বাসস্থান সহ বিভিন্ন দাবিতে প্যারিসের এই ভবনটি দখল করে আছে ৮০ জন অভিবাসীর একটি দল। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
বাসস্থান সহ বিভিন্ন দাবিতে প্যারিসের এই ভবনটি দখল করে আছে ৮০ জন অভিবাসীর একটি দল। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে প্রায় ৮০ জন আশ্রয়প্রার্থী প্যারিসের কেন্দ্রে অবস্থিত একটি খালি ভবন দখল করে নেয়। ভবন দখল করা অধিকাংশ অভিবাসী দীর্ঘদিন ধরে সরকারি বাসা না পেয়ে রাস্তায় ঘুমাচ্ছিলেন। প্রতিবাদে 'লা শাপেল দো বু' নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে আন্দোলন করছেন এসব অভিবাসীরা। দখলকৃত ভবন ঘুরে এসে ও আশ্রয়প্রার্থীদের বক্তব্য নিয়ে ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশেষ প্রতিবেদন।

প্যারিসের নবম ডিসট্রিক্টের ছোট একটি সুনসান রাস্তা ‘রুই সলনিয়ের।’ ২১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সকালে প্যারিসের এই রাস্তার রেস্তোরাঁগুলো দুপুরের সার্ভিস শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাস্তায় পথচারী হাঁটছেন। এ এক বসন্তের সকালের স্নিগ্ধ প্যারিস। 

এই রাস্তার অদূরেই অবস্থিত প্যারিসের অন্যতম ব্যস্ত রেস্তোরাঁ জোন হিসেবে পরিচিত ‘গ্রঁ বোলভার’। পুরো এলাকা একটু হেঁটে এলে কারো মনেই হবেই না প্যারিসের কেন্দ্রের এমন একটি জায়গায় একটি খালি ভবন দখল করে স্কোয়াট (ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাধারণত কোন খালি ভবন বা বাসা দখল করে সেখানে বসতি স্থাপন করাকে স্কোয়াট বলা হয়৷ ) স্থাপন করে সেখানে অবস্থান করছে ৮০ জন আশ্রয়প্রার্থী। 

অবিশ্বাস্য শুনালেও ঘটনা সত্য। অবশ্য রাস্তার একপাশে ভবনের বাইরে থেকে একটি ব্যানার টাঙ্গিয়ে দিয়ে নিজেদের উপস্থিতি জানিয়ে দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। 

ব্যানারে আরবি ও ফরাসি ভাষায় বড় অক্ষরে করে লেখা, "অভিবাসীরা ন্যায়বিচারের যোগ্য, বর্ণবাদের জন্য না।”

আশ্রয় নেওয়া অবিবাসীরা সুদান, ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া এবং সোমালিয়া সহ বিভিন্ন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা। অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা যৌথ প্লাটফর্ম ‘লা শাপেল দো বু’ নামক সংগঠনের সহায়তায় সোমবার ১৮ এপ্রিল থেকে ভবনটি দখল করে নেয় অভিবাসীরা। ‘লা শাপেল দো বু’ ২০১৫ সাল থেকে বিভিন্ন দুর্দশা ও ঝুঁকিতে থাকা অনিয়মিত অভিবাসী ও নতুন আশ্রয়প্রার্থীদের সহায়তা করে আসছে। 

দখলকৃত ভবনটি বর্তমানে একটি বীমা কোম্পানির মালিকানাধীন। বিগত অন্তত তিন বছর ধরে এটি খালি রয়েছে। দখলের পর এটিকে গৃহহীন আশ্রয়প্রার্থীদের বসবাসের জায়গায় রূপান্তরিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিমা কোম্পানির অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত উপরের তলার মেঝেগুলোকে শোবার ঘরে পরিবর্তন করা হয়েছে। নিচতলায় সবাই আড্ডা দেয়া ও খাবার গ্রহণের জায়গা বানানো হয়েছে। দেয়াল গুলোতে অভিবাসীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দরকারি ঠিকানা ও ফোন নাম্বার লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। 

‘এখানে আমি আর ভয় পাই না’

বৃহস্পতিবার সকালে বাইরের পরিবেশের মতো স্কোয়াটের ভিতরের পরিবেশও বেশ শান্তিপূর্ণ। এসব আশ্রয়প্রার্থীর বেশিরভাগই কিছুদিন আগে উত্তর প্যারিসের বিভিন্ন রাস্তায় অস্থায়ী ক্যাম্প করে বাস করছিল। এখন মাথার উপর একটি ছাদ এবং বিশ্রামের জন্য প্রশান্তির সুবিধা পেয়ে ২৪ বছর বইসি নাইজেরিয়ান ডিজিব্রিল বলেন, “অবশেষে আমি সত্যিকারের ঘুম ঘুমিয়েছি, আমি ফ্রান্সে আসার পর থেকে ভালোভাবে ঘুমাতে পারিনি।”


