ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২২ এর প্রথম দফা থেকে দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন অভিবাসী বিরোধী মারিন লো পেন এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। ছবি: রয়টার্স
ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২২ এর প্রথম দফা থেকে দ্বিতীয় দফায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন অভিবাসী বিরোধী মারিন লো পেন এবং বর্তমান রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। ছবি: রয়টার্স

রোববার, ১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২২ এর প্রথম দফার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। ফ্রান্স২৪ এর জনমত জরিপ পার্টনার ইপসোস/সোপরা-স্টেরিয়া প্রদত্ত তথ্য অনুসারে, ২৭,৬ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে আছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। অপরদিকে হাড্ডাহাড্ডি লড়ায় হয়েছে কট্টর ডানপার্থী মারিন লোপেন (২৩.৪১%) এবং অতি বামপন্থী জঁ লুক মেনশঁ (২১,৯৫%) এর মধ্যে। অল্প ব্যবধানে আবারও দ্বিতীয় দফায় লড়ার মতো ভোট পেতে সক্ষম হয়েছেন অভিবাসী বিরোধী বলে পরিচিত মারিন লো পেন।

২০১৭ সালের পুনরাবৃত্তি হলো ১০ এপ্রিল রোববার অনুষ্টিত ফরাসি রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ২০২২ এর প্রথম দফা নির্বাচনে। দ্বিতীয় দফায় লড়াই হবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং অতি-ডানপন্থী অভিবাসী বিরোধী প্রার্থী মারিন লো পেনের সাথে। গত নির্বাচনেও দ্বিতীয় দফায় মারিন লো পেনকে বিপুল ব্যবধানে হারিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন এমানুয়েল ম্যাক্রঁ৷

সবগুলো জনমত জরিপেই এগিয়ে ছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি। এরই ধারাবাহিকতায় ২৭,৬ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে থাকলেন এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। নিয়ম অনুযায়ী, কোন প্রার্থীই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় সর্বোচ্চ ভোট প্রাপ্ত দুই প্রার্থীর মধ্যে দ্বিতীয় দফা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। 

এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পাঁচ বছর ধরে বারবার বলে আসছিলেন পুরনো বাম-ডান বিভাজন সাম্প্রতিক সময়ে উগ্র জাতিয়বাদী রাজনীতির বিকাশের জন্য দায়ী। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সভাপতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব থাকায় সীমিত নির্বাচনী প্রচার করেছিলেন এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। অপেক্ষাকৃত কম রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে কৌশল হিসেবে প্রার্থীতাও অনেকটা দেরিতে ঘোষণা দিয়েছিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি।

পড়ুন>ফ্রান্সে অভিবাসীদের সামাজিক সুবিধা কমাতে চান উগ্রডানপন্থিরা

করোনাকালে ব্যাপকহারে সামজিক সুবিধা প্রদান, বেকারত্ব কমিয়ে আনা এবং আন্তজার্তিক ও ইউরোপীয় রাজনীতিতে নিজের শক্ত অবস্থানকে সামনে রেখে এবারের নির্বাচনী প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন এমানুয়েল ম্যাক্রঁ। 

দ্বিতীয় দফায় অতি ডানপন্থী মারিন লো পেনের বিরুদ্ধে জয় পেতে তিনি প্রথম দফায় পরাজিত হওয়া সমমনা বাকি দলগুলোর সমর্থন প্রত্যাশা করেছেন। 

এবারের নির্বাচনে ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ ফলাফল করেছে ফরাসি রাজনীতির দুই বৃহৎ রাজনৈতিক দল বামপন্থী সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস) এবং ডানপন্থী লে রিপাবলিকান (এলআর)।

অপরদিকে ২১,৯৫ শতাংশ ভোট পেয়ে মারিন লো পেনের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন অতি-বাম পন্থী লা ফ্রন্সঁ আনসুমিজ দলের প্রার্থী জঁ লুক মেলনশঁ। এবারের প্রথম দফা নির্বাচনে তৃতীয় স্থান দখলে করে দলটি ফরাসি রাজনীতিতে তৃতীয় প্রধান রাজনৈতিক ব্লক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ২০১৭ সালের প্রথম দফা নির্বাচনও ১৯,৫৮ শতাংশ এবং ২০১২ সালের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো লড়াই করে ১১,১০ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন এই প্রার্থী। 

