ফরাসি আশ্রয় বিষয়ক দপ্তর অফপ্রাতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন একজন আশ্রয়প্রার্থী। ছবি: মেহেদি শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস
ফরাসি আশ্রয় বিষয়ক দপ্তর অফপ্রাতে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন একজন আশ্রয়প্রার্থী। ছবি: মেহেদি শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস

অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল কী হওয়া উচিত সেটি এবারের ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে৷ দুই কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী মারিন লো পেন ও এরিক জেমুর এবং ডানপন্থী প্রার্থী ভালেরি পেক্রেস আশ্রয়প্রার্থীদের তাদের নিজ দেশের ফরাসি দূতাবাসে আশ্রয় আবেদন জমা করার নিয়ম প্রবর্তনের দাবি জানিয়েছেন৷ তাদের এই বক্তব্যের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে ইনফোমাইগ্রেন্টস৷

বিদেশে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাস বা কনস্যুলেটগুলিতে রাজনৈতিক আশ্রয় চাওয়ার আইন করে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধের লড়াইয়ের দাবি জানিয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী বলয়ের তিন প্রার্থী ভালেরি পেক্রেস, মারিন লে পেন এবং এরিক জেমুর৷ 

তবে তাদের এই দাবিটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের তাদের নিজ দেশে সম্মুখীন হওয়া বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে অজ্ঞতার প্রমাণ দেয়৷

অপরদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন এমানুয়েল ম্যাক্রঁর মধ্যপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অঁ মার্কশ’ সহ বামপন্থী ও কট্টর বামপন্থী দলের প্রার্থীরা এই দাবিকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন৷ 

প্রার্থীরা যা বলেছেন

মারিন লো পেন: কট্টর ডানপন্থী দল ন্যাশনাল র‍্যালির (আরএন) প্রার্থী মারিন লো পেন তার নির্বাচনী প্রচারাভিযানে বলেছেন, “রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন দাখিল এবং সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া বিদেশে অবস্থিত ফরাসি কনস্যুলেট এবং দূতাবাসগুলিতে সম্পন্ন হওয়া উচিত৷ এতে করে শরণার্থী মর্যাদাপ্রাপ্তরা ফ্রান্সে আসার অনুমোদন পাবে এবং সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা লোকেরা ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে পারবে না।”


মারিন লো পেন এই নিয়মটি প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করার দাবি জানান৷ এই প্রস্তাবটি মারিন লো পেন এর আগে ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ইশতেহারে প্রথমদিকে রেখেছিলেন৷ এছাড়া তিনি নিয়মিত গণমাধ্যমে এই দাবিতে সরব থাকেন৷ 


ভালেরি পেক্রেস: একই দাবি উঠে এসেছে এবারের নির্বাচনে ডানপন্থী লে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ভালেরি পেক্রেসের প্রচারেও৷ তিনি একটি নির্বাচনী সমাবেশে বলেন, “বিদেশে বা সীমান্তে আশ্রয়ের আবেদন দাখিল করার আইন পাশ করা উচিত।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আমাদের দূতাবাসগুলিতে যত বেশি আশ্রয়ের আবেদন জমা দেওয়া হবে, আমরা সে অনুযায়ী ভালো প্রস্তুতি নিয়ে মর্যাদাপ্রাপ্তদের স্বাগত জানাতে পারব৷ আশ্রয়প্রার্থীরা ফ্রান্সে পৌঁছানোর সময় যদি তাদের কাছে তাদের দূতাবাস থেকে দেয়া আশ্রয়ের নথি থাকে তবে আমরা তাদেরকে অবিলম্বে ফ্রান্সে স্বাগত জানাতে পারব ও এখানে তাদের অবস্থান সংহত করতে পারব৷ এটি তাদেরকে সাহায্য করতে সহজ করবে৷’’

তিনি ২২ ফেব্রুয়ারি ফরাসি রেড়িও ফ্রঁন্স ইন্টারে বলেন, “প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি এটি একটি ভালো ব্যবস্থা৷ যারা দূতাবাস অথবা সীমান্ত থেকে অনুরোধ ছাড়াই আসবে তাদেরকে সীমান্তের কাছে খোলা কেন্দ্রে রাখা হবে৷ সেখানেই তাদের আশ্রয় আবেদন পরীক্ষা করা হবে৷ গ্রিসে এটিই করা হয৷”

এরিক জেমুর: ২০২২ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো লড়তে যাওয়া কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী এরিক জেমুর প্রায় একই বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। 

তিনি গত ডিসেম্বরে বলেন, ‘‘আমাদের কনস্যুলার বা দূতাবাসগুলোর প্রতিনিধিত্বে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলির কাছাকাছি অথবা সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় আশ্রয়ের আবেদন পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা উচিত৷”

যে কারণে এই দাবি অবাস্তব ও অগ্রহণযোগ্য

একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক আশ্রয়ের অধিকার মূলত আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন দ্বারা স্বীকৃত যেটি ফরাসি সংবিধানেও অন্তর্ভুক্ত৷ এই আইন নিপীড়নের শিকার যেকোন ব্যক্তিকে রক্ষা করে। বিদেশে অবস্থিত যেকোন দূতাবাস এবং কনস্যুলেটে ফরাসি কর্তৃপক্ষের কছে আশয়ের জন্য একটি নির্দিষ্ট ভিসার জন্য আবেদন করা সম্ভব।

কিন্তু এই নির্দিষ্ট ভিসা একজন ব্যক্তিকে শুধুমাত্র ফ্রান্সে পৌঁছানোর অনুমতি দেয়৷ দূতাবাসের রাজনৈতিক আশ্রয় বা শরণার্থী মর্যাদা প্রদানের কোন আইনি সুযোগ নেই৷ একজন ব্যক্তি একবার ফরাসি দূতবাস থেকে বিশেষ ভিসা নিয়ে দেশটির ভূখণ্ডে প্রবেশ করলে তাকে আবারও একটি আশ্রয়ের আবেদনপত্র সংগ্রহ করতে তার আবাসস্থলের নিকটবর্তী প্রেফেকচুরে যেতে হবে৷

পরবর্তীতে প্রেফেকচুর থেকে শরণার্থী মর্যাদা প্রদানের দায়িত্বে থাকা শরণার্থী এবং রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত ফরাসি দপ্তর অফপ্রাতে পাঠানো হবে। 

তাই বর্তমানে একজন ব্যক্তি তার দেশে বা তৃতীয় দেশে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করতে পারবেন না৷ এটি আইনত অবাস্তব৷ কারণ অফপ্রাই শরণার্থী মর্যাদা প্রদানের একমাত্র সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান৷

অর্থাৎ, আগ্রহী ব্যক্তিকে অবশ্যই যেকোনভাবে নিজস্ব উপায়ে ফরাসি অঞ্চলে প্রবেশ করতে হবে। মারিন লো পেন, ভলেরি পেক্রেস এবং এরিক জেমুর মূলত এই নিয়মটি পরিবর্তন করতে চান৷ যেটি সম্পূর্ন অসম্ভব৷

প্রথমত সংশ্লিষ্ট দেশের সীমানার বাইরে আশ্রয় চাওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশন (ইউএনএইচসিআর) এর মতে, প্রত্যেক আয়োজক বা আশ্রয় প্রদানকারী দেশের একটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে৷ আশ্রয়প্রার্থীদের তার ভূখণ্ডে ন্যায্য ও কার্যকর আশ্রয়প্রক্রিয়া, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সামাজিক বীমার পাশাপাশি বিভিন্ন অধিকার ও চলাচলের স্বাধীনতা দিতে বাধ্য৷’’

শরণার্থীদের অবস্থা সম্পর্কিত ১৯৫১ সালের স্বাক্ষরিত জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী কোনো দেশে একজন আশ্রয়প্রার্থীকে এমন কোনো দেশে ফেরত পাঠানো যাবে না যেখানে তার জীবনের ঝুঁকি রয়েছে৷

অর্থাৎ, একজন প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থী ব্যক্তিকে তার নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়া বেআইনি৷ মারিন লো পেন বা অন্য প্রার্থীদের প্রস্তাবনা আইনে পরিণত হলে, কর্তৃপক্ষ ফরাসি ভূখণ্ডে প্রবেশে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের সীমান্ত থেকেই তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়ার আদেশ দিতে পারে৷ যেহেতু যথাযথ আইনি কাঠামো ছাড়া সঠিকভাবে আবেদন যাচাই সম্ভব না সেক্ষেত্রে সীমান্তে বা দূতাবাসে অহরহ মানুষের আবেদন বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরী হবে৷ 

আশ্রয় আবেদনের আউটসোর্সিং বা নিজ ভূখণ্ডের বাইরে আশ্রয় ব্যবস্থা প্রণয়ন ইউরোপীয় আইনের লঙ্ঘন৷ ইইউ আইন অনুসারে, ‘‘ইইউ দেশগুলিকে অবশ্যই তাদের সীমান্তে অথবা নিজ দেশে উপস্থিত তৃতীয়-দেশের নাগরিক এবং রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক সুরক্ষার জন্য আবেদন করার অধিকার দিতে হবে৷’’

২০২০ সালের অক্টোবরে হাঙ্গেরিতে এরকম একটি আইন লঙ্ঘন করার সিদ্ধান্ত নেয় ভিক্টর অরবানের সরকার৷ ভিক্টর অরবান আশ্রয়ের আবেদনগুলি হাঙ্গেরির ভূখণ্ডে না নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে হাঙ্গেরির দূতাবাসে জমা নেয়ার আইন করতে চেয়েছিলেন৷ 

এই ঘটনায় অবৈধভাবে আশ্রয়ের অধিকারকে সীমিত করার অভিযোগে ২০২১ সালের জুলাইয়ে, ইউরোপীয় কমিশন দেশটির বিরুদ্ধে ইইউ-এর বিচার আদালতে মামলা দায়ের করে৷

মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, এই প্রস্তাবনা আশ্রয়প্রার্থীদের বিপজ্জনক রুট থেকে রক্ষা করা দূরে থাক উলটো ভুক্তভোগীদের জীবনকে বিপদে ফেলবে৷ এতে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার সন্ধানে থাকা অভিবাসীদের জীবন আরও বিপন্ন এবং তাদের বিভিন্ন শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে মনে করে সংস্থাটি৷

ফ্রান্সের তিন প্রার্থীর এই প্রস্তাবনার তীব্র বিরোধিতা করে, জাতিসংঘের সহকারী হাই কমিশনার ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রোটেকশন, গিলিয়ান ট্রিগস বলেছিলেন, আউটসোর্সিং বা তৃতীয় দেশের আশ্রয় আবেদনের ব্যবস্থাগুলি নিরাপত্তার সন্ধানে বিপজ্জনক সমুদ্র পারাপারে মরিয়া উদ্বাস্তুদের থামাতে পারবে না৷ উলটো তাদের ঝুঁকি নেয়ায় তীব্রতা বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন রুট ব্যবহারে উৎসাহিত করবে৷ যার ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলির উপর চাপ বাড়াবে৷”

আইওএমের একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উন্নত বিশ্বের দেশগুলি বিশ্বের সমস্ত শরণার্থীর মাত্র ১৫ শতাংশকে আশ্রয় দিয়েছে৷


মূল প্রতিবেদন মার্লেন পানারা। ফরাসি থেকে অনুবাদ মোহাম্মাদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন