(ফাইল ছবি) জিও ব্যারেন্টসের জাহাজে উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের একটি দল৷ সৌজন্যে: এমএসএফ
(ফাইল ছবি) জিও ব্যারেন্টসের জাহাজে উদ্ধারকৃত অভিবাসীদের একটি দল৷ সৌজন্যে: এমএসএফ

বিপদজনক জেনেও ইটালিতে পৌঁছাতে লিবিয়া পাড়ি জমান আফ্রিকা, এশিয়ার অভিবাসনপ্রত্যাশীরা৷ সেখানে নির্যাতনের শিকার হওয়া তেমনই কিছু অভিবাসী, শরণার্থীকে ইটালির উপকূলে চিকিৎসা দিচ্ছে জিও ব্যারেন্টস জাহাজ৷ তাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছে বার্তা সংস্থা এএফপি৷

২০১৮ সালে ইথিওপিয়া, সুদান হয়ে দক্ষিণ পূর্ব লিবিয়ার শহর আল কুফরায় পৌঁছান জন নামের ইরিত্রিয়ান এক অভিবাসী৷ লিবিয়ায় এসে তিনি অপহরণের শিকার হন৷ এরপর তিনি বিক্রি হতে থাকেন এক দল থেকে আরেক দলের কাছে৷ এভাবেই চলতে থাকে অনেকদিন৷ 

বার্তা সংস্থা এএফপিকে ২৫ বছর বয়সি জন বলেন, ‘‘আমাকে বেঁধে মারধর করা হতো, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা হতো৷’’

এক পর্যায়ে জন তাদের হাত থেকে মুক্তি পেতে সমর্থ্য হন৷ এরপর তিনি সমুদ্রপথে ইটালি পৌঁছানোর চেষ্টা করেন৷ এপ্রিলে অভিবাসীদের একটি দলের সঙ্গে নৌকা থেকে তাকেও উদ্ধার করে মানবিক সহায়তা সংস্থা ডক্টর্স উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) জাহাজ জিও ব্যারেন্টস৷ বর্তমানে এমন আরো অভিবাসী নিয়ে জাহাজটি ইটালির উপকূলে অবস্থান করছে৷ সেখানে চলছে তাদের চিকিৎসা৷ 

এমএসএফ এর চিকিৎসক মোহাম্মদ ফাদলাল্লা বলেন, ‘‘আমরা দেখেছি তাদের অনেকের শরীরেই সহিংসতা, আঘাতের চিহ্ন রয়েছে যা দীর্ঘমেয়াদী সমস্যার কারণ হতে পারে৷ তাদের কেউ বুলেটবিদ্ধ হয়েছেন, কারো শরীর পুড়ে গেছে, কারো শরীরে বৈদ্যুতিক শক দেয়া হয়েছে, অনেকের শরীরে আঘাতের চিহ্নও রয়েছে৷’’

প্রতি বছর আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে আগত ইউরোপে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বড় একটি দল লিবিয়া থেকে সমুদ্রে ইটালির উদ্দেশে পাড়ি জমান৷ জাতিসংঘের হিসাবে গত বছর এই সংখ্যাটি ছিল ৩১ হাজার৷ লিবিয়ায় আসা অভিবাসীদের অনেকেই পাচারকারীদের হাতে অপহৃত হন৷ অপহরণকারীরা তাদের মুক্তির বিনিময়ে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করে৷ পালাতে গিয়ে ধরা পড়লে তাদের উপরে চলে অত্যাচার নয়ত হন হত্যার শিকার৷

যারা পালিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করেন তাদের উদ্ধারে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত জাহাজগুলোর একটি জিও ব্যারেন্টস৷ মূলত ইটালি ও আন্তর্জাতিক জলসীমায় বিপদে পড়া অভিবাসীদের সহায়তা করে তারা৷ ফাদাল্লা বলেন, ‘‘জাহাজের চিকিৎসকরা অনেকসময়ই অভিবাসী, শরণার্থীদের শরীরে ক্ষতচিহ্ন দেখে বুঝে নেয়ার চেষ্টা করেন তাদের উপরে কী ঘটেছিল৷ অভিবাসীদের অনেকেরই মানসিক চিকিৎসারও প্রয়োজন পড়ে৷’’ 


তিনি বলেন, ‘‘উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তারা মানসিক সমস্যাও ভুগছেন৷ ভয়, ঘুমাতে না পারা, ভয়ংকর স্মৃতি মনে পড়া, উদ্বেগ, বিষন্নতায় ভোগেন তারা৷’’

লিবিয়ায় অভিবাসীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতনের ঘটনা নতুন নয়৷ প্রায়শই গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে সেখানকার ভয়াবহ পরিস্থিতি উঠে আসে৷ গত বছর জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনও সেখানে সম্ভাব্য ‘মানবতাবিরোধী অপরাধের’ তথ্য পেয়েছে৷ জাতিসংঘের একজন বিশেষজ্ঞ লিখেছেন, ‘‘রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় শক্তির হাতে অভিবাসীদের উপর বড় আকারের সহিংসতার ঘটনা ঘটছে, যার পেছনে উচ্চ পর্যায়ের সংস্থা ও রাষ্ট্রের মদত রয়েছে৷’’

লিবিয়ায় অভিবাসী, শরণার্থীদের উপর ঘটে চলা মানবাধিকার লঙ্ঘনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমালোচনাও রয়েছে৷ অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো সমুদ্রপথে আসাদের বাধা না দিতে এবং নিরাপদ ও বৈধ অভিবাসনের সুযোগ করে দিতে তাগিদ দিয়ে আসছে৷ লন্ডনের আইনি সংস্থা ডাওটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী জেলিয়া সেইন বলেন, ‘‘লিবিয়া থেকে আসা শরণার্থী, অভিবাসীদের দুর্দশা আর উপেক্ষা করা চলবে না৷ যারা সেখানে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ পুনর্বাসন সেবা দিতে হবে৷’’

সেনেগালের অভিবাসী এলাদজ এনডাই তেমনই নির্যাতনের যন্ত্রণা বয়ে বেড়াচ্ছেন৷ অপহরণকারীরা ১৯ বছর বয়সি এই তরুণের মাথা এবং ঠোঁটে বোতল দিয়ে আঘাত করে, শরীরে যার চিহ্ন এখনও রয়েছে৷ লিবিয়ায় তিনি কয়েক সপ্তাহ বন্দি ছিলেন৷ তিনি বলেন, ‘‘লিবিয়ায় প্রতিটি জায়গায় আপনি অপহৃত হবেন, নির্যাতনের শিকার হবেন৷’’

এই ঝুঁকির কথা জেনে অভিবাসীরা এখনও এই পথে ইউরোপ পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন৷ নির্যাতনের ঝুঁকির কথা জেনেও ইরিত্রিয়ার জন এসেছিলেন লিবিয়াতে৷ তিনি বলেন, ‘‘বিপদজনক জেনেও আমরা ইটালিতে আসতে চাই৷’’

পড়ুন: ইটালি পৌঁছাতে কেন মরিয়া বাংলাদেশিরা

এফএস/এআই (এএফপি) 

 

অন্যান্য প্রতিবেদন