রুয়ান্ডার গ্যাশোরা ট্রানজিট সেন্টারে কয়েকজন অভিবাসী৷ ছবি: ডয়চে ভেলে
রুয়ান্ডার গ্যাশোরা ট্রানজিট সেন্টারে কয়েকজন অভিবাসী৷ ছবি: ডয়চে ভেলে

অনিয়মিত পথে ব্রিটেনে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে চলছে আলোচনা সমালোচনা৷ পূর্ব আফ্রিকার দেশটি আসলে কতটা উপযুক্ত তাদের আশ্রয়ের জন্য? বিভিন্ন সময়ে সেখানে থাকা অভিবাসী, শরণার্থীরা জানিয়েছেন, অভিজ্ঞতা তেমন সুখকর নয়৷

২০১৫ সালে ইসরায়েল থেকে রুয়ান্ডায় পাঠানো হয় ৩৫ বছরের ইরিত্রিয়ান অভিবাসী বেরহানি৷ দেশটিতে বসবাস তার জন্য ‘ভীষণ কঠিন’ ছিল৷ পরিবার নিয়ে কিছুদিন পরই সাউথ সুদানে চলে যান তিনি৷ সেসময় যুদ্ধ পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশটিতে তার জন্য অর্থনৈতিক সুযোগ রুয়ান্ডার চেয়ে ভাল ছিল বলে জানান তিনি৷

ব্রিটেনে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডা পাঠাতে সম্প্রতি আফ্রিকার দেশটির সঙ্গে চুক্তি করেছে বরিস জনসন সরকার৷ পাস হয়েছে এই বিষয়ক আইনও৷ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার পর কোনো আশ্রয়প্রার্থীর আবেদন গৃহীত হলেও তাদেরকে রুয়ান্ডাতেই থাকতে হবে৷ 

কিন্তু রুয়ান্ডা তাদের জন্য কতটা নিরাপদ হবে সে নিয়ে প্রশ্ন উঠছে৷ যুক্তরাজ্যের ভিতরে-বাইরে অনেকে সমালোচনা রয়েছে৷ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘও৷ এই নীতিকে অবৈধ দাবি করে ব্রিটেনের আদালতে হাজির হয়েছে একটি অধিকার সংস্থা৷

রুয়ান্ডার পূর্ব অভিজ্ঞতা

পূর্ব আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় বর্তমানে এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি শরণার্থী রয়েছেন৷ বুরুন্ডি, কঙ্গো, লিবিয়া, পাকিস্তানসহ তারা বিভিন্ন দেশ থেকে এসেছেন৷ গত ১৪ এপ্রিল রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিতি প্যাটেলের সঙ্গে চুক্তি শেষে এমন তথ্য জানান দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিনসেন্ট বিরুতা৷ 

রুয়ান্ডার সঙ্গে অন্য দেশের এমন চুক্তি এবারই প্রথম নয়৷ বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েল, আফ্রিকান ইউনিয়নের দেশসহ অন্যদের সঙ্গেও শরণার্থী, অভিবাসীদের আশ্রয় দেয়ার সমঝোতা হয়েছে৷ 

এর অংশ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছেন অনেকে৷ এদের মধ্যে বেশিরভাগ ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়ার৷ আছেন লিবিয়ায় বন্দিশিবিরের কাটানো একটি দলও৷ 

আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠাতে চুক্তি করছেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল ও রুয়ান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিনসেন্ট বিরুতা৷ ছবি: এপি
আশ্রয়প্রার্থীদের পাঠাতে চুক্তি করছেন ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রীতি প্যাটেল ও রুয়ান্ডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিনসেন্ট বিরুতা৷ ছবি: এপি


রুয়ান্ডার নিপীড়নের রাজনীতি

এক কোটি ৩০ লাখ জনগোষ্ঠীর ছোট রুয়ান্ডা আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি জন ঘনত্বপূর্ণ দেশ৷ জমি আর সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে বহু বছর ধরে সেখানে জাতিগত ও রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে৷ ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডা গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছেন আট লাখ তুতসি ও হুতি সম্প্রদায়ের মানুষ৷ 

এরপর পরিস্থিতির অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে৷ কর্তৃপক্ষের কড়াকড়িতে রুয়ান্ডার শহরগুলো আফ্রিকার অন্য দেশগুলোর তুলনায় অনেক পরিচ্ছন্ন৷ প্রেসিডেন্ট পল কাগামের সরকারের অধীনে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হচ্ছে৷ তবে রাজনৈতিক দমনপীড়ন নিয়ে সমালোচনা আছে৷ দেশটিতে বিরোধী রাজনৈতিক দল নেই বললেই চলে৷ 

রাস্তার দরিদ্র্য হকার, যৌনকর্মী, গৃহহীন, ছিন্নমূল শিশু, ছোটখাট অপরাধের সন্দেহে মানুষকে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের জন্য রুয়ান্ডা সরকারকে দায়ী করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ৷ এমন পরিস্থিতিতে ব্রিটেন থেকে পাঠানো শরণার্থীরা দেশটিতে কতটা সুরক্ষিত থাকবেন তা নিয়ে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করছেন৷ 

পড়ুন: আশ্রয়প্রার্থীদের তৃতীয় দেশে পাঠানোর বিল পাস করলো যুক্তরাজ্যের সংসদ

রুয়ান্ডা ছাড়তে চান তারা

রুয়ান্ডায় জীবিকা নির্বাহ ও কাজের সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ আছে অভিবাসীদের৷ ইরিত্রিয়ার শরণার্থী বেরহানি বার্তাসংস্থা এপিকে জানান, কিগালিতে শেষ পর্যন্ত তিনি কোনো কাজ পাননি৷ তাকে খাবার দাবার আর ভাড়ার জন্য বন্ধুদের উপর নির্ভরশীল থাকতে হতো৷ 

তিনি বলেন, ‘‘রুয়ান্ডায় চাকরি না থাকলে জীবন খুব কঠিন৷’’ নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, ‘‘আমার কয়েকজন বন্ধু ইউরোপে যেতে পেরেছে৷ আমার এক আত্মীয় ক্যানাডাতে স্থায়ী হয়েছে৷ আশা করছি আমিও একদিন তাদের সঙ্গে ক্যানাডায় যোগ দিব৷’’

রুয়ান্ডার পূর্বে গাসোরা ক্যাম্পে লিবিয়া থেকে পাঠানো কয়েকশো অভিবাসীর একজন এপিকে বলেন, ‘‘আমাদের অনেকে এরইমধ্যে সুইডেন চলে গেছে৷’’ নাম প্রকাশ না করা শর্তে তিনি বলেন, রুয়ান্ডায় আশ্রয়কেন্দ্রে তারা পর্যাপ্ত খাবার কিংবা কাপড় পান না৷ যে কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনা থাকলেও তারা ইউরোপে যেতে চান৷ 

তবে উল্টো উদাহরণও আছে৷ কিগালিতে কিছু অভিবাসী নিজেদের ভালোভাবে গুছিয়ে নিতে পেরেছেন৷ তাদের একজর ইরিত্রিয়ার ফ্রেজঘি আলাজার৷ তিনি এখন একটি বেকারির অংশীদার৷ গত ১০ বছর ধরে তাকে সুযোগ দিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি দেশটির সরকারের কাছে ধন্যবাদ জানান৷ 

তিনি বলেন, ‘‘রাজধানীতে আপনি কোনো ব্যবসা শুরু করলে কেউ আপনার ব্যবসায় বাধা দিতে আসবে না৷ কাউকে আপনার ঘুস দিতে হবে না৷ এখানে নিরাপত্তা আছে৷ কাজেই রুয়ান্ডায় থাকার সুবিধা আছে৷’’

সংঘাতের আশঙ্কা

রুয়ান্ডা সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, ব্রিটেন কবে নাগাদ অভিবাসীদের পাঠানো শুরু করবে সেটি এখনও নিশ্চিত নয়৷ চুক্তি মাফিক বাড়িঘর তৈরি ও অভিবাসীদের সমাজে আত্তীকরণ প্রক্রিয়ার খরচ হিসেবে রুয়ান্ডাকে ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিবে ব্রিটেন৷ তবে সামনের দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানায়নি এখনও রুয়ান্ডার সরকার৷ 

পরিকল্পনার মধ্যে কিগালিতে একটি হোস্টেলে কিছু অভিবাসীকে থাকতে দেয়ার কথা রয়েছে৷ তবে সেখানে গণহত্যার ঘটনায় বেঁচে ফেরা মানুষজন কয়েক বছর যাবৎ বসবাস করছেন৷ সেখান থেকে তাদের উচ্ছেদ নিয়ে এরইমধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, যা পরবর্তীতে অভিবাসীদের সঙ্গে সংঘাতের কারণ হয়ে উঠতে পারে৷ দেশটির বিরোধী দলীয় একজন আইন প্রণেতা ফ্রাংক হাবিনেজা বলেন, ‘‘অভিবাসীদের কারণে জমি নিয়ে নাগরিকদের সঙ্গে সংঘাত হতে পারে৷ আমাদের অবশ্যই সেটি এড়াতে হবে৷’’

যেসব আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থী স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হবেন তাদের কী হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে৷ কিগালিতে বসবাসরত মানবাধিকার গবেষক টম মুলিসা বলেন, ‘‘রুয়ান্ডা কি তাদেরকে নিজ দেশে ফেরত পাঠাবে? শরণার্থী স্বীকৃতি পেতে ব্যর্থ হওয়াদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও সতর্কতার সঙ্গে ভেবে দেখতে হবে৷ এই দায়িত্ব আশ্রয়দাতা দেশের উপরে বর্তায়৷’’

এফএস/আরআর (এপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন