অস্ট্রিয়া যাওয়ার সময় বিমানের জন্য অপেক্ষা করছেন ভালেন্টিনা৷ পারিবারিক ছবিগুলোই তার একমাত্র স্মৃতি৷ ছবি: ইউএনএফপিএ
অস্ট্রিয়া যাওয়ার সময় বিমানের জন্য অপেক্ষা করছেন ভালেন্টিনা৷ পারিবারিক ছবিগুলোই তার একমাত্র স্মৃতি৷ ছবি: ইউএনএফপিএ

রুশ সেনারা ইউক্রেনের মিকোলাইভে হামলা চালালে নিজের দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন ভালেন্টিনা এজোভা৷ এই ইউক্রেনীয় নারীর বয়স ৭২ বছর৷ ইউক্রেন থেকে মলদোভা হয়ে অস্ট্রিয়ায় পৌঁছান তিনি৷ জাতিসংঘের পপুলেশন ফান্ডের (ইউএনএফপিএ) কাছে নিজের কথা জানিয়েছেন ভালেন্টিনা৷

ইউক্রেনে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি হামলা শুরু করে রাশিয়া৷ তারপর থেকে দেশ ছেড়েছেন অন্তত ৪০ লাখ ইউক্রেনীয়৷ দেশছাড়ার আগে মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় পেয়েছিলেন ৭২ বছরের ভালেন্টিনা৷ দুটো ছোট সুটকেসে প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে দেশ ছাড়েন তিনি৷ মিকোলাইভ শহরে হামলা চালিয়েছিল রুশ সেনারা৷ ভালেন্টিনার কথায়, ‘‘চারদিকে শুধুই বিস্ফোরণের শব্দ, ধোঁয়ায় আশপাশ ঢেকে গিয়েছিল৷ রুশ সেনারা গোটা শহরকে ঘিরে রেখেছিল বললে ভুল হবে না৷ মাথার উপর দিয়ে শুধু বোমারু বিমান উড়ছিল৷ পরদিন সকালেই দেশ ছাড়তে হবে–এই সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিলাম তখন৷’’

মলদোভায় ইউএনএফপিএ-এর একটি ‘ট্রানজিট ক্যাম্পে’ ভালেন্টিনা তার অভিজ্ঞতা জানান৷ রুশ আগ্রাসনের পর ইউক্রেনীয়রা দেশ ছাড়তে শুরু করেন৷ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর হিসেবে দেশটির এক চতুর্থাংশ নাগরিক যুদ্ধ শুরুর পর অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন৷ তবে প্রায় আট লাখ শরণার্থী রাশিয়া কিয়েভে হামলা বন্ধের পর আবারো দেশে ফিরে যাচ্ছেন৷ 


মলদোভায় চার লাখ ইউক্রেনীয়

ইউএনএফপিএ-কে ভালেন্টিনা বলেন, ‘‘দেশ ছাড়তে হবে ভেবে মন ভেঙে গিয়েছিল৷ কিন্তু আমার জীবনের দাম তো আরো অনেক বেশি৷ তাই আর পিছন ফিরে তাকাইনি৷ দেশ ছেড়ে চলে এসেছি৷’’

ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, ইউক্রেনীয় নাগরিকদের মধ্যে যারা প্রবীণ নাগরিক, তারা দেশ ছাড়ার সময় শারীরিক অসুস্থতাসহ একাধিক সমস্যায় পড়েছেন৷ বিশেষ করে মহিলা এবং শিশুরা নানারকম হেনস্থার মুখে পড়েছেন৷ দেশটিতে যুদ্ধের ফলে সবথেকে বেশি প্রবীণ মানুষ বিশ্বের মধ্যে এমন মারাত্মক সংকটে পড়েছেন৷  


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফে হান্স ক্লুগ মলদোভার হেলথ টিমসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন৷ সূত্র: হান্স ক্লুগের টুইটার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তরফে হান্স ক্লুগ মলদোভার হেলথ টিমসের সঙ্গে দেখা করেছিলেন৷ সূত্র: হান্স ক্লুগের টুইটার


ইউক্রেনের বিমান

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে গাড়িতে মিকোলাইভ থেকে মলদোভা সীমান্তে পৌঁছাতে ১২ ঘণ্টার কাছাকাছি সময় লাগে৷ কিন্তু যুদ্ধের কারণে গাড়িতে চেপে মলদোভার রাজধানী কিশিনাওয়ের সীমান্তে পৌঁছাতে ২৪ ঘণ্টা সময় লেগেছিল ভালেন্টিনার৷ প্রথমে বন্ধুদের সঙ্গে বন্দর শহর ওডেসায় পৌঁছান তিনি৷ এরপর আবারো ভাবনা শুরু, কোথায় যাবেন, কী করবেন! মারাত্মক শীতে কাঁপতে কাঁপতে একটা মিনিবাসে চেপে কিশিনাও রওনা দেন তিনি৷ 

মলদোভায় পৌঁছে অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা হয়েছিল তার৷ ভালেন্টিনার কথায়, ‘‘শারীরিকভাবে বরবারই আমি সক্রিয়৷ কিন্তু টানা জার্নির ফলে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম৷ তবে সেটা ঠিক শারীরিক কারণে নয়, আবেগের কারণে৷’’এই প্রথমবার দেশের বাইরে পা রেখেছিলেন ভালেন্টিনা৷ ইউএনএফপিএ-কে তিনি বলেন, ‘‘আমার বয়স ৭২ বছর৷ তবে নতুন ভাষা শিখতে আমি রাজি৷ আমি কাজ করতে পারব৷ বয়স কোনো বাধা হতে পারে না৷ সম্পূর্ণ প্রাণশক্তি দিয়ে কাজ করতে চাই আমি৷ নতুন দেশে নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে আমি প্রস্তুত৷’’


ইউক্রেন থেকে মলদোভার পথে বিমানে শরণার্থীরা৷ ছবি: ইউএনএইচসিআর
ইউক্রেন থেকে মলদোভার পথে বিমানে শরণার্থীরা৷ ছবি: ইউএনএইচসিআর


‘‘কী ফেলে আসতে হবে, আমি ঠিক করব’’

ইউএনএফপিএ জানিয়েছে, ভালেন্টিনা যখন তার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিচ্ছিলেন, তখন তার গলা কেঁপে উঠছিল বারবার৷ একটা আলব্যাম সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন তিনি৷ ভালেন্টিনার কথায়, ‘‘আমার জামাকাপড়, পোশাক আমি ফেলে রেখে আসতে পারি৷ কিন্তু আমার ছবিগুলো আমার প্রাণ৷ আমি ওদের রেখে আসতে পারিনি৷’’

বেশ কয়েক বছর আগে ভালেন্টিনার স্বামী মারা গিয়েছেন৷ মিকোলাইভে ছেলের সঙ্গে থাকতেন তিনি৷ ছেলের বয়স ৩৯ বছর৷ ওই শহর সম্পূর্ণ যোগাযোগবিচ্ছিন্ন৷ ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ৷ মলদোভায় পৌঁছে ছেলের সঙ্গে তবুও একবার কথা বলতে পেরেছিলেন তিনি৷ ছেলেও দ্রুত শহর ছাড়বে এটুকুই শুনতে পেরেছিলেন ভালেন্টিনা৷ তারপরে ফোন কেটে যায়৷ আর যোগাযোগ করা যায়নি৷ বর্তমানে অস্ট্রিয়ায় রয়েছেন তিনি৷ ভালেন্টিনার সঙ্গে সাত হাজার ২০০ টাকা রয়েছে৷ যুদ্ধের পরিস্থিতিতে এটিএমে গিয়ে টাকা তোলা তার পক্ষে অসম্ভব ছিল৷ এছাড়াও ইউক্রেনের সব এটিএম ফাঁকা হয়ে গিয়েছে৷ এটিএমে কোনো টাকা ছিল না–এমনটাই জানান তিনি৷ দেশে ফেরার কথা আর ভাবতে চান না ভালেন্টিনা৷ বরং অস্ট্রিয়াতেই বিশ্রাম নিতে, শান্তি পেতে চান তিনি৷

ভালেন্টিনার বক্তব্য, ‘‘নিজের সন্তানকে ফিরে পেতে সবরকম চেষ্টা করবো আমি৷ ও ওর বাবার মতো৷ আচমকা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা৷ অথচ অল্পবয়সিরা কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে৷ যদিও আমাদের পরিস্থিতিটা একটু আলাদা৷ আমার একটাই প্রার্থনা, আমি দ্রুত ওকে ফিরে পেতে চাই৷’’

আরকেসি/এআই (ইউএনএফপিএ)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন