প্রবীণদের সাহায্য করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা৷ ছবি :পুরকারি ওয়াইনারি গ্রুপস
প্রবীণদের সাহায্য করছেন স্বেচ্ছাসেবীরা৷ ছবি :পুরকারি ওয়াইনারি গ্রুপস

ইউক্রেনের একটি শরণার্থী কেন্দ্রের করিডোর নামানোর চেষ্টা করছিলেন ৭১ বছরের ভ্লাদিমির লিগনভ৷ তখন তার কাঁধে গোটানো ধূসর ট্রাকস্যুটের ফাঁকে তার কাটা হাতের অংশ চোখে পড়েছিল সংবাদসংস্থার প্রতিনিধির৷ খানিকটা কাটা অংশ যেন রয়ে গিয়েছে বলে অনুভব করেন ভ্লাদিমির৷ যুদ্ধপীড়িত ইউক্রেনের এক প্রবীণ নাগরিক তিনি৷ তার মতোই আরো অনেক প্রবীণ নাগরিক দিশাহারা অবস্থায় রয়েছেন ইউক্রেনে৷

ভ্লাদিমির বলেন, ‘‘২১ মার্চ ধূমপান করতে বেরিয়েছিলাম৷ এমন সময় গোলার আঘাত, একটা হাত আজীবনের মতো হারিয়ে ফেলেছি৷’’ তার বাড়ি পূর্ব ইউক্রেনের শিল্পাঞ্চল আভদিভকায়৷ রুশ বাহিনীর উপর পাল্টা আঘাত হানতেও অন্যতম কেন্দ্রস্থল এই আউদিভকা৷

সেখান থেকে আপাতত মোটামুটি নিরাপদ শহর দিনিপ্রোতে রয়েছেন সাবেক এই ট্রেন পরিচালক৷ স্বেচ্ছাসেবীরা বলছেন, ‘‘ইউক্রেনের প্রবীণ নাগরিকদের এই মুহূর্তে সবথেকে বেশি মানবিক সহায়তা প্রয়োদিনিপ্রোতে অন্তঃসত্ত্বাদের একটি হাসপাতালে গোলার আঘাত থেকে বাঁচানোর জন্য কিছু মানুষকে আশ্রয় দেয়া হয়েছে৷ ভ্লাদিমিরের চিকিৎসা হয়েছে মিরনরাদ হাসপাতালে৷ দিনিপ্রোর কর্মীরা তাকে বলেছেন, তিন দিনের মধ্যে ফিরে যাওয়া উচিত ভ্লাদিমিরেতিনি বলেন, ‘‘আমি জানিনা ঠিক কী হচ্ছে৷ আমি যদি একেবারে কবরস্থানে চলে যেতে পারি, সেটাই বোধহয় সবথেকে ভাল৷’’ 

পূর্ব ইউক্রেন থেকে আরো একটি ভ্যান এসে পৌঁছেছিল দিন চারেক আগে৷ সেই ভ্যানে আরো তিন জন প্রবীণ ব্যক্তি ছিলেন৷ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন বৃদ্ধ মানুষগুলো৷ স্বেচ্ছাসেবীরা হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাদের নিয়ে যাচ্ছিলেন চিকিৎসার জন্ওই কেন্দ্রের স্বেচ্ছাসেবী কর্মী ওলগা ভলকোভা বলেন, ‘‘মাটির নীচে বাঙ্কারে যারা দীর্ঘসময় ধরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন, তাদের জন্য সেটা দুর্বিষহ৷

এই কেন্দ্রে ৮৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন, এর মধ্যে বেশিরভাগই প্রবীণ নাগরিক৷ যুদ্ধের আগে আমরা তাদের অনেককে সাহায্য করেছি৷ অনেককে আবার নিজেদের মতো করে ছেড়েও দেয়া হয়েছে৷

‘‘যুদ্ধের সময় প্রবীণ নাগরিকদের কথা ভুলে যাই৷ তবে তাদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন’’–জানান হান্ডিক্যাপ ইন্টারন্যাশনালের কর্মকর্তা ফেদেরিকো দেসি৷ এই এনজিও দিনিপ্রোর কেন্দ্রটিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করছে৷

ফেদেরিকোর কথায়, ‘‘পরিবারের থেকে আচমকাই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন প্রবীণ মানুষগুলো৷ ফোনেও যোগাযোগ করতে পারছেন না কারও সঙ্গে৷ শারীরিক যন্ত্রণার উপশম ছাড়াও তাদের অন্য সাহায্যের প্রয়োজন, যা মিলছে না৷’’

ইউক্রেন থেকে ইটালিতে শরণার্থীর দল | ছবি: আনসা/ক্লাউদিও পেরি
ইউক্রেন থেকে ইটালিতে শরণার্থীর দল | ছবি: আনসা/ক্লাউদিও পেরি

দিনিপ্রোতে এসে পৌঁছানোর পর আশি বছরের এক রুশ মহিলা আলেকজান্দ্রা ভাসিলচেঙ্কোকে নিতে এসেছিলেন তার নাতি৷ তিনি তুলনামূলকভাবে শক্তসমর্থ ছিলেন৷ জাতিগতভাবে তিনি রুশ হলেও আদতে ইউক্রেনের নাগরিক ওই বৃদ্ধা৷ পূর্ব ইউক্রেনের ক্রামাতরস্কের তিন রুমের একটা অ্যাপার্টমেন্টে কয়েক সপ্তাহ একা কাটিয়েছেন তিনি৷ এই এলাকায় সম্প্রতি রুশ রকেট হামলায় অন্তত ৬০ জন প্রাণ হারিয়েছেতিনি সংবাদসংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘‘আমি গোটা সময়টা শৌচাগারে থাকতে বাধ্য হয়েছি৷ একটানা কেঁদেছি ওই সময়ে৷ নিজের ফ্ল্যাটে নিজেই বন্দিদশা কাটিয়েছি৷

অন্যদিকে, বিছানার পাশে বসে আরেক বৃদ্ধা জোয়া তারান ভাবছিলেন তিনি অনেকটাই ভাগ্যবতী৷ যদিও তার একটামাত্র কিডনি কাজ করছে, দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, ডায়াবেটিস রয়েছে৷ কিন্তু তার রক মিউজিশিয়ান ছেলে তাকে দেখাশোনা করবে বলে ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছেন৷ হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘‘আমি সেই সাত বুড়ির এক বুড়ি৷ আমার ছেলে আমার দুটো চোখ, আমার হাত-পা সব৷ আমার নিজের বলতে আর কিছু নেই৷ যখন রুশ বাহিনী স্লোভিয়ানস্কের দিকে এগোচ্ছিল, তখন তিনিও ঠিক করে ফেলেছিলেন ‘‘ছেলেকে বাঁচাতে হবে৷ তিনি বিড়বিড় করছিলেন, ‘‘যুদ্ধের কী দরকার? ওরা আমাদের কাছে কী চায় ?’’ 

যুদ্ধবিধ্বস্ত মিকোলাইভ ৷ ছবি: রয়টার্স
যুদ্ধবিধ্বস্ত মিকোলাইভ ৷ ছবি: রয়টার্স

হান্ডিকাপ ইন্টারন্যাশনালের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৩ হাজার বৃদ্ধ অথবা অথর্ব ইউক্রেনীয় দিনিপ্রো ও তার আশপাশের এলাকায় পৌঁছেছেন৷ অন্য একটি কেন্দ্রে বন্দর শহর মারিউপল থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তি ও শিশুদের রাখা হয়েছে৷

কনস্টানটিন গর্সকভ নামের এক ব্যক্তি তার স্ত্রী নাতালিয়ার সঙ্গে প্রবীণদের দেখভালের জন্য এমন একটি কেন্দ্র চালান৷ তিনি বলেন, ‘‘১০টি কেন্দ্র চালালেও তা দেখবেন ভর্তি হয়ে যাবে৷’’ লুগানস্কের উত্তর-পশ্চিমের শহর লিসিচানস্ক থেকে এই কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন অর্থনীতির প্রাক্তন অধ্যাপিকা ইউলিয়া পানফিওরোভা৷ তার বয়স ৮৩৷ এখন কানে খুব একটা শুনতে পাননা তিনি৷ বোমাগুলির শব্দে আতঙ্কে কাটাচ্ছিলেন ইউলিয়া৷ তার বাড়ির পাশে তিনটে গোলা আছড়ে পড়েছিল৷ ওই গোলাগুলো তার জানালা উড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট৷

তিনি বলেন, ‘‘এটা আমার তৃতীয় যুদ্ধ৷’’ প্রথমটা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তারপর ২০১৪ সালে ইউক্রেনীয় সেনা এবং ক্রেমলিনপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে যুদ্ধ এবং তারপর এই যুদ্ধ ৷

তিনি সংবাদসংস্থাকে বলেন, ‘‘১৯৪৩ সালে নাৎসিমুক্ত হয়েছিল লিসিচানস্ক৷ আমার মনে আছে কীভাবে আমরা বাড়ি ফিরছিলাম৷ খানিকটা স্মৃতি রয়েছে৷ ওরা ছিল নাৎসি৷ তারপর আমাদের দেশ দুই ভাগ হল৷ এরপর আমাদের দেশে বিদেশিরা আক্রমণ করল৷ এখন আমার নিজের রাষ্ট্রের স্বাধীনতা বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে৷ সেই একরকম পরিস্থিতি৷ আমাদের লড়াই করতে হবে৷ যুদ্ধ যে কী মারাত্মক আতঙ্কের..’’

আরকেসি/এআই (এএফপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন