ইউক্রেন ছেড়ে পোল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছেন এই নারী৷ ছবি :এএফপি
ইউক্রেন ছেড়ে পোল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছেন এই নারী৷ ছবি :এএফপি

কোলের শিশু, প্রয়োজনীয় নথি, সামান্য ওষুধপত্র, আর কিছু জামাকাপড়–সামান্য সম্বলটুকু নিয়ে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয়ের সন্ধানে চলে যাচ্ছেন হাজারো ইউক্রেনীয়৷

এই পরিস্থিতিতে পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, মাল্ডোভা, রোমানিয়ার সরকার ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছেন৷

কিন্তু আফ্রিকা এবং পশ্চিম এশিয়ার অভিবাসী এবং শরণার্থীদে্র ক্ষেত্রেও কি একইরকম ব্যবহার করা হচ্ছে?

বৈষম্যের অভিযোগ ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে বিপুল সংখ্যক সিরীয় অভিবাসী, শরণার্থী ইউরোাপে প্রবেশ করেন৷ সেসময় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা অভিবাসীদের নিয়ে নেতিবাচক বক্তব্য দেন৷ তবে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর যে অভিবাসী সংকট তৈরি হয়েছে তাদের আশ্রয় দেয়ার বিষয় দেশগুলোর সরকার যথেষ্ট আন্তরিক৷ বুলগেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী কিরিল পেটকভ সপ্তাহের শুরুতেই একটি সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, ‘‘সাধারণত যে শরণার্থীরা আমাদের দেশে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আসেন, এই ব্যাপারটা তো ঠিক তেমন নয়৷ এই মানুষগুলো তো ইউরোপীয়৷ তারা শিক্ষিত, তারা বুদ্ধিমান৷ সাধারণত অন্যসময়ে যে শরণার্থীদের আমরা দেখি, তাদের সঠিক পরিচয় নেই৷ সেই শরণার্থীদের অতীতও স্বচ্ছ নয়৷ কে জানে হয়তো তারা সন্ত্রাসবাদীও হতে পারে৷’’

বুলগেরিয়ার অতি ডানপন্থি অভিবাসনবিরোধী প্রেসিডেন্ট হিসেবে পরিচিত রুমেন রাডেভও ইউক্রেনীয়দের নিয়ে সুর নরম করেছেন৷ তিনি এও বলেন, ‘‘এই মূহূর্তে ইউরোপের দেশগুলি শরণার্থীদের সাম্প্রতিক ঢেউ নিয়ে চিন্তিত নয়৷’’

 স্পেনে কর্মরত সিরীয় সাংবাদিক ওকবা মোহাম্মদ এই মন্তব্যের পর বৈষম্যের অভিযোগ এনেছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘দেশ, কাল,জাতি নির্বিশেষে শরণার্থীদের একটাই পরিচয় তারা শরণার্থী, আফ্রিকান হোক কিংবা ইউরোপীয়৷’’

 হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ওরবানও অভিবাসনবিরোধী হিসেবে পরিচিত৷ কিন্তু ইউক্রেন ইস্যুতে সম্প্রতি তার স্বর বদলেছে৷ ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়েছেন তিনিও৷

 ২০১৫ সালে জার্মানির তৎকালীন চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল বলেছিলেন, ‘আমরা পারব’৷ সুইডেনের প্রেসিডেন্টও শরণার্থীদের পক্ষে কথা বলেছিলেন৷

সে কথা মনে করিয়ে দিয়েল জার্মান রাজনীতিবিদ আমিনাটা টউরে কৃষ্ণাঙ্গ এবং সংখ্যালঘুদের সহায়তায় এগিয়ে আসার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন টুইটারে৷


 



শরণার্থীদের সহায়ক সংগঠন প্রো-অ্যাসাইলের দাবি, ইউক্রেনীয়দের মতো অন্য অভিবাসীদেরও নিরাপদ আশ্রয়ে সুযোগ দেয়া হোক৷ গ্রিসের এক অভিবাসন গবেষক লেনা কারামানিদাউ জানান, ইউরোপীয় অভিবাসন নীতির মধ্যে বৈষম্য রয়েছে৷ সরকার এবং ইউরোপীয় এলিটদের প্রতিক্রিয়া থেকেই সেটা বোঝা যায়৷

জাতিসংঘের নীতি নির্ধারণ, উন্নয়ন বিভাগের প্রাক্তন প্রধান জেফ ক্রিস্প বলেন, শরণার্থীদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হবে, তার সঙ্গে জাতি এবং ধর্মের একটা সংযোগ রয়েছে৷ শরণার্থী ইস্যুতে নীতিবাচক মনোভাবাসম্পন্ন দেশগুলি এখন আচমকা সুর নরম করে ইতিবাচক মনোভাব নিয়েছে, এমনটাও বলেন তিনি৷


কেন বৈষম্য?