ভালেরি পেক্রেসের ভোট গেছে ম্যাক্রঁর দিকে

২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই ফরাসি রাজনীতির অন্যতম প্রধান দল ডানপন্থী লে রিপবালিকান দলের বিভিন্ন ব্যক্তিকে দলে টানেন এমানুয়েল মাক্রোঁ৷

শুরুতেই তিনি কৌশল হিসেবে প্রধানমন্ত্রী করেন লে রিপাবলিকান দলের পরিচিত মুখ এডুয়ার্ড ফিলিপকে। পাশাপাশি ব্রুনো লে মের, জেরা দারমানাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিকে মন্ত্রী করা হয়। এসব ব্যক্তিদের আগমন লে রিপাবলিকান দলেররাজনৈতিক অবস্থানকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে ভূমিকা রাখে। 

পড়ুন>>অভিবাসন নিয়ে মিথ্যা ও ভুল তথ্যে সয়লাব প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে এল আর দল থেকে এবার নির্বাচনে লড়া ভালেরি পেক্রেসের উপর। যেখানে ২০১৭ সালের প্রথম দফা নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ফ্রসোঁয়া ফিও ২০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়েছিলেন সেখানে এবারে দলটির ভোট আক্ষরিক অর্থে ছিনতাই করেছেন এমানুয়েল মাক্র৷ 

ভালেরি পেক্রেসের মাত্র ৪.৭ শতাংশ ভোট প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে ফরাসি পঞ্চম প্রজাতন্ত্রে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের মধ্যে এবার খারাপ ফলাফল করল দলটি। নিয়ম অনুযায়ী নূন্যতম ৫ শতাংশ ভোট পেতে সক্ষম না হওয়ায় নির্বাচন কমিশন থেকে নির্বাচনের খরচ হওয়া কোন টাকায় ফেরত পাবেন না ভালেরি পেক্রেস। 

এরিক জেমুরের প্রার্থীতায় সমস্যা মারিন লো পেনের

গতবারের মতো আবারও দ্বিতীয় দফায় যেতে সক্ষম হয়েছেন ন্যাশনাল র‍্যালি বা আরএন দলের প্রার্থী মারিন লো পেন। তিনি ২৩.৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এ নিয়ে পঞ্চম প্রজাতন্ত্রের অধীনে অনুষ্টিত কোন রাষ্ট্রপতি তৃতীয়বারের মতো দ্বিতীয় দফায় যেতে সক্ষম হল দলতি। 

এর আগে তাঁর পিতা জঁ মারি লো পেন ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো কট্টর ডানপন্থী প্রার্থী হিসেবে প্রথম দফা থেকে দ্বিতীয় দফায় গিয়েছিলেন। অবশ্য তখন দলের নাম ছিল ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা এফএন। 

২০১৭ সালে পরাজিত হওয়ার পর থেকে টানা পাঁচ বছর ধরে চালিয়ে যাওয়া কট্টর জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক প্রচারণার সুফল পেলেন মারিন লো পেন। 

পড়ুন>>ফরাসি নির্বাচনে কোন প্রার্থীর অভিবাসন নীতি কেমন?

তবে ভোটের মাঠে হিসেব এত সোজা ছিল না। রাজনীতিতে অন্য এক উগ্র-ডান প্রার্থী এরিক জেমুরের আগমনের কারণে অত্যন্ত বিরোধপূর্ণ হয়ে উঠে রাজনৈতিক পরিস্থিতি। 

এরিক জেমুর অভিবাসী ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে লক্ষ্য করে একের পর এক উগ্র ও বিতর্কিত মন্তব্য প্রদান করে সমালোচিত হতে থাকলে কৌশল হিসেবে নিজেকের অবস্থান একটু পরিবর্তন করেন আম্রিন লো পেন। 

এরিক জেমুরের আপত্তিকর মন্তব্যের বিপরীতে কট্টর জাতীয়বাদী বক্তব্য দিয়ে নতুন ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হন মারিন লো পেন।

তবে সাংবাদিক ও সমালোচক থেকে রাজনীতিতে আসা এরিক জেমুর বেশ কিছু সময়ের জন্য ডান ও অতি ডান বলয়ের ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পুতিনকে নিয়ে করা অতীত মন্তব্য এবং উগ্র বক্তব্যের জেরে পরবর্তীতে জৌলুস কমতে শুরু করে জেমুরের নির্বাচনী প্রচারণায়। 

এরিক জেমুর শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭.০৫ শতাংশ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় দফায় মারিন লো পেনকে ভোট দিতে তার ভোটারদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। 

দ্বিতীয় দফায় কাকে ভোট দিবেন জঁ লুক মেলনশঁ এর সমর্থকরা?

গতকাল প্রথম দফার ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে দ্বিতীয় দফার প্রচারণা। 

ফ্রান্স২৪ এর জনমত জরিপ পার্টনার ইপসোস-সোপ্রা স্টেরিয়ার অনুমান অনুযায়ী, এবার দ্বিতীয় দফায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এমানুয়েল ম্যাক্রঁ এবং মারিন লো পেনের মধ্যে। গতবারের মতো বিপুল ব্যবধানে জয় পাওয়াটা সহজ হবে না বর্তমান রাষ্ট্রপতির জন্য। 

রোববার সন্ধ্যায় ফলাফল পরবর্তী বক্তব্যে এমানুয়েল ম্যাক্র কট্টর ডানপন্থী কাউকে ক্ষমতায় আসা ঠেকাতে সবদলের প্রতি আহবান জানিয়েছেন। দ্বিফীয় দফায় তাকে সমর্থন জানানোয় সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রার্থী আন হিদালগো, সবুজ দলের প্রার্থী ইয়ানিক যাদো এবং কমুনিস্ট পার্টির পার্থী ফাবিয়া রোসেলের প্রতি ধন্যবাদ জানিয়েছেন এমানুয়েল ম্যাক্র। 

পড়ুন>ফ্যাক্টচেক: ‘ইইউ-তে ৪ কোটি অভিবাসী প্রবেশের বক্তব্য অসত্য’

তবে সমস্যা দেখা দিয়েছে তৃতীয় অবস্থানে আসা জঁ লুক মেলনশঁ’র ভোটারদের ভোট কোন দিকে যাবে সেটি নিয়ে। ফলাফল পরবর্তী বক্তব্যে জঁ লুক মেলনশঁ তিনবার বলেন যেন একটি ভোটও মারিন লো পেনের পক্ষে কেউ না দেয়। তবে তিনি একবারের জন্যেও নাম উচ্চারণ করে এমানুয়েল ম্যাক্রঁকে ভোট দিতে বলেননি।  

আদর্শিক রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও বর্তমান সরকারের নাগরিকত্ব বিষয়ক মুখপাত্র মার্লেন শিয়াপা সোমবার জঁ লুক মেলনশঁ’র ভোটারদের প্রতি আবেদন করেছেন, “আমরা মানবিক মূল্যবোধ, নারীর অধিকারে, মানবাধিকার ও মানুষের রাজনৈতিক আশ্রয়ের অধিকারের প্রশ্নে নিজেদের মধ্যে ঐক্যমতে পৌছতে পারি।”

এমনকি জঁ লুক মেলনশঁ’র অতি বাম রাজনৈতিক আদর্শের সাথে যোজন-যোজন ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও দ্বিফীয় দফায় জিততে মারিন লো পেনও এই ব্লকের ভোটারদের ভোট পেতে চান। তিনি রোববার সন্ধ্যায় তার বক্তব্যে বলেন, “সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সুরক্ষার সাথে সবার উচিত বিভেদ ভুলে আমাদের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ কাঠামোয় আসা।”

তবে লা ফ্রন্সঁ আনসুমিজ দলের প্রার্থী ইতিমধ্যে মারিন লো পেনকে ভোট না দিতে পরিস্কার বক্তব্য দিয়েছেন। 



এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন