রোমানিয়া সীমান্তবর্তী কিকিন্দা অভিবাসী ক্যাম্পে রয়েছেন ২৮৫ জন বাংলাদেশি৷ ছবি: অনুপম দেব কানুনজ্ঞ
রোমানিয়া সীমান্তবর্তী কিকিন্দা অভিবাসী ক্যাম্পে রয়েছেন ২৮৫ জন বাংলাদেশি৷ ছবি: অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

সার্বিয়া থেকে রোমানিয়ার সীমান্ত পার হতে গিয়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হতে নিগ্রহের শিকার হচ্ছেন অভিবাসীরা৷ মারধরের পাশাপাশি অনেক সময় তাদের টাকাকড়ি, মোবাইল ফোন রেখে ফেরত পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেছেন সার্বিয়ার একটি ক্যাম্পে বসবাসরত বাংলাদেশিরা৷

বিভিন্ন কক্ষের দরজায় বাংলায় লেখা নির্দেশিকা, দোকানে বিকাশে টাকা পাঠানোর বিজ্ঞাপন৷ সার্বিয়ার উত্তর পূর্বাঞ্চলে রোমানিয়া সীমান্তের কাছে কিকিন্দা অভিবাসী ক্যাম্পে ঢুকলে বাংলাদেশের কোনো জায়গা বলে ভুল হতে পারে৷ 

ঢাকার কাজী সুরুজ আলম আট মাস ধরে আছেন এখানে৷ দেশে ১৫ বছর দাখিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেছেন৷ করোনাকালে কাজের ভিসা নিয়ে চলে আসেন সার্বিয়ায়৷ কিন্তু ভাগ্য প্রসন্ন না হওয়ায় তার ঠিকানা এখন এই ক্যাম্প৷ ‘‘কোম্পানি বেতন দেয় না ঠিকমতো, পরে আমি ক্যাম্পে চলে আসি৷ আমাদের কোম্পানি থেকে ১২ জন বাংলাদেশি ছিল৷ সবাই এখানে চলে আসি৷ অন্যরা ফ্রান্স, ইটালিসহ ইউরোপের নানা দেশে চলে গেছে৷ আমি এখানেই রয়ে গেছি,’’ বলেন সুরুজ আলম৷ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ক্যাম্পের বাসিন্দাদের কাছে এখন তিনি চা বিক্রি করেন৷  

দুবাইতে দুই বছর কাজ করার পর সিলেটের জিয়াউল হক চলে আসেন আলবেনিয়ায়৷ সেখান থেকে সড়ক পথে পৌঁছান সার্বিয়াতে৷ রোমানিয়া হয়ে ইউরোপে ঢোকার চেষ্টায় অপেক্ষা করছেন কিকিন্দা ক্যাম্পে৷ তিনি বলেন ‘‘এখানে আরো অনেকে ছিলেন৷ তারা সবাই চলে গেছেন ফ্রান্স ইটালিতে৷ আমি দুইটা গেম মেরেছি রোমানিয়ায়৷ পুলিশ ধরে পাঠিয়ে দিয়েছে৷...আমরা চার পাঁচজন ছিলাম৷ গাড়িতে উঠিয়ে রাতে সীমান্তে এনে বলেছে সার্বিয়া চলে যাও৷’’

জিয়ার মতো অভিজ্ঞতা সবার নয়৷ ক্যাম্পে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসীদের অনেকেই ডয়চে ভেলের কাছে রোমানিয়া পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন৷ 

কিকিন্দা ক্যাম্পে চার বছর ধরে বসবাস করছেন কুমিল্লার জালাল৷ দুবাই থেকে ওমান, ইরান, তুরস্ক, গ্রিস, মেসিডোনিয়া পাড়ি দিয়ে তিনি সবশেষ সার্বিয়ায় পৌঁছান৷ এর মধ্যে বিভিন্ন দেশে কাজও করেছেন৷ তারপরও কেন সার্বিয়া আসলেন এমন প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘‘সবারই তো ইচ্ছা ইউরোপ যাওয়ার৷ আমারও ইচ্ছা হল৷’’

এখন পর্যন্ত প্রায় ৪০ বার তিনি সার্বিয়া সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করেছেন বলে জানান৷ কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছেন৷ জালালও অভিযোগ করেন, ‘‘রোমানিয়ার পুলিশ মোবাইল নিয়ে যায়, মারে৷’’ তারপরও ইউরোপ পৌঁছার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে চান তিনি৷ বলেন, ‘‘দেখি এবার হাঙ্গেরি বা অন্য কোন পথ দিয়ে যেতে পারি কি না৷’’

এমন এক একটি কক্ষে পাঁচ থেকে ১০ জন থাকেন৷ ছবি: অনুপম দেব কানুনজ্ঞ
এমন এক একটি কক্ষে পাঁচ থেকে ১০ জন থাকেন৷ ছবি: অনুপম দেব কানুনজ্ঞ

ক্যাম্পের বিভিন্ন কক্ষে পাঁচ থেকে ১০ জন পর্যন্ত বাস করেন৷ একটি কক্ষে প্রবেশের পর দেখা গেল রংবেরঙের কাগজে দেয়াল সাজানো৷ একপাশে লেখা, ‘আজ শাকিলের হলুদ সন্ধ্যা’৷ কক্ষের বাসিন্দা শাকিল জানালেন কিছুদিন আগে ফোনের মাধ্যমে তিনি বিয়ে করেছেন দেশে৷ সেই উপলক্ষেই এই সাজসজ্জা৷ 

শাকিলও রোমানিয়ায় ঢুকার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘গেম হলো লাক৷ কেউ একদিনে যায়, কেউ তিনমাসে যায়, কেউ আবার তিন বছরে যায়৷ এটা পুরোপুরি ভাগ্য৷ আমি রোমানিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হয়ে ১৯ বার ব্যর্থ হয়েছি৷’’

রোমানিয়ার পুলিশের আচরণের বর্ণনা দিয়ে শাকিল বলেন, ‘‘যত দেশের সীমান্ত অতিক্রম করেছি কোনো সমস্যা হয়নি বা পুলিশ আমাদেরকে ধরার পরে ভালো ব্যবহার করে ডিপোর্ট করেছে৷ কিন্তু রোমানিয়ার পুলিশ ডিপোর্ট তো করেই, প্রচণ্ড পরিমাণ মারে৷ পাঁচটা গেমে যদি ধরা খান তিনটা গেমে অবশ্যই মার খাবেন৷ তারপর আবার টাকা নিয়ে যায়৷ এটা খুব খারাপ বিষয়৷ ক্যাম্পের অনেকরই এই অভিজ্ঞতা৷’’  

ক্যাম্পের সমন্বয়ক আলেক্সা এলেজ ডয়চে ভেলেকে জানান, তারাও এমন অভিযোগ শুনে আসছেন৷ অনেক অভিবাসী আহত হয়ে ক্যাম্পে ফিরে এসেছেন৷ তাদের কাছ থেকেই রোমানিয়ার পুলিশের নির্যাতনের কথা তারা জানতে পারেন৷  

ঐক্যবদ্ধ যুগোস্লাভিয়ার এক সময়কার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত সার্বিয়ার এই ক্যাম্পটিতে বর্তমানে প্রায় ৬০০ অভিবাসী রয়েছেন, তাদের মধ্যে ২৮৫ জনই বাংলাদেশি৷

আলেক্সা এলেজ বলেন, যারা সাময়িকভাবে সার্বিয়া থাকতে চান তাদেরই কিকিন্দার মতো অভিবাসী অভ্যর্থনা কেন্দ্রে থাকতে বলা হয়৷ তবে যারা সার্বিয়ায় আশ্রয়ের আবেদন করেন, তাদের শরণার্থী কেন্দ্রে পাঠানো হয়৷ বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি অভিবাসী সার্বিয়ায় আশ্রয়ের আবেদন করলেও পরে তারা সেখান থেকে চলে গেছে বলে জানান তিনি৷

পড়ুন: সার্বিয়া সীমান্তে পরিত্যক্ত কারখানায় অভিবাসীদের মানবেতর জীবন

 

অন্যান্য প্রতিবেদন