(ফাইল ছবি) প্যারিসের একটি পার্কে স্থাপিত অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয়পার্থীরা। ছবি: এমএসএফ
(ফাইল ছবি) প্যারিসের একটি পার্কে স্থাপিত অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয়পার্থীরা। ছবি: এমএসএফ

সপ্তাহ গড়ালেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তবে এবারের প্রচারণায় অভিবাসন নিয়ে কিছু প্রার্থীর অনুমান নির্ভর বক্তব্য এবং মিথ্যা প্রতিশ্রুতি অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। নির্বাচনে জিততে মরিয়া এমন অনেক প্রার্থী এই ইস্যু নিয়ে সর্বোচ্চ মিথ্যাচার করেছেন বলে উঠে এসেছে ফরাসি গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে। এসব অভিযোগের বিশ্লেষণ নিয়ে ইনফোমাইগ্রেন্টস বাংলার পাঠকদের জন্য বিশেষ প্রতিবেদন।

আগামী ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হবে ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। করোনা মহামারিজনিত সংকট কাটিয়ে উঠার আগেই ইউরোপে শুরু হয়েছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। এমন পরিস্থিতিতে এবারের ফরাসি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইউরোপে বেশ তাৎপর্য বহন করছে। কিন্তু অতীতের সব নির্বাচনের তুলনায় এবারের প্রচারণায় একদম সামনে উঠে এসেছে অভিবাসী ও অভিবাসন ইস্যু। 

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতারত কট্টর ডানপন্থি তিন প্রার্থীর পাশাপাশি ডানপন্থি লে রিপাবলিকান দলের প্রার্থীও এবার অভিবাসন নিয়ে বহু ভুল ও অনুমান নির্ভর তথ্য ছড়িয়েছেন। নির্বাচনি প্রচারণায় উঠে আসা ভুল তথ্য ও প্রস্তাবনাগুলোর বিশ্লেষণ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল। 

ভুল ধারণা ১: বিদেশিদের জন্য সরকারের প্রচুর অর্থ ব্যয় হয় 

প্রথমবারের মতো নির্বাচন লড়া কট্টর ডানপন্থি প্রার্থী এরিক জেমুর ৫ ফেব্রুয়ারি এক সমাবেশে বলেন, “আপনারা কি জানেন বিনামূল্যে বাসস্থানের পাশাপাশি আমরা প্রত্যেক রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীকে প্রায় এক বছরের জন্য প্রতি মাসে ৪৩০ ইউরো ভাতা দিয়ে থাকি।”

ফ্যাক্টচেক: ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে এটি ভুল তথ্য। প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাসিক ভাতা পান না। রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন জমা দেয়ার পরই এই টাকা দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি আবাসন দেয়া হলে সেক্ষেত্রে আবাসনের জন্য নির্ধারিত টাকা কেটে রাখা হয়।  

অপরদিকে, সর্বশষ তথ্য অনুযায়ী ফ্রান্সের ৩০ শতাংশ আশ্রয়পার্থী কোনো প্রকার সরকারি আবাসন না পেয়ে রাস্তা অথবা অস্থায়ী জায়গায় বাস করছে। অর্থাৎ বিনামূল্যে আবাসনের পাশাপাশি ৪৩০ ইউরো প্রদানের বক্তব্যটি ভুল। 

পড়ুন>>ফরাসি নির্বাচনে কোন প্রার্থীর অভিবাসন নীতি কেমন?

এছাড়া, আশ্রয়প্রার্থীদের পরিচর্যার জন্য ফরাসি সরকার ২০২১ সালে জাতীয় বাজেট থেকে ১.৩ বিলিয়ন ইউরো সমমানের অর্থ খরচ করেছে। এটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মোট বাজেটের মাত্র ৪.৮% প্রতিনিধিত্ব করে। 

আশ্রয়প্রার্থীদের পেছনে যা খরচ হয় সেটি ফরাসি জাতীয় মোট বাজেটের মাত্র ০.২ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। যা পুরো রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে এক ফোঁটা জলের সমান।

ভুল ধারণা ২: বিদেশিরা শুধুমাত্র সরকারি ভাতা পেতে ফ্রান্সে আসে

এটি ডানপন্থিদের নির্বাচনি প্রচারণার অন্যতম প্রিয় একটি বাক্য। প্রার্থীরা নির্বাচনি সমাবেশগুলোতে বলেন, এখানে আসা বিদেশিদের কারণে ফরাসিদের জন্য আরও উন্নত সামাজিক সুবিধা সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না।

ফ্যাক্টচেক: প্রকৃতপক্ষে আশ্রয়প্রার্থীরা এডিএ ভাতা ছাড়া সরকারের আর কোনো ভাতা পান না। যেমন বেকার ভাতা, বাসা ভাড়ার জন্য সরকারি ভর্তুকি, বিশেষ অসুস্থতা ভাতা, পারিবারিক ভাতা ইত্যাদি কিছুই আশ্রয়পার্থীরা পান না। 

অপরদিকে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা বা স্যালারি কার্ডে থাকা একজন ব্যক্তিকে প্রথম কার্ড পাওয়ার পর কমপক্ষে ৫ বছর ফ্রান্সে বসবাস করলে তিনি বেকার ভাতা বা আরএসআ পেতে আবেদন করতে পারবেন। 

পড়ুন>>ফ্রান্সে অভিবাসীদের সামাজিক সুবিধা কমাতে চান উগ্রডানপন্থিরা

এছাড়া অনিয়মিত পরিস্থিতিতে থাকা অভিবাসীদের কোন প্রকার আর্থিক ভাতা পাওয়ার সুযোগ নেই। যারা অনিয়মিত পরিস্থিতিতে রয়েছে, তারা কিছু পাওয়ার অধিকারী নয়।

সুতরাং ডানপন্থিদের এই বক্তব্যটিও সত্য বলে প্রতীয়মান হয় না। 

ভুল ধারণা ৩: ফ্রান্সে আসা বিদেশিদের বেশিরভাগই আফ্রিকান

অভিবাসীরা ফরাসি সংস্কৃতিকে গ্রাস করছে এই তত্ত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন লে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ভালেরি পেক্রেস। তার বক্তব্য সমর্থন করে আরেক কট্টর অভিবাসী বিরোধী প্রার্থী এরিক জেমুর ৯ ডিসেম্বর বলেন, “বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলের ১৮ বছরের কম বয়সি তরুণদের মধ্যে ৮০-৯০ শতাংশ তরুণ আফ্রিকান বা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত।”

ফ্যাক্টচেক: এরিক জেমুর তার দাবির সূত্র হিসেবে ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘হোটেল মাতিনিও’ এর সাথে জড়িত ফ্রান্স স্ট্র্যাটেজ নামক একটি গবেষণা সংস্থার কথা উল্লেখ করেন। 

তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে উঠে আসে ‘ফ্রান্স স্ট্র্যাটেজি’ নামক এই গবেষণা সংস্থাটি কখনই এই জাতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি।

ফরাসি সরকারের তথ্য অনুসারে, ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী, ফ্রান্সে প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন বা ৬৮ লাখ অভিবাসী বসবাস করছেন। যা মোট জনসংখ্যার ১০.২ শতাংশ। অভিবাসীদের মধ্যে ৪৬ শতাংশ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে এবং বাকিরা মূলত ইউরোপীয়, এশিয়ান, আমেরিকান এবং ওশেনিয়ান বংশোদ্ভূত। অর্থাৎ আফ্রিকান জনসংখ্যা ও সংস্কৃতি দ্বারা ফরাসিদের প্রতিস্থাপন এই ধারণা থেকে ফ্রান্স যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছে।

ভুল ধারণা ৪: ৪০ মিলিয়ন অভিবাসী সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ইইউতে প্রবেশ করেছে

লে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ভালেরি পেক্রেস ৬ ফেব্রুয়ারি ফ্রান্স ৫-টিভিতে বলেছিলেন, “২০২১ সালে প্রায় ৪০ মিলিয়ন বা ৪ কোটি অভিবাসী কোনও প্রকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই শেঙ্গেন এলাকায় প্রবেশ করেছে।”

ফ্যাক্টচেক: ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান অনুসারে তার এই বক্তব্য অসত্য৷ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ সালে তিরিশ লাখেরও কম বিদেশি নাগরিক ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছে৷

এছাড়া, ইউরোস্ট্যাট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে দেখা যাচ্ছে, ভালেরি পেক্রেস প্রকৃত সংখ্যাটির তুলনায় অনেকটাই বাড়িয়ে বলেছেন৷ বাস্তবে মাত্র দুই কোটি ৭০ লাখ বিদেশি নাগরিক ইউরোপের মাটিতে প্রবেশ করেছে৷ এই পরিসংখ্যানগুলির সর্বশেষ তথ্য ইউরোস্ট্যাটের ওয়েবসাইটে রয়েছে৷

দুই কোটি ৭০ লাখ বিদেশি নাগরিক ইউরোপীয় জনসংখ্যার মাত্র শূন্য দশমিক ছয় শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। যেখানে ইউরোপে আনুমানিক ৪৫ কোটি মানুষ বসবাস করেন৷

ইউরোপের বাইরে থেকে আসা দুই কোটি ৭০ লাখ অভিবাসীর মধ্যে পাঁচ লাখ ৪৫ হাজার জন স্পেনে, দুই লাখ নয় হাজার ইটালিতে এবং এক লাখ আটাশি হাজার ফ্রান্সে এসেছেন৷

ভুল ধারণা ৫: অবৈধ অভিবাসন রোধ করতে বিদেশে অবস্থিত ফরাসি দূতাবাসগুলোতে আশ্রয় আবেদন জমা নিতে হবে 

কট্টর-ডানপন্থি প্রার্থী মারিন লে পেন, এরিক জেমোর এবং ডানপন্থি প্রার্থী ভালেরি পেক্রেস সমর্থিত এই প্রস্তাবনাটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি।

প্রথমত, কোন দেশের ভূখন্ডের বাইরে একজন ভুক্তভোগীকে অন্য দেশের সীমানায় আশ্রয় চাইতে বাধ্য করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) এর মতে, “কোন নির্দিষ্ট দেশে আসা একজন ব্যক্তিকে দেশটি তার ভূখণ্ডে ন্যায্যতা ও কার্যকরভাবে আশ্রয় পদ্ধতির সুবিধা প্রদানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।”

পড়ুন>>কেন ফ্রান্স থেকে সকল অনথিভুক্ত অভিবাসীদের বহিষ্কার অসম্ভব?

শরণার্থীদের অধিকার সম্পর্কিত ১৯৫১ সালের জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, “কোনো দেশ একজন আশ্রয়পার্থীকে এমন কোন ভূখণ্ডে ফেরত পাঠাতে পারবে না যেখানে উক্ত ব্যক্তির জীবনের ঝুঁকি রয়েছে।”

এছাড়া, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা নানা কারণে তাদের নিজ দেশের ফরাসি দূতাবাসে চাইলেও আশ্রয় আবেদন জমা দিতে পারবেন না। এছাড়া অনেক দেশে এবং শহরেই ফরাসি দূতাবাস নেই। 

অবৈধ অভিবাসন থামাতে প্রার্থীদের এই বক্তব্যটিও অবাস্তব ও কল্পনাপ্রসূত। 


মূল প্রতিবেদন শার্লত বোয়াতিও। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মাদ আরফ উল্লাহ।


এমএইউ/এআই


 

অন্যান্য প্রতিবেদন