স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়া দ্বীপে আরগিইনেগিন বন্দরে একটি স্প্যানিশ উপকূলরক্ষী  বাহিনীর জাহাজ থেকে অবতরণ, ৪ এপ্রিল, ২০২২৷ ছবি: রয়টার্স/বোর্হা সুয়ারেজ
স্পেনের গ্রান ক্যানারিয়া দ্বীপে আরগিইনেগিন বন্দরে একটি স্প্যানিশ উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ থেকে অবতরণ, ৪ এপ্রিল, ২০২২৷ ছবি: রয়টার্স/বোর্হা সুয়ারেজ

সুখের আশায় ইউরোপের পথে দীর্ঘ যাত্রা৷ কেউ নিঃস্ব হয়ে পড়েন, কেউ বা প্রাণ হারান৷ ইউরোপের দেশগুলির মধ্যে স্পেনে পৌঁছানোর রাস্তাও অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর সময় প্রাণ হারিয়েছেন একাধিক অভিবাসী৷

সমুদ্রপথে ক্যানারির দিকে যাওয়া আটলান্টিক রুটটি তীব্র স্রোতের কারণে অত্যন্ত বিপজ্জনক৷ কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভূমধ্যসাগরে মানবপাচার ও সমুদ্র পারাপার নিয়ন্ত্রণ কঠোর হওয়ার কারণে ইউরোপে পৌঁছাতে ইচ্ছুক অভিবাসীরা এই পথটি বেশি ব্যবহার করছেন৷ জাতিসংঘের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, ক্যানারি আসার পথে প্রতি পাঁচ জন অভিবাসীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে বা একজন নিখোঁজ হয়েছেন৷ 

গত দুই বছরে স্পেনে অনিয়মিত অভিবাসীদের সংখ্যা অনেকটাই বেড়েছে৷ বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্যানারি আসার পথে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে৷ অভিবাসীদের অনেকেই প্রাণ হারিয়েছেন৷ 

জাতিসংঘের ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস’ রিপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিষয়ক সংস্থার (আইওএম) রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে নিজের দেশ থেকে অন্য দেশে যাওয়ার পথে পাঁচ হাজার ৭৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ ২০২১ সালে আটলান্টিক পেরিয়ে স্পেনের এই দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছাতে গিয়ে হাজারেরও বেশি অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন৷


আটলান্টিকে একটি অভিবাসী নৌকাকে সহায়তা করছে স্পেনের কর্তৃপক্ষ | ছবি: সাসেমার
আটলান্টিকে একটি অভিবাসী নৌকাকে সহায়তা করছে স্পেনের কর্তৃপক্ষ | ছবি: সাসেমার


স্পেনের সংবাদসংস্থা এফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাঁচ বছরে ক্যানারিতে আগত অভিবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে হুড়মুড়িয়ে৷ ২০১৭ সালে এই পথে ইউরোপে আসতে গিয়ে একজন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছিল৷ ২০১৮ সালে প্রাণ হারান ৪৩ জন অভিবাসী৷ ২০১৯ সালে ২০২ জন অভিবাসী ক্যানারি আসার পথে প্রাণ হারান৷

এফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালে এক হাজার ২৩০ জন অভিবাসী ক্যানারি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন৷ এদের মধ্যে ৮৭৭ জন অভিবাসীর মৃত্যু হযেছিল৷ ২০২১ সালে এক হাজার ৪৮৮ জন অভিবাসী ক্যানারি পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিলেন৷ তার মধ্যে এক হাজার ১০৯ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ আইওএম বলছে, এই সংখ্যা আসলে হিমশৈলের চূড়া মাত্র৷ কারণ উদ্ধার হওয়া দেহ কিংবা সঙ্গে থাকা অন্য অভিবাসীদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিসংখ্যান তৈরি করা হয়েছে৷ অনেক সময় অভিবাসীসমেত নৌকাগুলি জলে ডুবে যায়৷ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জলে তলিয়ে মৃত্যু হলে তার কোনো খোঁজ মেলে না৷


ক্যানারির পথে বাড়ছে মৃত্যু

জাতিসংঘের ‘মিসিং মাইগ্রেন্টস’ রিপোর্ট অনুযায়ী ক্যানারি আসার পথে ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ২৬০০টি মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে৷ ২০২১ সালে ১১.৫ শতাংশ অনিয়মিত অভিবাসী ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ হয়ে ইউরোপে প্রবেশ করছেন৷

আইওএম এবং ফ্রন্টেক্সের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ৪.৯ শতাংশ অভিবাসী ক্যানারি আসার পথে প্রাণ হারিয়েছেন৷ ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে আসার পথে যেখানে এক দশমিক নয় শতাংশ অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে৷ অর্থাৎ ক্যানারি আসার পথে দ্বিগুণেরও বেশি অভিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন৷

আইওএম জানিয়েছে, ২০২২ সালের প্রথম তিন মাসেই ক্যানারি আসার চেষ্টা করেছিলেন ১৬৮ জন অভিবাসী৷ এর মধ্যে ১৪৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন৷ এছাড়াও ২০২২ সালের মার্চ মাসে মৌরিতানিয়া থেকে এল ইয়েরো যাওয়ার পথে ২৫ জন অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে৷


স্প্যানিশ উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ থেকে অভিবাসীদের অবতরণ, ৪ এপ্রিল, ২০২২ | ছবি: রয়টার্স/বোর্হা সুয়ারেজ
স্প্যানিশ উপকূলরক্ষী বাহিনীর জাহাজ থেকে অভিবাসীদের অবতরণ, ৪ এপ্রিল, ২০২২ | ছবি: রয়টার্স/বোর্হা সুয়ারেজ


নাবালকদের কী পরিস্থিতি

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্থানের অভাবে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে আসা অভিভাবকহীন নাবালকদের অবস্থা শোচনীয়৷ আইওএম বলছে, শুধুমাত্র ২০২২ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে ৪২টি সদ্যোজাত শিশু, তিন থেকে ১১ বছর বয়সি ৮৮ জন, ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি ৫৮৫ জন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছেছে৷

ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ কর্তৃপক্ষ স্প্যানিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ‘উপকূল এলাকায়’ শিশু সুরক্ষার কাজে যুক্ত কর্মী নিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছে৷ যাতে অভিবাসীরা দ্বীপে পৌঁছানোর পর তাদের বয়স জানা সম্ভব হয়৷

ইউরোপা প্রেস সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, সোমবার অর্থাৎ চৌঠা এপ্রিল ৯৭ জন অভিবাসী ক্যানারি পৌঁছেছেন৷ তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিল কর্তৃপক্ষ৷ তারা নিরাপদেই রয়েছেন৷


আরকেসি/কেএম (এফে, ইউরোপা প্রেস,ইনফোমাইগ্রেন্টস)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন