২০ বছর বয়সি স্ট্রাইকার অ্যামিলকার জাউ কডজোভি। ছবি: Yevgeni Rebrov/Ukrainian D1 League
২০ বছর বয়সি স্ট্রাইকার অ্যামিলকার জাউ কডজোভি। ছবি: Yevgeni Rebrov/Ukrainian D1 League

উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গিনি বিসাউ থেকে পূর্ব ইউক্রেনের পোলতাভায় প্রথম বিভাগ পেশাদার ফুটবল খেলতে এসেছিলেন ২০ বছর বয়সি স্ট্রাইকার অ্যামিলকার জাউ কডজোভি। তবে ইউক্রেনে হঠাৎ রুশ আক্রমণে পাল্টে গেছে এই খেলোয়াড়ের জীবন৷ বাস্তুচ্যুত হয়ে যুক্তরাজ্যে আশ্রয়ের পথে থাকা এই তরুণ ফুটবলারের গল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনুন৷

২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়ার হামলার পর থেকে ইউক্রেনে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। স্থানীয় জনসাধারণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বুঝে উঠার আগেই রাশিয়ান সৈন্যরা এই অঞ্চলে অগ্রসর হতে শুরু করে৷ তারপর শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ! ইউক্রেনীয় নাগরিকরা ছাড়াও দেশটিতে থাকা হাজারো বিদেশিরা দ্রুত ইউক্রেন থেকে পালাতে থাকে। 

এরকম একজন আফ্রিকান অভিবাসী অ্যামিলকার জাউ কডজোভি। অন্য দশজন অভিবাসীর মতো তিনিও উন্নত জীবন ও সাফল্যের সন্ধানে ইউক্রেনে এসেছিলেন। হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়ে, গিনি-বিসাউয়ের এই ২০ বছর বয়সি তরুণ পেশাদার ফুটলারকে শরণার্থীতে পরিণত হতে হয়েছিল৷ 

অ্যামিলকার জাউ ইউক্রেনের স্থানীয় ক্লাব ভর্সক্লা পোলতাভায় স্ট্রাইকার হিসেবে খেলতে এসেছিলেন৷ ক্লাবটি ইউক্রেনের খারকিভ শহর থেকে প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত৷ রাশিয়ান সেনাবাহিনীর আক্রমণ করা প্রথম শহরগুলোর মধ্যে এই অঞ্চলটি ছিল অন্যতম লক্ষ্যবস্তু। 

এই তরুণ আফ্রিকানের মতে, “তার জীবন এখন একটি নতুন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে৷ ফুটবলার থেকে কর্মহীন হয়েছেন তিনি৷’’

অ্যামিলকারের মতে, তার স্বপ্ন এখন যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত একটি দেশ থেকে ফিরে প্রায় দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে চলেছে৷

সংগ্রামের জীবন

অ্যামিলকার জাউ কডজোভি আফ্রিকার ছোট্ট দেশে গিনি বিসাউতে ২০০২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেন৷ তার বাবা গিনি বিসাউ এবং মা আইভোরি কোস্টের নাগরিক৷ তিন ভাইবোনের মধ্যে অ্যামিলকা সবচেয়ে ছোট৷ আফ্রিকার অস্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে গিয়ে ইউক্রেনে পেশাদার ফুটবল খেলার চেষ্টা করেন এই তরুণ৷ 

অ্যামিলকার বলেন, “আমার বাবা-মা প্রায়শই আমাদেরকে বলতেন তারা আজ যেই অবস্থায় আছে সেখানে পৌঁছানোর জন্য তারা কঠিন সময় পার করে এসেছেন। তাদেরকে আমি সবসময় কোন প্রকার অভিযোগ ও আফসোস ছাড়াই জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করতে দেখেছি৷ এটি আমাকে অতিরিক্ত শক্তি দিয়েছে৷ আমার জীবনকে এগিয়ে নিতে এবং সফল হওয়ার প্রচেষ্টাকে দ্বিগুণ করেছে এই অনুপ্রেরণা৷ আমার মা-বাবার জীবনের অভিজ্ঞতা আমার জন্য গর্বের একটি বড় উৎস৷’’

দৈনন্দিন জীবনের জটিল অধ্যায় পেরিয়ে তরুণ অ্যামিলকার আস্তে আস্তে ফুটবলে সাফল্য দেখাতে শুরু করেন। নিজের এবং তার পরিবারের জন্য একটি ভাল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন এই স্ট্রাইকার। 

তিনি বলেন, ‘‘ফুটবল, আমার পুরো জীবন। আমি সবসময় এটিকে আমার মূল কাজ হিসেবে চেয়েছিলাম৷ এমনকি আমি প্রতি রাতে বালিশের পাশে ফুটবল রেখে ঘুমিয়েছি৷ এটি আমার নিজস্ব সত্ত্বার একটি অংশে পরিণত হয়েছিল৷’’

সন্তানদের একটি ভাল ভবিষ্যত দিতে অ্যামিলকার পরিবার ইউরোপে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয়৷

প্রথম পর্যায়ে তার পরিবার স্পেনে্র মাদ্রিদের শহরতলির ভ্যালেকাসের একটি জনপ্রিয় জেলায় আসেন। সেখানে, তার বাবা মা দ্রুত কাজ খুঁজে পান। চাকুরি খুঁজে পাওয়ায় ভালো সময় ফিরে পেতে শুরু করে পরিবারটি৷

অ্যামিলকার বলেন, “স্পেনের ভালেকাস শহরের জন্য সর্বদা আমার হৃদয়ে একটি বিশেষ স্থান থাকবে। এলাকাটির অধিবাসীরা আমাদের পরিবারের উপর প্রচুর সমর্থন এবং সহানুভূতি দেখিয়েছিল৷ সেখানে অভিবাসীদের সমর্থনে এখন প্রচুর সামাজিক আন্দোলন শুরু হয়েছে৷’’

তিনি তখন ১০ বছর বয়সি ছিলেন৷ তিনি সেখানে প্রায়ই পার্কগুলিতে যেতেন সেখানে আফ্রিকাসহ দক্ষিণ আমেরিকা এবং পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী শিশুদের সাথে ফুটবল খেলতেন। পরবর্তীতে সেখানকার স্থানীয় ক্লাব রায়ো ভ্যালেকানো থেকে স্প্যানিশ লা লিগার প্রথম বিভাগের দলগুলোর নজর কাড়তে তার বেশি সময় লাগে নি।

তিনি স্মরণ করেন, “রায়ো ক্লাবের পক্ষ থেকে যখন আমার বাবা-মায়ের সাথে যোগাযোগ করা হয় তখন আমি পাগলের মতো ছিলাম! আমি পরিবারের সাথে ক্লাবের প্রথম যোগাযোগের দিনটি উৎযাপন করেছিলাম। আমি সেই মুহুর্ত থেকে আমার তারকা খ্যাতিকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম এবং ফুটবল থেকে বেঁচে থাকার স্বপ্নগুলি সম্ভব বলে মনে করছিলাম৷”

ইউক্রেনে প্রথম পেশাদার চুক্তি

‘‘স্পেন থেকে আমি ও আমার পরিবার অন্যান্য বিকল্পগুলি দেখতে শুরু করি৷ একজন তরুণ খেলোয়াড় খেলা ছাড়া খুব বেশিক্ষণ ঘুরে বেড়াতে পারে না৷ একটি ইউক্রেনীয় ক্লাব থেকে খুব আকর্ষণীয় প্রস্তাব পাই৷ 

আমার পরিবারের সাথে আলোচনার পরে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে প্রস্তাবটি খুব ভাল ছিল। পরবর্তীতে আমি ইউক্রেনে আমার জীবনের প্রথম পেশাদার চুক্তিতে স্বাক্ষর করি। পরিবারের সবাই খুব খুশি ছিল৷

২০২২ সালের শীতের শুরু থেকেই আমি আমার ক্লাবের সতীর্থদের সাথে সীমান্তের কাছে রাশিয়ান সেনাবাহিনীর প্রভাব ও উত্তেজনা নিয়ে কথা বলতাম৷ সবাই ভাবত, ক্রেমলিন তাদের পেশিশক্তি দেখানোর জন্য চাপ দিচ্ছিল৷ সত্যি কথা বলতে, কেউ রাশিয়ান সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে বিশ্বাস করেনি,’’ বলেন অ্যামিলকার৷

জানুয়ারি মাসে, সারাদেশে অবস্থানরত রাশিয়ান সৈন্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে অ্যামিলকারের পিতামাতা এবং তার এজেন্ট তাকে ইংল্যান্ডে তাদের সাথে যোগ দিতে বলেন৷ কিন্তু তিনি তার ক্লাবের পরামর্শ অনুসরণ করতে খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন৷  

২২ ফেব্রুয়ারি, তিনি তার সতীর্থদের সাথে তার ২০তম জন্মদিন উদযাপন করেন৷ কিন্তু যখন তিনি রাতে ঘুমাতে বিছানায় যান, তখন বেশ কিছু বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান৷  

তিনি বলেন, “পরদিন সকালে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম৷ ক্লাবের পক্ষ থেকে আমাদেরকে বলা হয়, দ্রুত একটি সমাধান খুঁজে পেতে এবং নিরাপদ থাকতে তাদের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করতে হবে৷’’

অ্যামিলকার যোগ করেন, কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমি ও আমার সতীর্থরা সাথে বুঝতে পেরেছিলাম যে সামন কঠিন দিন আসছে। আমাদের প্রত্যেকের জন্য এটি একটি কঠিন পরিস্থিতি ছিল কারণ কীভাবে পরিস্থিতি সামলাতে হয় তা আসলে ক্লাব কর্তৃপক্ষ জানত না। আমরা সবাই একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম শহর ছেড়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইউক্রেন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে হবে।”

নানা বাধা পেরিয়ে হাঙ্গেরিতে প্রবেশ

অ্যামিলকার কোডজোভি দ্রুত একটি স্যুটকেসে কিছু জিনিসপত্র জড়ো করে আরও এক ডজন লোকের সাথে ইউক্রেন পাড়ি দেয়া উদ্দেশে রওনা দেন৷ প্রথমে তারা সংঘর্ষ থেকে বাঁচতে তিনটি গাড়ির সমন্বয়ে রওনা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন৷ 

২৬ ফেব্রুয়ারি আরও আট সতীর্থকে নিয়ে পোলতাভা শহর ত্যাগ করেন এই তরুণ ফুটবলার৷ 

প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ যাত্রায় ইউক্রেনের পূর্ব থেকে পশ্চিমে থাকা পোল্যান্ড সীমান্ত পৌঁছতে রীতিমত সংগ্রাম করতে হয় তাদের। দূর থেকে আসা গুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শুনে হৃদয়ে কাঁপন ধরে যেত৷ যাত্রাপথে গাড়ির টায়ার নষ্ট হয়ে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় একের পর এক বিপদে তাদের যাত্রা আটকে যাচ্ছিল৷ 

পোল্যান্ড সীমান্তে এসে লাখো মানুষের ভিড় দেখে তারা বিস্মিত হয়ে পড়েছিলেন৷ সেখানে আর দেরি না করে পুরো দলটি আবার হাঙ্গেরি সীমান্তের দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়৷ 

‘‘আমরা এরইমধ্যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম কিন্তু হাল ছাড়িনি৷ আমাদের গাড়িগুলিকে সীমান্ত থেকে কয়েকশ মিটার দূরে রেখে যেতে হয়েছিল এবং আমরা পায়ে হেঁটে পার হতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু হাঙ্গেরিয়ান পুলিশ আমাদের পথ বন্ধ করে দিয়ে জানায়, এটি পায়ে হেঁটে যাওয়ার মতো কোন সীমান্ত নয়৷ আমাদেরকে অবশ্যই গাড়িতে থাকতে হবে এবং প্রত্যেকের আইডি ও অন্যান্য নথিগুলি ক্রমানুসারে সাজাতে হবে,’’ বলেন অ্যামিলকার৷

তিনি বলেন, ‘‘সে সময়, ভেবেছিলাম আমরা হয়ত আটকে যাব৷ আমরা হিমাঙ্কের নীচে ৭ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ঠান্ডায় দুই রাত কাটিয়েছিলাম৷ এর চেয়ে কঠিন রাত আমার জীবনে আর কখনও আসেনি৷

অবশেষে তৃতীয় দিনে, অলৌকিক ঘটনা ঘটে৷ আমরা একটি অচলাবস্থার মধ্যে ছিলাম৷ বন্ধু ও সতীর্থ ইভান পেসিকের সহায়তায় আমরা বুদাপেস্টে অবস্থিত ক্রোয়েশিয়া দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে তাদের উপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করি৷ আমি জানি না এটি কীভাবে হয়েছিল, তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়েছিল৷

অবশেষে আমরা ক্রোয়েশিয়ান দূতাবাসের সহায়তায় হাঙ্গেরিতে প্রবেশের অনুমতি পাই৷ ক্রোয়েশিয়ার জাগরেভে জন্ম নেয়া মিডফিল্ডার ইভান বলেন, ‘‘আমার বন্ধুকে সাহায্য করতে পেরে আমি খুব খুশি হয়েছি৷’’

 হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করে অ্যামিলকার সবার সাথে বুদাপেস্টে যাযন এবং সেখানে চারদিন অবস্থান করেন। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের প্রথম খাবারের জন্য ম্যাকডোনাল্ডসে গিয়েছিলাম৷ আমার মনে হচ্ছিল, এত মজার মধ্যাহ্নভোজ আমি আগে কখনও খাই নি৷”

এখন তিনি ইংল্যান্ডে থাকা তার পরিবারের সদস্যদের সাথে আছেন৷ অ্যামিলকার জাউ কডজোভি তার পরবর্তী কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন৷ 

“আমি একটি নতুন ক্লাব খুঁজে বের করে সেখানে আমার ক্যারিয়ার চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রশিক্ষণ নেয়ার চেষ্টা করব৷ আমি এই ঘটনাটি কখনোই ভুলব না, আমি কখনোই ইউক্রেনকে ভুলব না যা আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে৷ কারণ আমাকে পেশাদার পর্যায়ে আমার প্রথম ম্যাচ খেলার সুযোগ করে দিয়েছিল ইউক্রেন৷’’

“আমার কাছে শক্তি আছে এবং আমি এই কঠিন অভিজ্ঞতাকে প্রতিদিন আরও কঠিন লড়াইয়ে জেতার জন্য ব্যবহার করব৷ ভবিষ্যতে কিছুই নিশ্চিত নয়, আপনাকে লড়াই করতে হবে এবং সর্বদা বিশ্বাস করতে হবে যে সেরাটি দেয়া সম্ভব৷ এটাই আমার দর্শন এবং এই সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাটি ছিল এর নিখুঁত উদাহরণ৷ আমি কখনো হার মানব না”, দৃঢ়ভাবে বলেন এই ফুটবলার৷ 


এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন