২০ বছর বয়সি সিদ্দিক এবং ১৮ বছর বয়সি আশ্রয়প্রার্থী খাজা গত বছর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
২০ বছর বয়সি সিদ্দিক এবং ১৮ বছর বয়সি আশ্রয়প্রার্থী খাজা গত বছর ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেন। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস

কষ্টকর, ব্যয়বহুল এবং বিপজ্জনক যাত্রার পর স্বপ্নের ব্রিটিশ ভূমিতে পা রাখা অভিবাসীদের কষ্টের দিন শেষ হয় না। চ্যানেল পাড়ি দিয়ে বা বিভিন্ন উপায়ে দেশটিতে আসা আশ্রয়প্রার্থীরা বর্তমানে সেখানকার অস্পষ্ট এবং অমানবিক আশ্রয়ব্যবস্থার গ্যাড়াকলে বন্দি হয়ে পড়েছেন। কয়েক মাস ধরে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র থেকে হোটেলে হোটেলে ঘুরতে থাকা এসব অভিবাসীদের মোহভঙ্গ হয়েছে।

অনেক অভিবাসীর কাছে সহজ ও দ্রুত কর্মসংস্থানের জন যুক্তরাজ্য বেশ আকর্ষণীয় একটি দেশ। ব্রেক্সিটের পর ব্রিটেন জুড়ে শ্রমিক ঘাটতি দেখা দেয়ার পর থেকে এই আগ্রহ আরও বেশি বেড়েছে। কিন্তু এসব স্বপ্ন থেকে বাস্তবতা প্রায়শই ভিন্নরুপে হাজির হয় অভিবাসীদের সামনে। 

২৫ বছর বয়সি আফগান আশ্রয়প্রার্থী ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে বেশ কাছে অবস্থিত একটি দশ তলা উঁচু দালানের ধূসর অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আমাদের সাথে কথা বলছেন। চারিদিক থেকে বিভিন্ন বড় সড়ক ও, এক্সপ্রেসওয়েবেষ্টিত এই দালানটি আগে একটি হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে বর্তমানে এটি আর অবকাশ যাপনের কেন্দ্র নয় বরং ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। ভবনটিতে বর্তমানে ইরান এবং আফগানিস্তান থেকে আসা কয়েক শতাধিক কিংবা হাজারের কাছাকাছি অভিবাসী কোন প্রকার সুযোগসুবিধা ছাড়াই মাসের পর মাস ধরে অবস্থান করছেন। 


২০২১ সালের ৩ নভেম্বর, ইংলিশ চ্যানেলের যুক্তরাজ্যে উপকূল থেকে উদ্ধার হন আফগান আশ্রয়প্রার্থী ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
২০২১ সালের ৩ নভেম্বর, ইংলিশ চ্যানেলের যুক্তরাজ্যে উপকূল থেকে উদ্ধার হন আফগান আশ্রয়প্রার্থী ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত জানান, “আমাদেরকে গত বছরের ২০ নভেম্বর এখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল। আজ পর্যন্ত আমাদেরকে জানানো হয়নি, আমরা কতদিন পর্যন্ত এখানে অবস্থান করব। ইতিমধ্যে পাঁচ মাস হয়ে গেছে।”

ইসমাতুল্লাহ আফগানিস্তানের প্রাক্তন সরকারের একজন পরিবহন প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তালেবান বিরোধী সরকারের হয়ে চাকুরি ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে যুক্ত থাকার কারণে তালেবানদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়ে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। নানান প্রতিকূল পথ পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে এসে বর্তমানে হোটেলের এই একঘেয়েমি জীবনে আরও বিষন্ন হয়ে পড়েছেন এই আফগান আশ্রয়প্রার্থী।


একটি প্রশাসনিক আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টার থেকে হোটেলে স্থানান্তের আগে আফগান আশ্রয়প্রার্থী সিদ্দিক। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
একটি প্রশাসনিক আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টার থেকে হোটেলে স্থানান্তের আগে আফগান আশ্রয়প্রার্থী সিদ্দিক। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সীমান্ত পার হয়ে উত্তর ফ্রান্সের কালে থেকে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছান ইসমাতুল্লাহ। দীর্ঘ যাত্রায় কোন দেশ আর শহর হয়ে এখানে এসেছেন সেটিও স্পষ্ট মনে নেই তাঁর। এই আশ্রয়প্রার্থীর মাথায় একমাত্র চিন্তা ছিল ইংল্যান্ডে আসা। 

২০২১ সালে চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা ২৮ হাজার অভিবাসীদের মধ্যে ইসমাতুল্লাহ একজন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন এখানে এসে পৌঁছাতে পারলে এই দেশে নিরাপত্তা খুঁজে পেতে সক্ষম হবেন। কিন্তু ২০২১ সালের ৩ নভেম্বর সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত ইংল্যান্ডে একটি কঠিন ও অমানবিক আশ্রয়ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন বলে মনে করছেন এই আশ্রয়পার্থী। ইসমাতুল্লাহর কাছে এটি ঠিক মধ্য সমুদ্রে এসে ডুবে যাওয়ার মত ঘটনা। 


ইংল্যান্ডের উপকূলীয় শহর ডোভারের প্রাথমিক নিবন্ধন কেন্দ্র। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
ইংল্যান্ডের উপকূলীয় শহর ডোভারের প্রাথমিক নিবন্ধন কেন্দ্র। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


'ভোর ৩ টায় ঘুম থেকে জাগিয়ে বলা হয়- তুমি চলে যাচ্ছ'

ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের কখনোই ব্রিটেনে স্বাগত জানানো হয় না। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এটিকে কখনও গোপন করে না। বরং প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ফরাসি উপকূল থেকে আসা নৌকাগুলিকে বাঁধা দেয়ার জন্য নজরদারি বাড়িয়েছেন। 

এছাড়ান সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের রুয়ান্ডায় পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন এবং উপকূলে আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা সামরিকভাবে পরিচালনা করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। 

নতুন আসা আশ্রয়প্রার্থীদের আগমনের প্রথম মাসে রাখার জন্য জন্য বন্দর শহর ডোভারের প্রাথমিক নিবন্ধন কেন্দ্র, ম্যানস্টন ও নেপিয়ারে আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টার এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা ২০০টি হোটেলকে প্রস্তুত করেছে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। 

এসব জায়গায় আশ্রয়প্রার্থীদের অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য রাখা হচ্ছে। 

যদিও বলা হচ্ছে, এসব কেন্দ্রের কারণে অস্থায়ী শরণার্থী শিবির গঠন এড়ানো যাবে। প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাজ্যে এজাতীয় অস্থায়ী শিবিরের উপস্থিতি বিরল। 

উল্টো আশ্রয়প্রার্থীদের এসব কাঠামোতে যখন তখন কোন প্রকার নিয়ম ছাড়া স্থানান্তর যুক্তরাজ্যের পুরো আশ্রয়পদ্ধতিকে অস্বচ্ছ, কঠোর এমনকি অযৌক্তিকতা করে তুলেছে।

কেন্ট রিফিউজিস অ্যাকশন নেটওয়ার্কের সদস্য ব্রিজেট চ্যাপম্যান বলেন, "অভিবাসীদের নিয়মিত স্থানান্তর করা হয়। তাদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে সেটি জানানো হয় না।”

২০ বছর বয়সি আরেক আফগান আশ্রয়প্রার্থী সিদিক বলেন, “হিথ্রো বিমানবন্দরের টার্মিনাল ৫ এর বিপরীতে অবস্থিত একটি আটককেন্দ্রে থাকাকালীন সময়ে এক ভোর রাতে প্রায় ৩ টার দিকে দরজায় জোরে ধাক্কা দিয়ে আমাকে জাগিয়ে তোলা হয়। আমাকে বলা হয়, 'আপনি এখান থেকে চলে যাচ্ছেন'। আমাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে জানতাম না। আমার সমস্ত জিনিস গুছিয়ে নেওয়ার মত সময় দেয়া হয় নি। আমাকে বেশ কিছু রেখে যেতে হয়েছিল।”

সেই রাতে কর্তৃপক্ষ তাকে আগের কেন্দ্রের পাশেই অবস্থিত হলিডে ইন-এ স্থানান্তরিত করেছিল।  

এনজিও হিউম্যানস ফর রাইটস নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ম্যাডি হ্যারিস এক প্রতিক্রিয়ায় ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, “এই প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায় সম্পূর্ণরূপে সীমাবদ্ধ। প্রাথমিক পর্যায়ে অভিবাসীদের তথ্য বা আইনি সহায়তা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। আমাদের কাছে এসব কেন্দ্রের কোনো তথ্য ও তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ নেই। এসব কেন্দ্রে আমি এমন কোনো অভিবাসীর দেখা পাইনি যিনি সবেমাত্র যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন।"


ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরের পরিত্যক্ত ফক্সটোন সামরিক কেন্দ্র,  যেটিকে বর্তমানে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস
ইংল্যান্ডের কেন্ট শহরের পরিত্যক্ত ফক্সটোন সামরিক কেন্দ্র, যেটিকে বর্তমানে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। ছবি: ইনফোমাইগ্রেন্টস


বেশ কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থীর সাক্ষ্য অনুসারে, যুক্তরাজ্যে প্রবেশের শুরুর দিনগুলোতে অভিবাসীদের মোবাইল ফোনগুলো বাজেয়াপ্ত করে তাদের বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলা হয়।

তথ্যের অভাব

প্রকৃতপক্ষে ইংল্যান্ডে আসার প্রথম সপ্তাহগুলোতে আশ্রয়প্রার্থীদের সাথে তাদের প্রতিনিধি ছাড়া কেউ দেখা করার সুযোগ পান না। ডোভারের রেজিস্ট্রেশন সেন্টারটি সমুদ্রে বাধাপ্রাপ্ত আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য প্রথম কেন্দ্র। বন্দরের ঠিক কাছেই অবস্থিত কালো ত্রিপল দিয়ে ঘেরা কেন্দ্রটির ভেতরে কী হচ্ছে সেটি দেখার কোন সুযোগ নেই।

আফগান আশ্রয়প্রার্থী সিদ্দিক বলেন, “এটি একটি বড় তাঁবুর মতো, আমরা বালিশ ছাড়া মেঝেতে শুয়েছিলাম।”

ব্রিজেট চ্যাপম্যান বলেন, “অভিবাসীরা কংক্রিটের উপর রাত কাটায়। তাদের কোন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করার সুযোগ নেই। কখনো কখনো তাদের কাপড় কয়েকদিন পর্যন্ত ভেজা থাকে। এছাড়াও অসংখ্য আহত আশ্রয়প্রার্থীরা আছেন যাদের কোন প্রকার যত্ন ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছে।”

যুক্তরাজ্যের বর্তমান আশ্রয়পদ্ধতির অস্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত জানান, "তিনি আইন বোঝেন না।” 

তাকে যে ফর্মগুলি পূরণ করতে দেয়া হয় সেগুলো তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তবে সম্প্রতি তিনি শিখেছেন যে, তিনি একজন সরকারি আইনি কর্মকর্তার সাহায্য চাইতে পারেন যার অর্থ রাষ্ট্র প্রদান করে। অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে তথ্য পাওয়া কঠিন হলেও অভিবাসীদের নিজেদের মধ্যে সাহায্য করার প্রবণতা রয়েছে।

অভিবাসীদের নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান এখানে সবচেয়ে ভাল কাজ করে। হোটেলগুলিতে বেশ কয়েক মাস ধরে থাকা আশ্রয়প্রার্থীরা নতুন আগতদের জানায় যে তারা চাইলে অভিবাসী সহায়তা সংস্থা থেকে সাহায্য ও আইনি সহায়তায় নিতে পারবেন।

ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত বলেন, "আমি আগে যে হোটেলে ছিলাম সেখানে থাকা অভিবাসীরা আমাকে বলেছিল এখানে কর্তৃপক্ষ কোন তথ্য দেয় না। তাই এখন আমিও বর্তমান হোটেলে নতুনদের বিভিন্ন তথ্য দিয়ে নতুনদের সাহায্য করি।”

সার্বিক তথ্য থেকে অন্ধকারে থাকা এসব অভিবাসীরা বিভিন্ন গুজবের প্রতিও বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে পড়েন।

ইসমাতুল্লাহ ফেতরাত আরও যোগ করেন, “কিছু লোক বলে যে, আমাদেরকে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। অন্যরা বলে যে আমাদের শরণার্থী মর্যাদা পেতে ১৫ বছর সময় লাগবে। আসলে আমাদের কী হবে?”

বিভিন্নভাবে এসব প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন এই আফগান আশ্রয়প্রার্থী। অবশ্য তিনি আমাদের কাছে সে উত্তর আশা করেন না। বিড় বিড় করে এই আফগান বলতে থাকেন, “ভবিষ্যত নিয়ে ভাবা অসম্ভব।”


লন্ডন ও বন্দর শহর কেন্ট থেকে ফিরে ইনফোমাইগ্রেন্টসের বিশেষ প্রতিনিধি শার্লত ওবেরতির বিশেষ প্রতিবেদন। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। 


এমএইউ/আরআর















 

অন্যান্য প্রতিবেদন