একজন অভিভাবকহীন নাবালকের আশ্রয় আবেদনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে বেলজিয়ামে একজন আইনি অভিভাবক বা টিউটর থাকা আবশ্যক। ছবি: পিকচার এলায়েন্স
একজন অভিভাবকহীন নাবালকের আশ্রয় আবেদনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করতে বেলজিয়ামে একজন আইনি অভিভাবক বা টিউটর থাকা আবশ্যক। ছবি: পিকচার এলায়েন্স

সম্প্রতি বেলজিয়ামে আসা ইউক্রেনীয় উদ্বাস্তুদের মধ্যে প্রায় ৬০০ জন অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক রয়েছে। এসব কিশোর ও তরুণদের প্রশাসনিক কাজে সহায়তার জন্য প্রয়োজন একজন আইনি অভিভাবক বা টিউটর । কিন্তু ইউক্রেনীয়দের আগমনের বেশ আগে থেকেই বেলজিয়ামে এই পেশায় যথেষ্ট লোক নেই।

ইউক্রেনের যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা অভিভাবকহীন নাবালকদের আসার পর বেলজিয়ামে এই খাতে টিউটর সংকটের বিষয়টি আরও বড় হয়ে উঠে এসেছে। বেলজিয়ামে প্রায় নয়শ কিশোর ও তরুণ বর্তমানে সরকারের পক্ষ থেকে একজন আইনি অভিভাবক বা টিউটের পেতে অপেক্ষা করছে। এটি ছাড়া এসব নাবালকদের কোনো প্রশাসনিক কার্যক্রম ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব নয়। 

বেলজিয়ামের ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস অফ জাস্টিস স্থানীয় দৈনিক লো সোয়ারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, “নাবালকদের আইনি অভিভাবক পেতে গড়ে চার মাস অপেক্ষা করতে হবে। যেটি আগে ছিল দেড় মাস।”

টিউটর সংকটের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মূলত ২০২১ সাল থেকে বেলজিয়ামে অভিভাবকহীন বিদেশি নাবালকদের আগমনের হার উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত বেতন এবং পেশাগত মূল্যায়নের অভাবে সংকট বেড়েছে। 

পড়ুন>>ডিটেনশন সেন্টারের ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ করছে বেলজিয়াম

ফেডারেল পাবলিক সার্ভিস অব জাস্টিসের তথ্য অনুসারে, “২০১৫ সালের পর ২০২১ সালে বেলজিয়ামে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪,৮৮০ জন নাবালক আশ্রয় আবেদন করে।”

বেলজিয়ামের আশ্রয়প্রার্থীদের অভ্যর্থনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ফেদাজিলের নাবালকদের বিষয়ক দপ্তরের পরিচালক বায়োর্গের হেডউইগ ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “কয়েক বছর ধরে বেলজিয়ামে অভিভাবকহীন নাবালকদের মধ্যে আফগান তরুণরা সংখ্যাগরিষ্ঠ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। আফগানিস্তান বাদে অন্য তরুণরা প্রায়শই উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে এসে থাকে।”

ইউক্রেনীয় নাবালকেরা আপাতত ‘স্বজনদের সাথে’

তরুণ ও কিশোর ইউক্রেনীয়দের নিয়ে চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে বেলজিয়ামের আশ্রয় কর্তৃপক্ষ। এটা সত্য যে ইউক্রেনীয় আর আফগানদের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ন ভিন্ন। 

ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ ইউক্রেনীয় অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বেলজিয়ামে নিবন্ধিত হয়েছে। 

পড়ুন>>বেলজিয়ামে দুর্বল আশ্রয়ব্যবস্থা: আদালতে সরকারের নিন্দা

বায়োর্গের হেডউইগ বলেন, “ইউক্রেনীয়রা প্রধানত প্রধানত পরিবার বা আত্মীয়দের সাথে বেলজিয়ামে প্রবেশ করছেন। এমন অভিভাবকদেরও দেখা গেছে যারা তাদের সন্তানকে এখানে দিতে এসে পরে ইউক্রেনে চলে গিয়েছেন।”

যদিও এসব ইউক্রেনীয়রা বর্তমানে এক বা একাধিক প্রাপ্তবয়স্ক আত্নীয়দের সাথেই আছে। কিন্তু বেলজিয়ামের আইন অনুসারে অভিভাবকহীন নাবালকদের উপর যেহেতু বর্তমানে তাদের পিতামাতার কর্তৃত্ব নেই। সেক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী একজন আইনী অভিভাবক বা টিউটর থাকতেই হবে।”

অপরদিকেন, ফ্রান্সে টিউটর সহ নাবালকদের যাবতীয় বিষয়গুলোর জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভাগের নাম শিশুদের জন্য সামাজিক সহায়তা দপ্তর (এএসই)। মূলত এই দপ্তরই অভিভাবকহীন নাবালকদের যত্ন নেয়।

এই দপ্তরটি প্রথমে একজন নাবালককে প্রাথমিক মূল্যায়নের করে, পরবর্তীতে উক্ত নাবালক আইনিভাবে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে স্বীকৃতি পেলে তার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরুর জন্য পাবলিক প্রসিকিউটর দ্বারা নিযুক্ত অ্যাডহক প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। যিনি এক প্রকার তার আইনি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 

বিদেশি এবং উদ্বাস্তুদের জন্য সমন্বয় এবং উদ্যোগের জন্য গঠিত কাঠামো সিরে এর কর্মকর্তা ক্লেমেন্ট ভ্যালেন্টিন বিশ্বাস করেন,” বেলজিয়ামে যদি পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন না হয় তাহলে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসা এসব কিশোর ও তরুণদের জন্য কোনই লাভ হবে না।” 

পড়ুন>>বেলজিয়ামে লটারিতে জেতা আড়াই কোটি টাকা তুলতে পারছেন না এক অভিবাসী

তিনি আরও বলেন, তবে এটি ইতিমধ্যেই পুর্ব থেকে থাকা চাপের মাত্রা বাড়িয়েছে। ফেডারেল

পাবলিক সার্ভিস অফ জাস্টিস তো গণমাধ্যমে স্বীকার করেছে যে এখন ৮৯০ জন নাবালক টিউটরের অপেক্ষায় আছে।”

বেলজিয়ামে, যে কেউ চাইলে রেড ক্রস বা কারিতাসের মতো প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষন নিয়ে একজন স্বেচ্ছাসেবী টিউটর হিসেবে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। 

নতুন বরাদ্দের ঘোষনা

ক্লেমেন্ট ভ্যালেন্টিন ব্যাখ্যা করেন, “একজন টিউটর যখন কোন নাবালককে তার আইনি এবং প্রশাসনিক কাজে সাহায্য করার জন্য যান তখন তাকে সব জায়গায় স্বশরীরে যেতে হয়। কাজটির জন্য একজন ব্যক্তিকে অনেক সময় ব্যয় করতে হয়। এটি সর্বদা একজন টিউটরকে সমান্তরালভাবে অন্য পেশা অনুশীলন চালিয়ে যাওয়া কঠিন করে তোলে। উপরন্তু বেলজিয়ামে টিউটরের চাকুরিটি খুবই কম বেতনের। ফ্রান্স বা অন্য ইউরোপীয় দেশের মতো এটি এখানে স্বীকৃত পেশা নয়। 

ঘাটতি মেটাতে বিদেশী নাবালকদের অভ্যর্থনার সাথে জড়িত বেলজিয়ামের সংস্থাগুলি টিউটরদের জন্য আরও ভাল পারিশ্রমিকের আহ্বান জানিয়েছে। এছাড়া সংস্থাগুলো এই পেশা ও পদবিকে পুনর্মূল্যায়ন করার জন্যও আবেদন জানিয়েছে।

বেলজিয়ামের বিচার মন্ত্রনালয়ের উপর নাবালকদের অভিভাবকত্ব পরিষেবা নির্ভর করে। বর্তমান পরিস্থিতির উন্নতি করার লক্ষ্যে সম্প্রতি এই মন্ত্রনালয় এপ্রিলের শুরুতে ৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন ইউরো বা ৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে।এ



এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন