মিরাল ক্যাম্প থেকে বাসে করে শরণার্থী ও অভিবাসীদের লিপা ক্যাম্পে সরিয়ে নেয়া হয়েছে | ছবি: নো নেম কিচেন
মিরাল ক্যাম্প থেকে বাসে করে শরণার্থী ও অভিবাসীদের লিপা ক্যাম্পে সরিয়ে নেয়া হয়েছে | ছবি: নো নেম কিচেন

বসনিয়ার মিরাল ক্যাম্প থেকে শরণার্থী ও অভিবাসীদের সরিয়ে জনবিচ্ছিন্ন লিপা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নো নেম কিচেন’৷ ফেসবুক ও টুইটারে এ সংক্রান্ত ছবি প্রকাশের পাশাপাশি গণমাধ্যমে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সংগঠনটি৷

বসনিয়া-ক্রোয়েশিয়া সীমান্ত সংলগ্ন শহর ভেলিকা ক্লাদুসা গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নমুখী (ইইউ) শরণার্থী ও অভিবাসীদের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত ছিল৷ দুই বছর আগেও সেখানে প্রায় ছয়শ বাংলাদেশি অভিবাসী ও শরণার্থী মিরাল ক্যাম্প এবং ক্যাম্প সংলগ্ন জঙ্গল ও পরিত্যক্ত ভবনে অবস্থান করছিলেন৷ এছাড়া আরো বেশ কয়েকশত বিভিন্ন দেশের আশ্রয়প্রার্থী ছিলেন সেখানে৷ 

ভেলিকা ক্লাদুসা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত হওয়ায় ক্যাম্পটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল৷ সেটি সরিয়ে নিতে তারা বিভিন্ন সময় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন৷

 

তবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ডয়চে ভেলের প্রতিবেদক আরাফাতুল ইসলাম ও অনুপম দেব কানুনজ্ঞ শহরটিতে অনেক কম সংখ্যক অভিবাসী ও শরণার্থীদের দেখতে পান৷ ভেলিকা ক্লাদুসায় তখন মাত্র দশজনের মতো বাংলাদেশি অভিবাসী ও শরণার্থীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়৷ এছাড়া দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সীমিত সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থী তখন শহরটিতে অবস্থান করছিলেন৷ 

অন্যত্র চলে গেছেন অনেকে

গত দুই বছরে বাংলাদেশিদের প্রায় সবাই ইটালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানান ভেলিকা ক্লাদুসায় অবস্থানরত দুই বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থী৷ তাদের একজন আশরাফুজ্জামান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘ওরা তো সবাই চলে গেছে৷ ইটালি, ফ্রান্সে চলে গেছে৷ কেউ কেউ ট্যাক্সি গেমে, কেউ কেউ হেঁটে হেঁটে চলে গেছেন৷’’

অভিবাসীদের ভাষায়, সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পছন্দমতো রাষ্ট্রে পৌঁছানোর নাম ‘গেম’৷ সীমান্ত পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথ পাড়ি দিয়ে এভাবে অবৈধভাবে পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াটিকে তারা ‘গেম মারা’ বলে থাকেন৷

‘নো নেম কিচেন’ বৃহস্পতিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, মিরাল ক্যাম্পটি আজ (২৮ এপ্রিল) সকালে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের লিপা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷

সংগঠনটির হিসাবে মিরাল ক্যাম্প থেকে দেড়শো থেকে দুশো শরণার্থী ও অভিবাসী এবং আটজনকে পার্শ্ববর্তী একটি অস্থায়ী শিবির থেকে তুলে নিয়ে বাসে করে লিপা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ এসব শরণার্থীদের অধিকাংশই যুদ্ধ, সংঘাত এবং একনায়কতন্ত্র চলছে এমন সব দেশ থেকে এসেছেন বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে৷ 

‘জোর করে নিয়ে আসা হয়েছে’

মিরাল ক্যাম্প ও ক্যাম্পের পাশের একটি শিবির থেকে বৃহস্পতিবার সকাল সাতটার দিকে একদল পুলিশ ‘জোর করে’ শরণার্থী ও অভিবাসীদের তুলে এনেছে বলে দাবি করেছেন আফগান আশ্রয়প্রার্থী এহেসানুল্লাহ৷ ইনফোমাইগ্রেন্টসের সঙ্গে টেলিফোনে আলাপকালে তিনি লিপা ক্যাম্পে অবস্থান করছিলেন৷ 

তিনি বলেন, ‘‘সকাল সাতটার দিকে আমাদের ঘরে পুলিশ ঢুকে যাকে যেভাবে পেয়েছে সেভাবেই নিয়ে বাসে তুলেছে৷ মিরাল ক্যাম্প থেকেও একইভাবে অনেককে তুলে আনা হয়েছে৷ এরপর চারটি বাসে করে সবাইকে লিপা ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়েছে৷’’

তালেবান কাবুল দখলের পর ২৩ বছর বয়সি এহেসানুল্লাহ আফগানিস্তানত্যাগ করে ইউরোপের পথ ধরেন৷ তিনি দেশটিতে পুলিশে চাকুরি করায় পরিবর্তীতে পরিস্থিতিতে মৃত্যুর ঝুঁকিতে ছিলেন বলে জানান৷ 

এহেসানুল্লাহ বলেন, ‘‘মিরাল ক্যাম্পটি পুলিশ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে৷ সেখানে আর কোনো অভিবাসী বা শরণার্থী নেই৷’’

এদিকে, বসনিয়ার সংবাদমাধ্যম এনওয়ান জানিয়েছে, দেশটির ফরেনার্স এফেয়ার্স সার্ভিস স্থানীয় পুলিশের সহায়তায় বৃহস্পতিবার মিরাল ক্যাম্পে অভিযান পরিচালনা করেছে৷ দেশটির নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে সাড়ে তিন বছরের পুরনো মিরাল ক্যাম্প থেকে সব আশ্রয়প্রার্থীকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে৷ 

 বসনিয়ার বিহাচ শহর থেকে চল্লিশ কিলোমিটার দূরে একটি জনবিচ্ছিন্ন পাহাড়ি এলাকায় লিপা ক্যাম্পটি অবস্থিত৷ ভেলিকা ক্লাদুসা থেকে সড়ক পথে সেখানে যেতে দুই ঘণ্টার মতো সময় লাগে৷

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদকরা ফেব্রুয়ারি মাসে ইইউ’র অর্থায়নে তৈরি শিবিরটি স্বল্পসময়ের জন্য পরিদর্শনের সুযোগ পান৷ সেসময় সেখানে তিনশোর মতো শরণার্থী ও অভিবাসী অবস্থান করছিলেন যদিও শিবিরটির ধারণক্ষমতা দেড়হাজারের বেশি৷ 


 

অন্যান্য প্রতিবেদন