১৪ এপ্রিল ২০২২ তারিখে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল (বামে) এবং রুয়ান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিনসেন্ট বিরুটা (ডানে) নতুন আশ্রয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন। ছবি: এপি
১৪ এপ্রিল ২০২২ তারিখে, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল (বামে) এবং রুয়ান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিনসেন্ট বিরুটা (ডানে) নতুন আশ্রয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন। ছবি: এপি

ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা অনিয়মিত অভিবাসীদের রুয়ান্ডা পাঠিয়ে দিতে সম্প্রতি দেশটির সঙ্গে চুক্তি করেছে লন্ডন৷ ফলে সাম্প্রতিক সময়ে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করা প্রায় এক হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে পূর্ব আফ্রিকার দেশটিতে পাঠানো হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এনজিওগুলোর মতে, নতুন এই চুক্তির ফলে মানব পাচার চক্রের ব্যবসা বাড়বে।

রুয়ান্ডার সাথে একটি চুক্তির মাধ্যমে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের যুক্তরাজ্য থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নিয়েছে লন্ডন। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে চ্যানেল অতিক্রম করতে চাওয়া আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে এই চুক্তিকে। 

চুক্তিটি এখনও যুক্তরাজ্যের সংসদে চূড়ান্ত বৈধতা পাওয়ার অপেক্ষায় থাকায় এটি বাস্তবায়নে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে বলে ধারনা করা হছে। 

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, চুক্তির ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার বিতর্ক বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এটিকে আলোচনায় রেখে ফ্রান্স থেকে চ্যানেল পারাপার নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। 

তবে ব্রিটিশ সরকারের কৌশল যাই হোক, এটি আপাত দৃষ্টিতে কার্যকর বলে প্রমাণিত নয়। কারণ এই ঘোষণার কয়েকদিনের মধ্যেই ফরাসি উপকূল থেকে রেকর্ড এক হাজারেরও বেশি অভিবাসন প্রত্যাশী যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছে। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস এই বিষয়ে কথা বলেছে ব্রিটিশ এনজিও চ্যানেল রেসকিউ-এর সমন্বয়কারী স্টিভেন মার্টিনের সাথে। সংস্থাটি মূলত ব্রিটিশ উপকূলে আসা অভিবাসী নৌকাগুলিকে সনাক্ত করতে এবং উদ্ধারে সহায়তা করে। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: রুয়ান্ডার সঙ্গে যুক্তরাজ্যের চুক্তি নিয়ে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?

স্টিভেন মার্টিন: আমরা এই চুক্তির নিন্দা জানাই। এধরনের পদক্ষেপের অর্থ হচ্ছে আপনি যুক্তরাজ্যে প্রবেশের জন্য যেই রুট ব্যবহার করেছেন শুধুমাত্র সেটির উপর নির্ভর করে আশ্রয় আবেদনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে। এটা আসলে একটি নির্দিষ্ট পথকে অপরাধে পরিণত করার সমান।

একটি দেশে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমান্ত অতিক্রম করা বেআইনি নয়।

ব্রিটিশ সরকার সবসময় যুক্তি দেয় তারা মানুষের নিরাপত্তা আর চ্যানেলে মৃত্যু নিয়ে উদ্বিগ্ন। আসলে তাদের উদ্বেগের বিষয় হল অভিবাসন, যা তারা শূন্যে নামিয়ে আনতে চায়।

চুক্তি ঘোষণার দিনেই সরকার আরেকটি ঘোষণা দেয়। সেখানে বলা হয় এখন থেকে ব্রিটিশ হোম অফিসের আওতাধীন কোস্ট গার্ডের বদলে সেনাবাহিনী চ্যানেলে টহল ও উদ্ধার অভিযানগুলো পরিচালনা করবে। 

অর্থাৎ এখন থেকে ইংলিশ চ্যানেলে সীমান্ত রক্ষা করতে উদ্বাস্তুদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করবে যুক্তরাজ্য।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: নতুন চুক্তি ঘোষণার পরেও কি চ্যানেলে অভিবাসীদের আগমন অব্যাহত রয়েছে?

স্টিভেন মার্টিন: হ্যাঁ। ১৪ এপ্রিল চুক্তির ঘোষণার দিন থেকে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে মোট ২৯টি নৌকায় ১,০৭৪ জন অভিবাসী চ্যানেল অতিক্রম করে ইংল্যান্ডে এসেছেন। 

মনে রাখতে হবে, যদি চুক্তিটি সংসদে বৈধতা পেয়ে যায়, তাহলে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা সবাইকে রুয়ান্ডায় পাঠানো হবে। এমনকি সাম্প্রতিক পারাপারের সময় আইনটি কার্যকর না হলেও চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে আসা সব আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এটি উদ্বেগের কারণ হবে। 

নতুন আইনের আওতায় সোমালিয়া, কুর্দিস্তান, ইরান এবং সুদান থেকে আসা সব আশ্রয়প্রার্থীদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে। এটা খুবই উদ্বেগজনক।

আমরা জানি যে অতীতে ইসরায়েল এবং রুয়ান্ডার মধ্যে একইরকম একটি চুক্তি করা হয়েছিল। এছাড়া যুক্তরাজ্যকেও আশ্রয় আইন না মানায় বেশ কয়েকবার সমালোচনা ও নিন্দার শিকার হতে হয়েছিল। বেশ কয়েকটি গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ ধরনের অমানবিক ও জোরপূর্বক বহিষ্কার আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে হতাশা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি করে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মানসিক স্বাস্থ্য ব্যাপক অবনতির দিকে নিয়ে যায়।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: আপনি কীভাবে নিশ্চিত যে চ্যানেলে পারাপার কমছে না?

স্টিভেন মার্টিন: প্রায়শই যারা এই যাত্রাগুলোতে অংশ নেন তারা সংশ্লিষ্ট দেশের আইন সম্পর্কে বিশদ ধারণা রাখেন না। তারা সমস্ত বিবরণ জানতে পারেন না। 

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, ফরাসি উপকূলের কালে বন্দরের নিরাপত্তা বাড়ানোর ফলে অভিবাসীরা আর ট্রাকে না উঠে নৌকাযোগে সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছেন। অর্থাৎ কঠিন ব্যবস্থাগুলো অভিবাসীদের আগমনের উপর কোন প্রভাব ফেলে না। 

এই আইনের প্রধান প্রভাব পড়বে মানব পাচারকারীদের কৌশলের উপর। এখন তারা সম্ভবত নতুন রুটের সন্ধান করবে। যেটি অভিবাসীদের জীবনকে আরও বিপজ্জনক এবং আরও ব্যয়বহুল করে তুলবে। সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে ইংল্যান্ডে পৌঁছিয়ে দিতে পাচারকারীরা আরও ভয়ংকর পদক্ষেপ নেবে।

এছাড়া যারা ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন তাদের উপরও চাপ বাড়তে পারে। আশ্রয়প্রার্থীরা বাসস্থানসহ নানা ঝামেলায় জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছিল। এখন আবার নতুন করে রুয়ান্ডায় নির্বাসিত হওয়ার ভয়ে দিন পার করতে হতে পারে।


এমএইউ/এআই





 

অন্যান্য প্রতিবেদন