গ্রিসের বিভিন্ন শিবিরে প্রায় ৪৩ হাজার শরণার্থী শিশু অবস্থান করেছেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
গ্রিসের বিভিন্ন শিবিরে প্রায় ৪৩ হাজার শরণার্থী শিশু অবস্থান করেছেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

যুক্তরাজ্যের সংসদের উচ্চকক্ষ হিসেবে পরিচিত হাউস অফ লর্ডসের এমপিরা গত সপ্তাহে ডাবস সংশোধনীর পক্ষে ভোট দিয়েছেন। এর ফলে এখন থেকে আবারও অভিভাবকহীন নাবালকেরা যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগ দিতে পারবে।

গত বছর যুক্তরাজ্য সরকার দেশটির আশ্রয় ব্যবস্থার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে একটি সামগ্রিক অভিবাসন প্রস্তাবনা উত্থাপন করেছিল। এই প্রস্তাবনার মধ্যে ছিল ডাবস সংশোধনীর পরিবর্তনের বিষয়টিও। 

ডাবস সংশোধনী হচ্ছে, ২০১৬ সালের ইমিগ্রেশন আইনের একটি অধ্যাদেশ। এটির সাহায্যে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত ব্যক্তিদের পরিবারের কোনো সদস্য যদি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগে ইউরোপের কোন দেশে আসেন তবে তাদেরকে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ভিসা ছাড়ায় তাদের পরিবারের সাথে যোগ দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।


যেমন, উত্তর ফ্রান্সের কালে উপকূলে যদি কোন অভিভাবকহীন নাবালক আসে সেক্ষেত্রে ব্রিটেনে অবস্থানরত তার পরিবাবের সাথে কথা বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ফ্রান্স থেকে যুক্তরাজ্যে পাঠানো হতো। 

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল ২০২১ সাল থেকে এই নিয়ম স্থগিত করে নতুন একটি আশ্রয় আইনের প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে হাউস অব লর্ডসের সদস্যরা বেশ কয়েকটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু এমপিরা ডাবস সংশোধনীর পক্ষেই ভোট দিয়েছেন। যার ফলে অভিভাবকহীন নাবালকদের নিরাপদ উপায়ে ইংরেজ মাটিতে তাদের পরিবারের কাছে যেতে আর কোন বাধা রইল না। 

এটি ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেলের জন্য একটি বিস্ময়কর রাজনৈতিক পরাজয় বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

এনজিও সেফ প্যাসেজ ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক বেথ গার্ডিনার-স্মিথ এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “এই আইনি প্রক্রিয়া উত্তর ফ্রান্সের কালে এবং গ্রিসের বন্দি শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত হাজারো নাবালকদের জীবন রক্ষা করবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “চলতি সপ্তাহে যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ ইউক্রেনীয় শরণার্থী পরিবারগুলিকে যুক্তরাজ্যে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে একত্রিত হতে দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এটি অবশ্যই অন্যান্য জাতীয়তার শরণার্থী শিশুদের জন্যেও প্রযোজ্য হবে। কারণ বহু নাবালক কিশোর তাদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাজ্যে থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একা আটকে আছে।”

ব্রেক্সিটের পর সমস্যা বেড়েছে

বেথ গার্ডিনার-স্মিথ ব্যাখ্যা করেন, "নাবালকদের জন্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশে নিরাপদ পথ নিশ্চিত করা না হলে, তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লরির পিছনে অথবা ডিঙ্গি নৌকায় চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে তাদের প্রিয়জনদের কাছে পৌঁছতে চাইবে।”

ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের পর ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে আর ডাবস সংশোধনীর আওতায় নাবালকদের যুক্তরাজ্যে প্রবেশের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তাই হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী শিশুরা চোরাকারবারীদের মাধ্যমে বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে এক প্রকার বাধ্য হয়েছিল।

সেসময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে একটি প্রশ্নোত্তর বিনিময়ের সময় সরকারের মুখমাত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করেই স্বীকার করেছিলেন যে লন্ডন আর তার অঞ্চলে পৌঁছাতে ইচ্ছুক সহযাত্রী শিশুদের জন্য কোনো আইনি পথ সরবরাহ করবে না।

অবশ্য এই আইন ছাড়াও রাজনৈতিক আশ্রয়ের ডাবলিন বিধিমালার আওতায় পারিবারিক পুনর্মিলন আইনের মাধ্যমেও অপ্রাপ্তবয়স্কদের যুক্তরাজ্যে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু ব্রেক্সিটের পর আইন পরিবর্তন করে সেটিও প্রত্যাহার করা হয়েছিল। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়নত্যাগের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য প্রকৃতপক্ষে ডাবলিন বিধিমালা থেকেই বের হয়ে গিয়েছিল। যদিও ইইউ এবং যুক্তরাজ্য এখনও এটি নিয়ে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেনি। 

হাউজ অফ লর্ডসের অনুমোদনের সাথে সাথেই সংশোধনীটি তাই আবারও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল। প্রায় ছয়বছর আগে ২০১৬ যখন এটি করা প্রয়োগ করা হয়েছিল, তখন এর আওতায় ৪৮০ জন সঙ্গীহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক উপকৃত হয়েছিল। যাদের বেশিরভাগ ফ্রান্সের উত্তর ও গ্রিক দ্বীপপুঞ্জে আটকে ছিল। 

ডাবস সংশোধনীটি ১৮ বছরের কম বয়সি সকল কিশোর, শিশু এবং তাদের ভাইবোনদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে।

ডাবস সংশোধনীকে স্বাগত জানিয়েছে অভিবাসন সংস্থা এবং এনজিওগুলো।

তবে এটি পুরোপুরি আইনে পরিণত হতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অফ কমন্সের সদস্যের ভোটে বৈধতা পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে৷

আগামী সপ্তাহে এটি হাউস অফ কমন্সে বৈধতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। 


এমএইউ/এআই


 

অন্যান্য প্রতিবেদন