন৷ তাই বসনিয়ার ব্লাজুয়-এ শিবিরে আসা৷ গ্রিসেও সামান্য কয়েকদিন কাজ করেছিলেন তিনি৷ কিন্তু থাকার জন্য নথি মেলেনি৷ দূতাবাস ফিরিয়ে দিয়েছে বারবার৷ গ্রিসে বাংলাদেশিরা আতঙ্কে রয়েছে৷

তিনি বলেন, ‘‘দুই সরকার সমঝোতা করুক৷ গেম মারা খুব কষ্ট৷ আমার উদ্দেশ্য ছিল ইটালিতে যাওয়া৷ গেমের মারাত্মক কষ্ট৷ চার থেকে পাঁচ দিন শুধু পানি খেয়ে থেকেছি৷ ক্রোয়েশিয়ায় ‘স্টে পেপার’ চেয়েও মেলেনি কিন্তু যে নির্যাতনের শিকার হয়েছি৷ আমার আর কিছু বলার নেই৷’’

কেন ঝুঁকি?

সইমের বক্তব্য, জীবিকার জন্য ঝুঁকি নিচ্ছেন তারা৷ সব পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভাল না৷ নিকটাত্মীয়রা ইউরোপে আসতে চাইলে তাদের বৈধ ভিসায় আসার পরামর্শ দেন তিনি, গেম মেরে নয়৷ গ্রিসের সঙ্গে বাংলাদেশের চুক্তির কথাও উল্লেখ করেন সইম৷ 

১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ইটালির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন সইম৷ তার কথায়, টাকা ধার দেনা করে ইউরোপে চলে আসেন কেউ, কেউ বা জমি বিক্রি করে দেন, আত্মীয়দের সাহায্য নেন৷ তার বক্তব্য, বসনিয়ার মানুষজন তুলনামূলকভাবে অনেক ভাল৷ বাংলাদেশের কয়েকজনের মাধ্যমে তাই বসনিয়ার নিউ ক্যাম্পে পৌঁছেছেন৷ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম তাদের অনেক সাহায্য করেছে৷ তার পায়ে অস্ত্রোপচার হয়েছে, নিয়মিত খোঁজখবরও নেয়া হয়৷ তবে সুস্থ হলে আবার ইটালি যাওয়ার ঝুঁকি নেবেন তিনি৷ 




গত কয়েক বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে পৌঁছার চেষ্টা করছেন৷ অভিবাসন বিষয়ে ইউরোপের সংবাদমাধ্যম ইনফোমাইগ্রেন্টস-এর তথ্যমতে, গত বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের প্রথম ছয় মাসে অবৈধপথে ইউরোপে পাড়ি জমানো অভিবাসীদের শীর্ষে রয়েছেন বাংলাদেশিরা৷

সিলেটের আলমগীরও রয়েছেন নিউ ক্যাম্পে৷ বসনিয়া পৌঁছানোর আগে ওমানে মাস চারেক ছিলেন তিনি৷ এখন রয়েছেন নিউ ক্যাম্পে৷ তিনি ডয়চে ভেলে বাংলাকে জানান, ‘‘স্পিড বোর্টে ইরান, তুরস্ক, গ্রিস হয়ে সার্বিয়া হয়ে দুই বছর লাগল এখানে আসতে, তবু ইটালি যেতে পারিনি৷ ২২ বার ধরা পড়েছি৷ পুলিশ খুব মেরেছে৷ গেম মেরে আসার চেষ্টা করেছি৷ এখানে শিবিরে বিশ্রাম নিচ্ছি৷’’

মোহাম্মদ সালাহ চৌধুরী মাস ছয়েক হল এসেছেন বসনিয়ার এই ক্যাম্পে৷ তিনি জানান, এখানে ১০০ জনের কাছাকাছি বাংলাদেশি রয়েছেন৷ পুলিশের অত্যাচারের অভিযোগ এনেছেন তিনিও৷ তিনি ডয়চে ভেলে বাংলাকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশি, আফগান, পাকিস্তানি সবাইকে অত্যাচার করে ক্রোয়েশিয়ার পুলিশ৷ তবে বসনিয়ার লোকজন খুব ভাল৷ তারা আমাদের জুতা, গরম পোশাক দিয়েছে৷’’ 

ছয় থেকে আটটা গেমের ঝুঁকি নিয়েছেন তিনিও৷ অথচ ইরানে ১২ বছর চাকরি করেছেন সালাহ৷ তিন বছর বসনিয়ায় রয়েছেন৷ তিনিও ইটালি যেতে চান৷ তার বাবা বাংলাদেশে বাবা প্রাইমারি শিক্ষক ছিলেন৷ ভাই ছোটখাট কাজ করে৷ পরিবারকে দেখতেই এখানে এসেছেন তিনি৷ তিনি বলেন, ‘‘ফার্সি ভালমতো বলতে, বুঝতে পারি৷ উর্দু, আরবি, পশতুও বুঝি৷’’ 

কিন্তু ইরানের নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে কেন ইউরোপে? তিনি ডয়চে ভেলে বাংলাকে জানান, ইরানের জনগণ খুব ভাল৷ কিন্তু সে দেশে টাকা পয়সার অবস্থা ভাল না৷ তাই ভাগ্য বদলে ইউরোপে আসার কথা ভেবেছিলেন৷

তার বক্তব্য, ক্যাম্পে আসার পথে ২০-২৫ দিন উপোসও করতে হয়েছে৷ তবে নিউ ক্যাম্পের অবস্থা বেশ ভাল৷ খাওয়া-দাওয়া, জামা, জুতা মেলে৷ এখানে চলাফেরায় সমস্যা হয় না৷ অভিবাসী কিংবা শরণার্থীদের প্রতি সব দে দেশেই ভাল-খারাপ মনোভাব রয়েছে৷ কেউ দরদী, কেউ দরদী নন৷ 

লেখক- অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

 

অন্যান্য প্রতিবেদন