যুক্তরাজ্যে প্রবেশে অপেক্ষারত বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৫০০ অভিবাসী উত্তর ফ্রান্সের কালের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছেন। ছবি: রয়টার্স
যুক্তরাজ্যে প্রবেশে অপেক্ষারত বিভিন্ন দেশের প্রায় ১৫০০ অভিবাসী উত্তর ফ্রান্সের কালের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছেন। ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্সের উত্তরে ইউক্রেনীয় এবং অন্যান্য জাতীয়তার শরণার্থীদের মধ্যে আচরণগত বৈষম্যে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে অভিবাসন সংস্থা এবং এনজিওগুলো। বাসস্থানসহ বিভিন্ন বর্ণবাদী বৈষম্যের অভিযোগে কালে শহর কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে যাওয়ার কথা ভাবছে অভিবাসন সংস্থা ‘ওবেরজ দে মিগ্রঁ’।

ইউক্রেনে ২৪ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৬০০ জনেরও বেশি ইউক্রেনীয় নাগরিক উত্তর ফ্রান্সের কালে উপকূলে এসেছেন। কালেতে অবস্থানরত অন্যান্য অভিবাসন প্রত্যাশীদের মত নতুন আসা ইউক্রেনীয়দেরও উদ্দেশ্য যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করা। 

নতুন আসা বেশিরভাগ শরণার্থী তাদের পছন্দের হোটেল রুম ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছেন। তবে যাদের সামর্থ্য নেই তাদের জন্য শহর কর্তৃপক্ষ একটি সরকারি যুব হোস্টেলকে জরুরি আবাসন কেন্দ্রে রূপান্তরিত করেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলিতে ইংল্যান্ডের ভিসা পাওয়ার অপেক্ষারত প্রায় ১৪০ জনকে হোস্টেলটিতে রাখা হয়েছে।

ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের রাখতে সর্বমোট প্রায় ৭৫০টি আবাসন ইউনিটের ব্যবস্থা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। 

অপরদিকে কালে তথা উত্তর ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত বিভিন্ন দেশের আশ্রয়প্রার্থীদের নেই কোন থাকার জায়গা এবং সরকারি সুবিধা। শুধুমাত্র অভিবাসন সংস্থা ও এনজিওগুলোর অনুদানে দিন পার করছেন এসব অভিবাসীরা। 

কালের মেয়র নাতাশা বুশার শুরু থেকেই এই বাস্তুচ্যুত লোকদের স্বাগত জানাতে লড়াই করে আসছিলেন। এমনকি নতুন আসা ইউক্রেনীয়দের অনেকেই নগর কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত একটি রেস্তোরাঁতে বিনামূল্যে খাবার খেতে সক্ষম হয়েছিলেন। 

ইচ্ছুক ইউক্রেনীয়রা যেন দ্রুত একটি অনুমতিপত্র নিয়ে যুক্তরাজ্যে যেতে পারেন অথবা অস্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান, সে লক্ষ্যে ফরাসি সরকার এবং ব্রিটিশ কনস্যুলেটের পরিষেবাগুলির সাথে নিয়মিত লড়াই করছেন নাতাশা বুশার।  

একটি ইউক্রেনীয় পরিবারকে সাথে নিয়ে গণমাধ্যমের সামনে তিনি বলেন, “আমরা আমাদের শহরে কোন শরণার্থীকে চ্যানেলের যুক্তরাজ্য উপকূল থেকে পুশব্যাক করে ফিরিয়ে দিতে দেব না।”

প্রায় দেড় হাজার অনানুষ্ঠানিক বসতি

কালের বিভিন্ন জায়গায় কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক শিবিরগুলিতে বসবাস করছেন প্রায় ১৫০০ ইউক্রেনীয় নন এমন শরণার্থী। যারা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় অস্থায়ী শিবির করে একেবারে নিঃস্ব অবস্থায় দিন পার করছেন। 

অনানুষ্ঠানিক শিবিরগুলি কয়েক সপ্তাহ পর পর প্রশাসনের পক্ষে থেকে ভেঙে দেয়া হয়। অভিবাসীদের অভিযোগ, তারা এসব উচ্ছেদের সময় তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সংগ্রহ করতে পারেন না কারণ তাদেরকে আগে থেকে জানানো হয় না। 

উল্টো অস্থায়ী শিবির তৈরি ঠেকাতে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সংশ্লিষ্ট জায়গাগুলোতে সাইকেল রাখার পার্কিং, পার্ক এবং বিভিন্ন গাছ লাগিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে শহর কর্তৃপক্ষ।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে একটি বিশেষ ডিক্রি জারি করে কালে শহরে যুক্তরাজ্যে যেতে অপেক্ষারত অভিবাসীদের মধ্য এনজিওগুলোর খাবার বিতরণ কর্মসূচি নিষিদ্ধ করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। 

করোনা মহামারির সময় প্রবর্তিত কারফিউর অজুহাতে স্থানীয় প্রশাসন নানাভাবে পুলিশি হয়রানি করেছে বলে অভিযোগ করেছিল অভিবাসন সংস্থা ও অধিকারকর্মীরা। 

শরণার্থীদের সাথে এই আচরণগত পার্থক্যটি উত্তর ফ্রান্সে সক্রিয় এনজিওগুলোকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।  

ইতুপিয়া৫৬ সংস্থার কালে অঞ্চলের সমন্বয়কারী মার্গুরেইত কোম্ব বলেন, “আমরা ইউক্রেনীয়দের জন্য সংরক্ষিত আতিথেয়তাকে অভিনন্দন জানাই কিন্তু আমরা অন্যান্য শরণার্থীদের সাথে ঠিক উলটো এবং দ্বি-মুখী আচরণ দেখছি।”

আরেক অভিবাসন সংস্থা ওবেরজ দে মিগ্রঁ’র সমন্বয়কারী উইলিয়াম ফুইয়ার্ড বলেন, “আমরা বছরের পর বছর ধরে সব শরণার্থীদের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ এবং নিঃশর্ত অভ্যর্থনার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু আমাদেরকে সবসময় বলা হয়েছে এটি অসম্ভব এবং কোন উপায় নেই। অথচ এখন কয়েকদিনের মধ্যে আমরা বিকল্প উদ্যোগ নিতে দেখছি।”

এই অধিকারকর্মী কর্মী জোর দিয়ে বলেন, “নতুন গ্রহণ করা ইউক্রেনীয় মডেল প্রত্যেক দেশের শরণার্থীদের জন্য অনুসরণ করতে হবে।”

"বর্ণবাদী" যুক্তি

নতুন আগত অভিবাসীদের স্থানীয় নাগরিকদের বাসায় স্বাগত জানাতে সৃষ্ট প্লাটফর্ম মাইগ্রেশন৫৯ বুধবার একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছে। চিঠিতে স্থানীয় ডিপার্টমেন্টের সমতা বিধানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামি তুবিয়ানাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, "শরণার্থীদের অভ্যর্থনা নিশ্চিত করতে যেন কোন ধরনের বৈষম্য করা না হয়।’

মাইগ্রেশন৫৯ ইউক্রেনীয়দের জন্য নেয়া অনেক পৌরসভার সংঘবদ্ধ সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়ে বলেছে, “এটি ভাল পদক্ষেপ কারণ আমরা কালেতে শত শত অভিবাসীদের সাথে দেখা করি যারা সুদান, চাদ, সিরিয়া, আফগানিস্তানের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা মানুষ।”

প্লাটফর্মটির মতে, “অন্য জাতিগত বা ধর্মীয় অনুষঙ্গ আছে এমন অভিবাসীদের বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য অভ্যর্থনার স্থান সংরক্ষিত করা সম্পূর্ণ আপত্তিকর, বেআইনি এবং বর্ণবাদী আচরণ হবে।”

অনেকগুলো মানবিক কাজে সম্পৃক্ত থাকার কথা দাবি করে কালের মেয়র নাতশা বুশার স্থানীয় গনমাধ্যমকে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি আমি একটি মিথ্যা প্রচারণার শিকার। আমাকে দেওয়ার মতো কোনো মানবিক শিক্ষা অভিবাসন সংস্থা ও এনজিওগুলোর নেই।”

ওবেরজ দে মিগ্রঁ জানায়, অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের অভিযোগে আমরা কালে শহর কর্তৃপক্ষ এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ দায়ের করার কথা বিবেচনা করছি।

ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্স ব্লু নর্দকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে সংস্থাটির সভাপতি ফ্রঁসোয়া গুয়েনো স্থানীয় কর্তৃপক্ষের যুক্তিকে একটি "বর্ণবাদী" যুক্তি আখ্যা দিয়ে নিন্দা করেন।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, “ভিন্ন লিঙ্গ, ভিন্ন গায়ের রঙ বা ভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে অসম আচরণ করা একটি গর্হিত অপরাধ।”

বাসস্থান ছাড়াও যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ক্ষেত্রেও ইউক্রেনীয় এবং অন্য দেশের শরণার্থীদের জন্য আলাদা নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ঢুকতে যেখানে ইউক্রেনীয়দের বিশেষ ভিসা দেওয়া হচ্ছে সেখানে অ-ইউক্রেনীয়দের কোন ভিসা দেওয়া হয় না। 

আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফগানিস্তান থেকে আসা অভিবাসীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক কিংবা অস্থায়ী নৌকায় লুকিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করেন। 

গত বছর নৌকাডুবিতে ইংলিশ চ্যানেলে অন্তত ৩০ জন মারা যায় এবং চারজন নিখোঁজ হয়।


এমএইউ/এআই 


 

অন্যান্য প্রতিবেদন