২০২০ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার মিরাল ক্যাম্পে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷  ছবি: আরাফাতুল ইসলাম
২০২০ সালের অক্টোবরে বসনিয়ার মিরাল ক্যাম্পে বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম

গত বছর ইউরোপের দেশগুলোতে রেকর্ডসংখ্যক বাংলাদেশি আশ্রয় আবেদন করেছেন৷ তবে যত আবেদন জমা পড়েছে তার ৯৬ শতাংশই প্রত্যাখ্যাত হয়েছে৷ আশ্রয় আবেদনের স্বীকৃতির বিবেচনায় বাংলাদেশিরা রয়েছেন সর্বনিম্নের তালিকায়৷

২০২১ সালে ‘ইইউ প্লাস’ (ইউরোপীয় ইউনিয়ন, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, লিশটেনস্টাইন) দেশগুলোতে বিভিন্ন দেশের অভিবাসী, শরণার্থীদের মোট ছয় লাখ ১৭ হাজার ৮০০ টি আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে৷ এই সংখ্যা ২০২০ সালের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ বেশি৷ ইউরোপীয় ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের (ইইউএএ) আশ্রয় আবেদনের প্রবণতা সংক্রান্ত বার্ষিক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য দেয়া হয়েছে৷

আশ্রয় আবেদন বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন আফগান ও সিরীয়রা৷ তালিকার শীর্ষে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার দেশগুলোরই রয়েছে প্রাধান্য৷ প্রথম পাঁচে রয়েছে সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক, পাকিস্তান ও তুরস্ক৷ ইউরোপে আশ্রয় আবেদনে বাংলাদেশিরা আছেন ষষ্ঠ অবস্থানে৷ গত বছরের চেয়ে তাদের আবেদনের হার তিন চতুর্থাংশ বেড়েছে৷ এদের মধ্যে রেকর্ড সংখ্যক ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ বাংলাদেশিও আছেন৷  


২০ হাজার বাংলাদেশি

নিজ দেশে বর্ণ, ধর্ম, জাতীয়তা, রাজনৈতিক কারণে কেউ নির্যাতনের শিকার হলে বা কারো জীবন হুমকির মুখে থাকলে তিনি আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইউরোপের দেশগুলোতে সুরক্ষা চেয়ে আবেদন করতে পারেন৷ ২০২১ সালে প্রায় ২০ হাজার বাংলাদেশি এমন আশ্রয় আবেদন করেছেন৷ ২০১৪ সাল থেকে এই পরিসংখ্যান প্রকাশের পর থেকে এটি বাংলাদেশিদের সর্বোচ্চ আবেদনের রেকর্ড৷ 

ইইউএএ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের তুলনায় গত বছর বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন ৭৭ শতাংশ বেড়েছে৷ ২০২১ সালে বেশিরভাগ আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে বছরের শেষার্ধে৷ প্রতি ১০টির মধ্যে নয়টিই ছিল প্রথমবারের মতো আবেদন৷ উল্লেখ্য, প্রথমবার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল বা পুর্নবিবেচনার আবেদন করতে পারেন আশ্রয়প্রার্থীরা৷ 

পড়ুন: গ্রিসে বাংলাদেশিদের বৈধ অভিবাসনের সুযোগ

অপ্রাপ্তবয়স্কেও রেকর্ড

ইউএএ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে ২৭ হাজার ৩০০ জন আশ্রয় আবেদনকারী তাদেরকে ‘অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক’ হিসেবে দাবি করেছেন, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ৷ এদের মধ্যে অর্ধেক বা প্রায় ১৩ হাজার জনই আফগান৷ দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা সিরিয়ানদের আবেদনের সংখ্যা ছিল সাড়ে চার হাজার৷ এরপরই রয়েছেন বাংলাদেশিরা৷ তাদের এমন প্রায় ১৪০০ আবেদন জমা পড়েছে, যা এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ৷ ২০২০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা ১৭৪ শতাংশ বেশি৷ তবে বাংলাদেশি মোট আবেদনকারীর হিসেবে ‘অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কির’ সংখ্যাটি মাত্র সাত শতাংশ৷ 

গত বছর বিভিন্ন দেশের প্রকাশিত প্রতিবেদনেও অপ্রাপ্তবয়স্ক বাংলাদেশি আশ্রয় আবেদনকারীদের তথ্য উঠে আসে৷ গত জুনে সেভ দ্য চিলড্রেনের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২০ সালে ইটালিতে পাড়ি জমানো ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অভিভাবকহীন’ অভিবাসীর সাড়ে ২২ দশমিক শতাংশই বাংলাদেশি, যাদের সংখ্যা এক হাজার ৫৫৮ জন৷ এটি ২০১৯ সালের তুলনায় ১৪ ভাগ বেশি৷

পড়ুন: সার্বিয়ায় অভিবাসীদের ‘বাংলাদেশি ক্যাম্প’

আবেদন বেশি, স্বীকৃতি কম

২০২১ সালে বাংলাদেশিদের প্রায় ১৬ হাজার ৩০০টি আশ্রয় আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে৷ আগের বছরের চেয়ে এই সংখ্যা দুই তৃতীয়াংশ বেড়ে ২০১৮ সালের রেকর্ড পরিসংখ্যানের কাছাকাছি পৌঁছেছে৷ 

তারপরও ২০২১ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ১২ হাজার ১০০টি আবেদন ঝুলে ছিল৷ এর মধ্যে পাঁচ ভাগের তিন ভাগ আবেদন করা হয়েছে ছয় মাসের কম সময়ের মধ্যে৷  

ইইউ প্লাস দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের আবেদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে প্রত্যাখ্যানের হারও৷ ২০২১ সালে ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বাতিল হয়েছে৷ অর্থাৎ, মাত্র চার শতাংশ আবেদনকারী শরণার্থী বা ‘সাবসিডিয়ারি প্রটেকশনের’ অধীনে ইউরোপে বসবাসের অনুমতি পেয়েছেন৷ যেখানে ২০২১ সালে সব দেশ মিলিয়ে আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদন গ্রহণের গড় হার ছিল ৩৫ শতাংশ৷ 

আবেদন গৃহীত হওয়ার মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন ইরিত্রিয়ান (৮১%), ইয়েমেনিস (৭৯%), বেলারুশ (৭৫%), সিরিয়ান (৭২%) ও আফগানরা (৬৬%)৷ অন্যদিকে প্রত্যাখ্যাতদের মধ্যে উপরের দিকে রয়েছেন বাংলাদেশিরা৷ 

পড়ুন: এক বছরে শতাধিক বাংলাদেশিকে জোর করে ফেরত পাঠালো জার্মানি

এফএস/এসিবি (ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলাম)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন