ইউক্রেন থেকে পোল্যন্ডে পৌছানো এক অভিবাসী। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেন থেকে পোল্যন্ডে পৌছানো এক অভিবাসী। ছবি: রয়টার্স

ইউক্রেনের থেকে আসা শরণার্থীদের ‘সাময়িক সুরক্ষা’ দিতে সম্মত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এই সুবিধা ইউক্রেনের নাগরিক এবং দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদী ভিসা নিয়ে বসবাসরত ব্যক্তিদের জন্যও প্রযোজ্য হবে। তবে ইউক্রেনে পড়ালেখার জন্য আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা এই সুবিধা পাবেন না।

ইইউভুক্ত দেশগুলো বৃহস্পতিবার ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীদের বিশেষ অস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সম্মত হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।২০০১ সালের পর পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অভিবাসীদের আসা শুরু হওয়ার পর প্রথমবারের মতো শরণার্থীদের জন্য এমন নির্দেশিকা সক্রিয় করা হয়েছে।

২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যে ১২ লাখেরও বেশি মানুষ ইউক্রেন থেকে ছেড়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘ।

ইইউর এই সুবিধা প্রদানের ফলে ইউক্রেন থেকে আসা শরণার্থীরা ইউরোপের দেশগুলোতে থাকতে, কাজ করতে, সামাজিক সহায়তার পাশাপাশি আবাসন, স্কুল ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা পরিষেবার সুবিধা পাবে।এই বিশেষ সুরক্ষার আওতায় শরণার্থীরা ইইউ দেশগুলোতে থাকার জন্য এক বছরের নবায়নযোগ্য বসবাসের অনুমতি দেয়া হবে।


বৃহস্পতিবার ৩ মার্চ ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের পরে ইউরোপীয় স্বরাষ্ট্র বিষয়ক কমিশনার ইলভা জোহানসন এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে প্রায় ১ মিলিয়ন শরণার্থীকে স্বাগত জানিয়েছি এবং আরও লক্ষ লক্ষ শরণার্থী আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের পর্যাপ্ত সুরক্ষা দিতে আমাদের এই বিশেষ সুরক্ষা আইন দরকার।”

সুযোগ পাবেন দীর্ঘমেয়াদি ভিসায় থাকা বিদেশিরাও

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদী ভিসায় থাকায় অন্য দেশের নাগরিকরাও এই সুবিধার আওতায় এক বছর মেয়াদি নবায়নযোগ্য বসবাসের অনুমতিপত্র পাবেন। 

সংকট শুরু হওয়ার আগে ইউক্রেনের নাগরিকরা ইইউতে ভিসা ছাড়া সর্বোচ্চ ৯০ দিন থাকতে পারতেন।

ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদী ভিসা নিয়ে থাকা বিদেশী নাগরিকদের ক্ষেত্রে, প্রতিটি ইইউ সদস্য রাষ্ট্র চাইলে সদ্য পাশ হওয়া ইউরোপীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিশেষ অস্থায়ী সুরক্ষা অথবা দেশগুলোর জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত বিশেষ আইন প্রয়োগ করেও অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি দিতে পারবে। 

প্যারিস বারের আইনজীবী ও আশ্রয় আইন বিশেষজ্ঞ উদ রিমেলহো ব্যাখ্যা করেন, “ইতিমধ্যে অনেক ইইউভুক্ত দেশ যেমন, গ্রিস, ইটালি ও স্পেন বিভিন্ন মানবিক জরুরি পরিস্থিতিতে এর আগে কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ব্যবহার করেছে। এই দেশগুলি বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্থ ও ঝুঁকিতে থাকা দুর্বল ব্যক্তিদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের বাইরেও মানবিকভাবে বসবাসের অনুমতি দিয়ে থাকে।”

তিনি আরও বলেন, “অনেক দেশে যেহেতু আগে থেকেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের বাইরে এরকম বিশেষ আইন ছিল। সেক্ষেত্রে তারা চাইলে নতুন আইনের বদলে বিদ্যমান আইন প্রয়োগ করেই ইউক্রেনীয় ও তৃতীয় দেশের নাগরিকদের বসবাসের অনুমতি দিতে পারবে।” 

বাদ পড়েছে ইউক্রেনে অধ্যয়নরত বিদেশী ছাত্রছাত্রীরা

নতুন পাশ হওয়া বিশেষ সুরক্ষা থেকে বাদ পড়েছেন ইউক্রেনে পড়তে আসা বিদেশি ছাত্রছাত্রীরা। এছড়া ইউক্রেনে দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের অনুমতি না থাকা অস্থায়ী কর্মী কিংবা অন্যান্য ভিসায় আসা ব্যক্তিরাও এই সুবিধা পাবেন না। 

ইলভা জোহানসন ব্যাখ্যা করেন, “তারা বিশেষ অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদার দ্বারা আওতার বাইরে। তবে আমরা ইউক্রেনীয়দের সাথে তাদেরকেও ইইউতে স্বাগত জানাতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। যাতে করে আমরা তাদের অবিলম্বে সুরক্ষা, বাসস্থান এবং খাবারের জন্য সাহায্য করতে পারি।”

তিনি আরও বলেন, “তারা যে দেশগুলি থেকে এসেছে আমরা তাদের সাথেও পরামর্শ করব। তাদের নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে দিতে কিভাবে ফ্লাইটগুলি সংগঠিত করা যায় সে ব্যাপারেও আলোচনা করা হবে।”

একটি ইউরোপীয় সূত্রের মতে, ভারত, মরক্কো বা টিউনিসিয়া ইতিমধ্যে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইট পরিচালনা করছে। 

তবে ইইউ দেশগুলির এই সংহতির অভূতপূর্ব প্রক্রিয়া অনেককে বিভ্রান্ত করছে। যদিও এটি বিপদ থেকে পালিয়ে আসা লোকদের নতুন জীবন প্রদান করবে।

এনজিও অক্সফামের মতে, “অভিবাসীদের স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহু বছরের ব্যর্থ রেকর্ডের কয়েক বছর পরে এই আইনটি এসেছে। যেখানে ইতিমধ্যে যুদ্ধ, নিপীড়ন এবং দুর্দশা থেকে পালিয়ে আসা হাজার হাজার মানুষ ইউরোপ জুড়ে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিবিরে বছরের পর বছর ধরে পার করার পরেও কোন সমাধান পায় নি।”

“দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন”

জার্মান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেসারের মতে, এই অস্থায়ী সুরক্ষা ২৭ দেশ কর্তৃক সর্বসম্মতভাবে পাশ হওয়া একটি দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন।

তবে ইইউ দেশগুলির মধ্যে শরণার্থীদের আনুষ্ঠানিক বন্টনের কোন পরিকল্পনা ৩ মার্চের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে আলোচিত হয় নি।  

ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরা দারমানা মন্তব্য করেন, “আমাদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই অযৌক্তিক যুদ্ধের মুখে ইউক্রেনের জনগণের সাথে একাত্মতার জন্য ইইউ-এর পূর্ণ অঙ্গীকারের প্রতিফলন।  


তিনি আরও উল্লেখ করেন, “চুক্তিটি শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়ার আগেই আনুষ্ঠানিক ও সর্বসম্মতভাবে পাশ হয়েছে।” 

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডের লাইয়েন রোমানিয়ায় এক সফরে গিয়ে সদ্য পাশ হওয় চুক্তির প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “এটি যুদ্ধের সময় শুধু সমবেদনা নয় বরং ইউরোপীয় হিসাবে এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”



এমএইউ/আরআর










 

অন্যান্য প্রতিবেদন