এর আগে অভিবাসীদের নিয়ে কট্টর অবস্থান নেয়ার পেছনে সংস্কৃতি ও জাতিগত ঐক্যের যুক্তি দিয়েছিলেন হাঙ্গেরির প্রেসিডেন্ট ওরবান৷ এই মুহূর্তে পোল্যান্ডে ক্ষমতায় রয়েছে কনজারভেটিভ ন্যাশনালিস্ট পার্টি৷ তারাও ওরবানের সুরে কথা বলেন৷ খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের দেশ হিসেবে পোল্যান্ডকে রক্ষা করার কথা বলা হয়েছিল তখন৷ শুধু তাই নয়, নির্দিষ্ট ধর্মের কথা উল্লেখ করে সন্ত্রাসের আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়৷

একাধিক আফ্রিকান পড়ুয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এই পরিস্থিতিতে৷ ছবি: এরিক ফেফেরবার্গ, এএফপি
একাধিক আফ্রিকান পড়ুয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এই পরিস্থিতিতে৷ ছবি: এরিক ফেফেরবার্গ, এএফপি

সেই রাষ্ট্র্রপ্রধানরা এখন ইউক্রেনের অভিবাসীদের বিষয়টিকে আলাদা করে দেখছেন৷ ইউক্রেনের সঙ্গে হাঙ্গেরি ও পোল্যান্ডের সঙ্গে সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে৷ প্রায় ১০ লাখেরও বেশি ইউক্রেনীয় পোল্যান্ডে কাজ করেন৷ প্রায় দেড় লাখের কাছাকাছি হাঙ্গেরিয়ান পশ্চিম ইউক্রেনে রয়েছেন৷

 ক্রিস্প অস্বীকার করেননি বৈষম্যের কথা৷ ভারতীয়, বাংলাদেশি, নাইজেরীয়, লেবানিজ নাগরিকরা সীমান্তে আটকে রয়েছেন৷ কারণ অনেক ইউরোপের বাইরের নাগরিকদের ক্ষেত্রে ভিসার প্রয়োজন পড়ছে৷


পোল্যান্ডে এক ভারতীয় স্বেচ্ছাসেবী রুচির কাটারিয়া সংবাদংস্থা এপিকে জানিয়েছেন, তার ভারতীয় সহনাগরিকদের প্রথমে বলা হয়েছিল রোমানিয়া যেতে৷ কয়েকশ কিলোমিটার হেঁটে তারা সীমান্তে পৌঁছেছিলেন৷ তিন দিন খাবার জোটেনি সেই মানুষগুলোর৷ সীমান্তেই আটকে পড়েছেন তারা৷ জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউরোপীয় দেশগুলির কাছে আহ্বান জানিয়েছে, সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশ-জাতি নির্বিশেষে সবাইকে স্বাগত জানানো উচিত৷

ইতিবাচক অভিজ্ঞতা

যদিও পোল্যান্ডে আশ্রয় নেয়া ইউক্রেনীয় শরণার্থী ইয়েলেনা ক্লেবানের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত মধুর৷ বোন, ননদ, সাতজন শিশু, তাদের দাদীকে নিয়ে পোল্যান্ডের ওয়ারশ-র থেকে একটু দূরেই পডকয়া লেসনা নামের একটি শহরতলি এলাকায় আশ্রয় মিলেছে ইয়েলেনার৷ সংবাদসংস্থা এএফপিকে ইয়েলানা জানান, তিনি পোল্যান্ডে এসে সবরকম সুবিধা পেয়েছেন৷ গরম স্যুপের মতো সুস্বাদু খাবারও পেয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা, পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের থেকে ভাল ব্যবহারও পেয়েছেন৷

আরকেসি/এফএস (রয়টার্স, এপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন