২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়া তিন কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী মারিন লো পেন, এরিক জেমুর এবং নিকোলা দুপো এইনিওঁ। ছবি: ফ্রান্স২৪
২০২২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লড়া তিন কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী মারিন লো পেন, এরিক জেমুর এবং নিকোলা দুপো এইনিওঁ। ছবি: ফ্রান্স২৪

আসন্ন ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়া তিন উগ্র-ডানপন্থি প্রার্থী আবারও অভিবাসনকে তাদের প্রচারণার মূল বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তিন কট্টরডানপন্থি প্রার্থী মারিন লো পেন, এরিক জেমুর এবং নিকোলা দুপো এইনিওঁ’র নির্বাচনি ইশতেহারগুলো প্রায়ই কাছাকাছি। এই তিন প্রার্থীর অভিবাসন নীতি ও প্রস্তাবনাগুলোর সম্ভাবনা নিয়ে ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলার পাঠকদের জন্য বিশেষ প্রতিবেদন।

ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২২ এর প্রথম দফা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১০ এপ্রিল। নির্বাচনে বাম, কট্টরবাম, ডান ও কট্টরডানপন্থিসহ বিভিন্ন ব্লকের রাজনৈতিক আদর্শের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। গত পর্বে ইনফোমাইগ্রেন্টসের পাঠকদের জন্য বাম, কট্টর বামপন্থি, মধ্যপন্থি ও ডানপন্থি রাজনৈতিক বলয়ের প্রার্থীদের অভিবাসন প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়েছিল। 

পড়ুন>> ২০২২ সালের ফরাসি নির্বাচনে এমানুয়েল ম্যাক্রঁ'র অভিবাসন নীতি

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো তিন কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিবিদ প্রার্থী হয়েছেন। ২০১৭ সালের নির্বাচনে সর্বশেষ দুইজন কট্টর ডান বক্লের প্রার্থী নির্বাচনে লড়াই করেছিলেন। তাদের মধ্যে মারিন লো পেন দ্বিতীয় দফায় গিয়ে বর্তমান রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁর কাছে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলেন। 

এরিক জেমুর

প্রথমবারের মতো ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন আলোচিত-সমালোচিত সাংবাদিক ও টিভি উপস্থাপক এরিক জেমুর। তিনি তার প্রতিষ্ঠিত নতুন দল ‘রোঁকনকেত’ থেকে প্রার্থী হয়েছেন। নির্বাচনের শুরুর দিকে তিনি জনমত জরিপে তৃতীয় এবং বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর অতীতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুটিনের সাথে সখ্যতার ইস্যুতে বর্তমানে প্রায় সবগুলো জনমত জরিপে ভোট সংখ্যার ১০ শতাংশ নিয়ে পঞ্চম অবস্থানে আছেন সাবেক এই সাংবাদিক। 


জেমুরের অভিবাসন প্রস্তাবনা

  • নির্বাচিত হলে অনথিভুক্ত বা বৈধ কাগজহীন অভিবাসীদের জন্য বর্তমানে থাকা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছেন এই প্রার্থী। 
  • মধ্যপ্রাচ্যের মাগরেব অঞ্চল (আলজেরিয়া, টিউনিশিয়া ও মরক্কো) এবং আফ্রিকা থেকে আসা অভিবাসীরা ফরাসি মূল্যবোধ শেষ করে দিচ্ছে দাবি করে সকল প্রকার পরিবার পুনর্মিলন ভিসা বাতিলের প্রস্তাব দিয়েছেন এরিক জেমুর। 
  • বর্তমানে আইন অনুযায়ী, ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করা বিদেশি পিতামাতার সন্তানেরা ১১ বছর বয়সের পরে পাঁচ বছর ফরাসি ভূখন্ডে থাকলে তারা ১৮ বছর বয়সে ফরাসি নাগরিত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন। এরিক জেমুর এই পদ্ধতি বিলোপ করার ঘোষণা দিয়েছেন। 
  • ইউরোপের ‘শেঙ্গেন’ জোনে ভিসা ছাড়া ভ্রমণের পদ্ধতিকে ‘পাগলামি’ আখ্যা দিয়ে ফ্রান্সকে এই চুক্তি থেকে সরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এরিক জেমুর। 
  • প্রতি বছর শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির মধ্যেই রাজনৈতিক আশ্রয়ের সুযোগ সীমাবদ্ধ করতে চান এরিক জেমুর। 
  • যেকোন ধরনের অপরাধে জড়িত অভিবাসীদের তাদের নিজ দেশে বহিষ্কার করতে চান এই প্রার্থী। এক্ষেত্রে উক্ত অভিবাসী কোন কোটায় আছেন বা কত বছর মেয়াদি রেসিডেন্স কার্ড নিয়ে ফ্রান্সে অবস্থান করছেন সেটি বিবেচনায় না নেয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন কট্টর অভিবাসন বিরোধী এই প্রার্থী। 
  • অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ইউরোপ ও ফ্রান্সের বহিঃসীমান্তে দেয়াল নির্মাণের কথা উল্লেখ করেছেন তার নির্বাচনি ইশতেহারে। 

মারিন লো পেন

ফরাসি কট্টর ডানপন্থি রাজনীতিতে মারিন লো পেন সর্বাগ্রে আলোচিত একটি নাম। তার পিতা জঁ মারি লো পেনও ফরাসি রাজনীতিতে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তবে দলের নাম ‘ফ্রঁ নাশিওনাল’ বা ন্যাশনাল ফ্রন্টের নাম পালটে তিনি নির্বাচন করছেন ‘রাসোমব্লমোঁ নাশিওনাল’ বা ন্যাশনাল র‍্যালি থেকে। প্রায় সবগুলো জনমত জরিপে এমানুয়েল ম্যাক্রঁর পরে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ২০১৭ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দ্বিতীয় হওয়া এই প্রার্থী। 


নির্বাচিত হলে কেমন হবে মারিন লো পেনের অভিবাসন নীতি?  

  • পালিয়ে থাকা ও অপরাধে জড়িত অভিবাসীরা বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার সুবিধা নিচ্ছে দাবি করে তিনিও মেডিক্যাল এইড সুবিধা বাতিল করতে চান৷ 
  • ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ তারিখে দেয়া এক বক্তব্যে মারিন লো পেন বলেন, “ফরাসি জনগণকে তাদের সুবিধা ফিরিয়ে দিতে অভিবাসীদের সন্তানদের ফরাসি নাগরিকত্ব পাওয়ার পদ্ধতি কঠোর করা হবে।”
  • দীর্ঘদিন ধরে ফরাসি রাজনীতিতে সকল প্রকার পরিবার পুনর্মিলন ভিসা স্থগিতের দাবি জানিয়ে আসছেন মারিন লো পেন। 
  • জেমুরের মতো তিনিও অপরাধে যুক্ত যেকোন মেয়াদের বসবাসের অনুমতিপ্রাপ্ত অভিবাসীকে তাদের মূল দেশে ফেরত পাঠানোর পক্ষে। 
  • তবে তিনি ইউরোপের শেঙ্গেন জোনে থাকার পক্ষে। মারিন লো পেনের মতে, শেঙ্গেন জোনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে অনিয়মিত অভিবাসনের পক্ষে লড়াই করা। 
  • ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় পদ্ধতি সংষ্কারের কথা বললেও এটি নিয়ে বিশদভাবে ব্যাখা করেন নি এই প্রার্থী। 

নিকোলা দুপো এইনিওঁ

২০১২ এবং ২০১৭ সালের ধারাবাহিকতায় তৃতীয়বারের মতো নির্বাচন লড়ছেন এই প্রার্থী। যদিও শেষ দুই নির্বাচনের প্রথম দফায় মাত্র ১,৭৯ ও ৪,৭০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন দেবু লা ফ্রন্সঁ বা ডিএলএফ দল থেকে নির্বাচনে লড়া নিকোলা দুপো। অপর দুই অভিবাসন বিরোধী প্রার্থীর মতো তার প্রস্তাবনাগুলোও বেশ কঠোর। 

কি রয়েছে তার প্রস্তাবনায়?

  • কোন প্রকার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে অভিবাসীদের জন্য সপ্তাহে একদিন বাধ্যতামূলক কাজের নিয়ম প্রবর্তন করা। 
  • নিকোলা দুপোর মতে, ‘‘দরিদ্র হওয়া একটি অপরাধ৷ এজন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জরিমানা করতে হবে।”
  • মারিন লো পেনের মত এই প্রার্থীও রাজনৈতিক আশ্রয় পদ্ধতি পরিবর্তন করতে চান। 
  • নির্বাচিত হলে প্রথম পাঁচ বছর পরিবার পুনর্মিলন ভিসা স্থগিত করতে চান নিকোলা দুপো। 
  • নির্বাচিত হলে অভিবাসী সন্তানদের নাগরিকত্বের আইনের ব্যাপারে গণভোটের আয়োজন করে সিদ্ধান্তের পক্ষে এই প্রার্থী। 
  • এরিক জেমুরের ধারাবাহিকতায় তিনিও শেঙ্গেন জোন থেকে ফ্রান্সকে বের করে নেয়ার পক্ষে। 
  • কট্টর ডান ব্লকের অপর দুই প্রার্থীর মতো এরিক দুপোও মেডিক্যাল এইড সুবিধা বন্ধ করতে চান। 

এসব প্রস্তাবনা কি বাস্তবায়ন সম্ভব?

এই তিন প্রার্থীর প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে অনেকগুলো তারা নির্বাচিত হলে বাস্তবায়ন করতে পারবেন। তবে কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে আইনি ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। 

উদাহরণস্বরুপ, রাজনৈতিক আশ্রয়ের মর্যাদা দেয় আদালত ১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশনের উপর ভিত্তি করে। সেক্ষেত্রে তারা নতুন করে কী করতে চান সেটি পরিষ্কার নয়। 

ফ্রান্সে জন্ম নেয়া অভিবাসী সন্তানদের নাগরিকত্বের বিষয়টিও স্বয়ংক্রিয় কোন পদ্ধতি নয়। ১৮ বছর হলে বাকী সব শর্ত পূরণ করে যথাযথ আবেদন ও সাক্ষাৎকার দিয়েই নাগরিকত্ব পেতে হয়। 

তারা নির্বাচিত হলে এই প্রক্রিয়ার কোন বিষয়টিতে পরিবর্তন অথবা কঠোরতা আনবেন সেটি উল্লখে করা হয়নি। 

ফ্রান্সকে শেঙ্গেন অঞ্চল থেকে বের করা সম্ভব তবে এটি আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক চ্যালেঞ্জিং একটি ইস্যু। ২০১৭ সালে ফ্রান্স স্ট্র্যাটেজি এবং র‍্যান্ড ইউরোপের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “শেঙ্গেন থেকে বের হয়ে সব সীমান্তে নতুন করে নিজস্ব সীমান্ত ব্যবস্থাপনা করতে চাইলে প্রতি বছর প্রায় দেড় বিলিয়ন ইউরো সমমানের অর্থ খরচ করতে হবে ফরাসি কর্তৃপক্ষকে।”

ফ্রান্স থেকে সব অনিয়মিত বিদেশিদের বহিষ্কারের প্রস্তাবনাটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এক্ষেত্রে অনেকগুলো দেশের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা এবং অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। 

এর বাইরে সামাজিক সুবিধা, বেকার ভাতা সহ নানান প্রস্তাবনাগুলো বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ পেরিয়ে বাস্তবায়ন বেশ কঠিন। এক্ষেত্রে উল্টো সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে বলে মনে করেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। 


এমএইউ/এআই


 

অন্যান্য প্রতিবেদন