ভবনে অবস্থানরতদের মধ্যে একজন ইথিওপিয়া থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থী আবেরা। ছবি: ডানা আলবোজ/ইনফোমাইগ্রেন্টস
ভবনে অবস্থানরতদের মধ্যে একজন ইথিওপিয়া থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থী আবেরা। ছবি: ডানা আলবোজ/ইনফোমাইগ্রেন্টস


বিছানা থেকে উঠতে উঠতে এই নাইজেরীয় আশ্রয়প্রার্থী আরও বলেন, “রাস্তায় যখন অস্থায়ী ক্যাম্পে ছিলাম তখন পুলিশ প্রতি রাতে জাগিয়ে তোলে তাড়া করত। প্রতিবার বিশ্রামের জন্য একটি নতুন জায়গা খুঁজে বের করতে হতো।”

প্যারিসে এক মাস ধরে বসবাসরত এই তরুণ বলেন, “এখানে আমি আর ভয় পাই না।”

কিন্তু এভাবে কতদিন? ভবনের নীচতলায় যেটি এখন রান্নাঘরে পরিণত হয়েছে সেখানে কফি নিয়ে আড্ডারত তিন বন্ধু। তারাও বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট কিন্তু এর সময়কাল নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন।

৩৩ বছর বয়সি ইথিওপীয় শরণার্থী আবেরা বলেন, “অবশ্যই এখানে থাকা রাস্তার চেয়ে ভাল, কিন্তু কিছুই নিশ্চিত নয়। আমরা জানি আমরা এখানে বেশিদিন থাকতে পারব না।” 

আবেরার ফ্রান্সে আশ্রয়ের আবেদন ইতিমধ্যে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

পাশেই থাকা ইরিত্রীয় শরণার্থী জস বলেন, “যদি এটি বন্ধ হয়ে যায়, তবে আমাদের আবারও লা শাপেলে অবস্থিত অস্থায়ী একটি তাঁবুতে ফিরে যেতে হবে৷”


চলতি বছরের মার্চে ফ্রান্সে আসা জিবরিল ভবনটিতে আসার আগে প্যারিসের উত্তরে অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছিলেন। ছবি: ডানা আলবোজ/ইনফোমাইগ্রেন্টস
চলতি বছরের মার্চে ফ্রান্সে আসা জিবরিল ভবনটিতে আসার আগে প্যারিসের উত্তরে অস্থায়ী ক্যাম্পে বসবাস করছিলেন। ছবি: ডানা আলবোজ/ইনফোমাইগ্রেন্টস


তিনি অবশ্য ফ্রান্সে শরণার্থী মর্যাদা পেয়েছেন। তার সব নথিপত্র ক্রমানুসারে থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কর্মসংস্থানের অভাব এবং ফরাসি ভাষার দক্ষতার অভাবের কারণে তিনি এখনও সরাকারি বাসস্থান পাননি৷ পরবর্তীতে তিনি উত্তর প্যারিসের ফুটপাতে থাকতে করতে বাধ্য হন।

উল্লেখ্য ইল-দ্যো-ফ্রন্সঁ বা বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলে সরকারি বাসা পাওয়া বেশ কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী চাকুরি থাকার পরেও আবেদনের নূন্যতম পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে বাসা পাওয়া দুষ্কর। অনেক অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থী অন্য শহরগুলোতে যেতে ইচ্ছুক না থাকায় বৃহত্তর প্যারিস অঞ্চলে বাসস্থান ব্যবস্থাপনা নিয়ে ব্যাপক চাপে থাকে স্থানীয় দপ্তরগুলো। 

‘নির্বাচন আমাদের রক্ষা করে’

আপাতত পুলিশকে ভবনের পরিস্থিতি স্থির দেখাচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষ এখনও উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করেনি।

‘লা শাপেল দো বু’ সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক নেস্টর বলেন, “চলমান রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আমাদেরকে কিছুটা রক্ষা করছে। দুই দফা নির্বাচনের মধ্যে কোন সমস্যা হবে না । পরবর্তীতে অবস্থা বুঝে আমরা পদক্ষেপ নিব।



তবে দখলের পর থেকেই জায়গাটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে। ইতিমধ্যে পরিবেশবাদী সবুজ দল ও অতি বামপন্থী ‘লা ফ্রন্সঁ আনসুমিজ’ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা অভিবাসীদে সমর্থনে স্কোয়াট পরিদর্শনে এসেছিলেন।

এটি ‘লা শাপেল দো বু’ সংস্থার প্রথম প্রচেষ্টায় নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আশ্রয়প্রার্থী, অনিয়মিত অভিবাসী ও ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসীদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া দৃশ্যমান করতে এবং তাদের অধিকার রক্ষার জন্য বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে এই অভিবাসন সংস্থাটি।

মূল প্রতিবেদন লেসলি কারেতেরো। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। 


এমএইউ/আরআর








 

অন্যান্য প্রতিবেদন