গত বছরের আগস্টে বসনিয়ার লিপা ক্যাম্পে এক অভিবাসী৷ ছবি:এপি/পিকচার অ্যালায়েন্স
গত বছরের আগস্টে বসনিয়ার লিপা ক্যাম্পে এক অভিবাসী৷ ছবি:এপি/পিকচার অ্যালায়েন্স

ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসনপ্রত্যাশীরা বসনিয়ায় পৌঁছাতে গিয়ে নানা নির্যাতন ও সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন৷ ৮০ শতাংশ অভিবাসীই যাত্রাপথে চুরি, ডাকাতি, শারীরিক বা মানসিক কোনো না কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন৷ আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম এর এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে৷

এশিয়ার দেশগুলো থেকে ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অনেকেই বলকান রুট হয়ে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন৷ পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, মরক্কো, গাম্বিয়া, ইরাকসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসীরা এই পথে যাতায়ত করছেন৷ ‘ট্রানজিট’ দেশ হিসেবে তারা ব্যবহার করেন বসনিয়া অ্যান্ড হ্যার্ৎসেগোভিনাকে৷ গত ডিসেম্বরে দেশটির বিভিন্ন সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করা ৩১৯ জন অভিবাসীর উপর একটি জরিপ চালায় আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম৷ চলতি সপ্তাহে এই বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংস্থাটি৷ অভিবাসীরা কেন অনিয়মিত উপায়ে ইউরোপ পাড়ি দেয়ার ঝুঁকি নেন, কোন দেশে পৌঁছাতে চান তারা, কত টাকা খরচ করেন, কী ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হন এমন সব তথ্য উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে৷ 

ছয় শতাংশ বাংলাদেশি

২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো এমন জরিপ চালায় আইওএম৷ সেসময় বসনিয়া অ্যান্ড হার্ৎসেগোভিনাতে অবস্থান করা অনিয়মিত অভিবাসী সংখ্যা ছিল ২৪ হাজার ৬৭ জন৷ ২০১৯ সালে রেকর্ড ২৯ হাজার ১৯৬ জন তথ্য পায় সংস্থাটি৷ তবে পরবর্তীতে সীমান্তে কড়াকড়ি ও করোনাকালীন ভ্রমণে বিধিনিষেধের কারণে এই সংখ্যা কমতে থাকে৷ ২০২০ সালে ১৬ হাজার ১৫০ জন এবং ২০২১ সালে ১৫ হাজার ৭৪০ অভিবাসী অনিয়মিত উপায়ে বসনিয়া প্রবেশ করেন৷ 

জরিপ অনুযায়ী, অভিবাসীদের মধ্যে শীর্ষ রয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আগতরা৷ তাদের সংখ্যা ৩১ শতাংশ করে৷ আট শতাংশ এসেছেন ইরান থেকে আর ছয় শতাংশ বাংলাদেশ থেকে৷ এরপরই রয়েছেন মরক্কো, গাম্বিয়ার অভিবাসনপ্রত্যাশী৷ 

জরিপে অংশগ্রহণকারী অভিবাসীদের মধ্যে মাত্র নয় শতাংশ ছিলেন নারী৷ ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সি ছিলেন পাঁচ শতাংশ৷ 

পড়ুন: বসনিয়া থেকে কোথায় গেলেন কয়েকশ বাংলাদেশি?

দেশ ছাড়ার কারণ

৩৭ শতাংশ অভিবাসী দেশ ছাড়ার জন্য নিজ দেশের যুদ্ধ ও সংঘাতকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন৷ চাকরি না পাওয়াসহ অর্থনৈতিক কারণে দেশ ছেড়েছেন ৩৩ শতাংশ৷ এছাড়া ১০ শতাংশ সহিংসতার শিকার ও সাত শতাংশ রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে অভিবাসনের পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানান৷ 

দেশভিত্তিক হিসাবে ৬৭ শতাংশ আফগান ও ১৬ শতাংশ পাকিস্তানি প্রধান কারণ হিসাবে যুদ্ধ ও সংঘাতকে চিহ্নিত করেছেন৷ অর্থনৈতিক কারণে দেশ ছাড়াদের মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন পাকিস্তানি (৫৬%), ইরানি (৯%), মরক্কানরা (৮%)৷ ব্যক্তিগত সহিংসতার শিকার হওয়ার আশঙ্কায় দেশ ছাড়াদের মধ্যে ৩০ শতাংশই আফ্রিকান দেশগুলোর অভিবাসী৷ ২৫ শতাংশ পাকিস্তানি, ১২ শতাংশ আফগান ও ইরানি এই কারণ উল্লেখ করেছেন৷ এর মধ্যে এলজিবিটিকিউআই প্লাস সদস্যরাও রয়েছেন৷ 

বসনিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছেন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও৷ ছবি: ডয়চে ভেলে
বসনিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছেন বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীরাও৷ ছবি: ডয়চে ভেলে

যেভাবে পাড়ি জমান

৫৭ শতাংশ অভিবাসী জানিয়েছেন তারা দলগতভাবে রওনা হয়েছিলেন৷ বাকিরা নিজে নিজেই পাড়ি জমিয়েছেন৷ দলগতভাবে পাড়ি জমানোদের মধ্যে ৪০ শতাংশ নিজেদের পরিবার বা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যাত্রা করেন৷ সহায়তাকারী বা দালালদের সঙ্গে এসেছেন এমন সংখ্যা চার শতাংশ৷ 

বিভিন্ন পথে তারা বসনিয়া অ্যান্ড হ্যার্ৎসেগোভিনা পৌঁছান৷ অর্ধেকের বেশি অভিবাসী নিজ দেশের বাইরে অন্য কোন দেশ থেকে এসেছেন৷ এর মধ্যে ৪৬ শতাংশই এসেছেন গ্রিস হয়ে৷ তুরস্ক থেকে ৩৩ শতাংশ, ইরান থেকে সাত শতাংশ ও সার্বিয়া থেকে পাড়ি জমিয়েছেন ছয় শতাংশ৷

আফগানিস্তানের নাগরিকরা মূলত ইরান, তুরস্ক ও গ্রিস হয়ে বসনিয়ায় পৌঁছান৷ অনেকে অন্য কোনো দেশে অভিবাসী হওয়ার পর সেখান থেকে তুরস্ক, গ্রিস হয়ে দেশটিতে আসেন৷ গ্রিস থেকে পরবর্তীতে নর্থ মেসিডোনিয়া, সার্বিয়া হয়ে অথবা আলবেনিয়া থেকে মন্টেনিগ্রো হয়ে বসনিয়ায় পৌঁছান৷

পড়ুন: চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে বসনিয়া

যাত্রার খরচ

শুধু বসনিয়া পৌঁছাতেই এই অভিবাসীরা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক লাখ টাকা থেকে শুরু করে সাড়ে আট লাখ টাকার উপরে খরচ করেছেন৷ ৩৬ শতাংশ জানিয়েছেন তারা পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার ব্যয় করেছেন৷ ২২ শতাংশ খরচ করেছেন আড়াই হাজার থেকে পাঁচ হাজার ডলার৷ এক হাজার থেকে আড়াই হাজার ডলার ব্যয় করেছেন ১১ শতাংশ অভিবাসী৷ আট শতাংশ সঠিক হিসাবটি বলতে পারেননি৷ 

১৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তাদের ১০ হাজার ডলার বা সাড়ে আট লাখ টাকার উপরে খরচ হয়েছে বসনিয়া পৌঁছাতে৷ অভিবাসীদের মধ্যে ৩১ শতাংশ নারী আর ১৭ শতাংশ পুরুষ এই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন৷ 

অভিবাসীরা যাত্রাকালীন এই খরচ নানাভাবে সংগ্রহ করেছেন৷ প্রায় অর্ধেকই নিজেরা টাকা দেয়ার কথা জানিয়েছেন৷ ২৯ শতাংশ পরিবারের সহায়তায়, ১৫ শতাংশ জমি বিক্রি, ১০ শতাংশ বিদেশে থাকা স্বজনদের সহায়তায়, নয় শতাংশ দেশে বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেছেন৷ ঋণ করে বিদেশ পাড়ি দেয়া টাকা জোগাড় করেছেন পাঁচ শতাংশ অভিবাসী৷

এই অভিবাসীদের মূল গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো৷ তবে সেই লক্ষ্যপূরণ সবার জন্য সহজ হয় না৷ তাদের অনেকেই দিনের পর দিন আটকে থাকেন বসনিয়াতেই৷ জরিপকালীন সময়ে অংশগ্রহণকারীদের ২২ শতাংশই এক বছরের বেশি সময় ধরে দেশটির বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন৷ ২১ শতাংশ ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত বসনিয়ায় আছেন৷ আর ৫৭ শতাংশ ছয় মাসের কম সময় সেখানে আছেন৷ 

ঝুঁকি

৮০ শতাংশ অভিবাসীরা যাত্রাপথে চুরি, ডাকাতি, এবং শারীরিক বা মানসিক কোনো না কোন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন৷ এক তৃতীয়াংশ জানিয়েছেন তারা সহিংসতা, নির্যাতন বা শোষণের শিকার হয়েছেন৷ যাত্রাপথে অনাহারে কাটানো, বিনা মজুরিতে শ্রম দেওয়া, নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন অনেকে৷ অপ্রাপ্তবয়স্কদের তাদের যাত্রাকালে শারীরিক নির্যাতন ভোগ করেছেন৷ 

বসনিয়ায় এসে বা আসার পথে ডাকাতির শিকার হয়েছেন ৪০ শতাংশ৷ দুই তৃতীয়াংশ তাদের কাগজপত্র চুরি যাওয়ার কথা বলেছেন৷ জ্বর, জখম হওয়াসহ নানা শারীরিক সমস্যা এবং মানসিক সমস্যায়ও পড়েন তারা৷ অর্ধেকই এখন তাদের পরবর্তী যাত্রা শুরুর জন্য আর্থিক সংকটে আছেন বলে জানিয়েছেন৷ 

কোথায় যেতে চান

বসনিয়ায় বসবাসরত অভিবাসীদের বেশিরভাগের লক্ষ্য ইটালি৷ ৩০ শতাংশই জানিয়েছেন তারা পূর্ব ইউরোপের এই দেশটিতে যেতে চান৷ জার্মানি যেতে চান ২২ শতাংশ আর ১৪ শতাংশ যেতে চান ফ্রান্সে৷ বাকিরা ইউরোপের অন্য কোনো দেশে যেতে চান৷ 

এই অভিবাসীদের ৯১ শতাংশই জানিয়েছেন তারা নিজ দেশে ফেরত যেতে চান না৷ তবে নয় শতাংশ জানিয়েছেন তারা দেশে ফিরে যেতে চান অথবা সুযোগ থাকলে বসনিয়াতেই বসবাস করতে আগ্রহী তারা৷

পড়ুন: বসনিয়ায় বৈধ বাংলাদেশি নির্মাণকর্মী, নতুন সম্ভাবনা

এফএস/এডিকে 

 

অন্যান্য প্রতিবেদন