ইরানে আফগান অভিবাসীরা৷ ছবি: টন কোয়েনে/পিকচার অ্যালায়েন্স
ইরানে আফগান অভিবাসীরা৷ ছবি: টন কোয়েনে/পিকচার অ্যালায়েন্স

শরণার্থী সংকট নিয়ে ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে৷ এই পরিস্থিতিতে আফগান অভিবাসীদের নিয়ে আলোচনা করতে রেড ক্রসের আন্তর্জাতিক কমিটির (আইসিআরসি) মহাসচিব রবার্ট মারডিনি সোমবার ইরান সফর করেন৷

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা ইরনা জানিয়েছে, ২০২১-এর আগস্টে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় আসে৷ তারপরই ১০ লাখ আফগান শরণার্থী ইরানে আশ্রয় চেয়েছেন৷ ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পাঁচ লাখ আফগান নাগরিক বর্তমানে ইরানের বাসিন্দা৷ইরানে আফগান শরণার্থীদের ঢলের মাঝেই দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে৷ সফরের সময় মারডিনি সংবাদসংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘‘ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে৷’’

মারডিনি জানিয়েছেন, আফগান অভিবাসী এবং শরণার্থীদের স্বাস্থ্য পরিষেবা দেয়ার উপায় নিয়ে ইরানে রেড ক্রিসেন্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন আইসিআরসির কর্মকর্তারা৷

দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক?

অনেক আফগান অভিবাসীদের জন্য ইরানে বসবাস করা অতীতে খুব একটা সহজ ছিল না৷অনেকের মতে, তাদের সঙ্গে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ করা হয়েছে৷ ভোট দেওয়া, স্বাস্থ্য পরিষেবা, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ ছিল৷

সংবাদসংস্থা এপি জানিয়েছে, আফগান শরণার্থী নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বেড়েছে৷ গত ১০ মে ইনফোমাইগ্রেন্টস দারি বিভাগ কথা বলেছিল আফগান শরণার্থীদের সঙ্গে৷ মুসা নামের এক শরণার্থী তাদের জানান, তালেবান ক্ষমতায় আসতেই তিনি আফগানিস্তান থেকে ইরানে পালিয়ে আসেন৷ আফগানিস্তান এবং জার্মানিতে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন৷ তাই জার্মানিতে ভিসার আবেদন করতে মুসার সমস্যা নেই৷ সেইমতোই আট মাস আগে তিনি জার্মানি থেকে নিশ্চয়তা পেয়েছেন৷ তিনি বলেন, ‘‘আমি সাত মাস আগে ইরানে এসেছি৷ তখন জার্মান দূতাবাসে ভিসার জন্য আবেদন করেছি৷ জার্মান দূতাবাস আমার সমস্ত নথি পেয়েছে৷ আমি তাদের উত্তরের অপেক্ষা করছি৷ দুর্ভাগ্যবশত তারা এখনও কিছু জানায়নি৷’’ এদিকে ইরানে তার ভিসা ফুরিয়ে গিয়েছে৷ কর্তৃপক্ষ ভিসার মেয়াদ বাড়াতে রাজি নন৷ কী করবেন বুঝতে পারছেন না মুসা৷

অনেক আফগান অভিবাসী ইরান হয়ে তুরস্ক এবং পরে ইউরোপের কোনো দেশে যেতে চায়৷ ছবি: গুগল ম্যাপ
অনেক আফগান অভিবাসী ইরান হয়ে তুরস্ক এবং পরে ইউরোপের কোনো দেশে যেতে চায়৷ ছবি: গুগল ম্যাপ

ইরান-আফগানিস্তান সীমান্তে

সম্প্রতি ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে প্রায় হাজার কিলোমিটার সীমান্ত এলাকাজুড়ে উত্তেজনা বেড়েছে৷সংবাদসংস্থা এপি জানিয়েছে, প্রতি সপ্তাহে পাঁচ হাজার আফগান কাজের জন্য সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে প্রবেশের চেষ্টা করছেন৷ এপির রিপোর্ট অনুযায়ী, সম্প্রতি তালেবান ও ইরানি সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে৷ অন্যদিকে, তিনটি শহরে আফগান নাগরিকেরা ইরানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন৷ ইরানের পবিত্রতম ধর্মস্থানের মধ্যে একটিতে সম্প্রতি একজন আফগান অভিবাসী ছুরি হামলা চালিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে৷

‘‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবে’’

ইরানে বসবাসকারী আরেক আফগান অভিবাসী মোহাম্মদ৷ তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টস দারিকে বলেন, তালেবান আফগানিস্তানের সম্পূর্ণ ক্ষমতা দখল করার আগেই তিনি ইরানে পালিয়ে এসেছেন৷ আড়াই বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবান হামলায় আহত হন তার বাবা৷ এখন মোহাম্মদ তার মা এবং পাঁচ বোনের সঙ্গে ইরানে রয়েছেন৷ আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণ করলে, মোহাম্মদের বাবা জার্মানিতে আশ্রয় পেয়েছেন৷ তিনি পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসার আবেদন জানিয়েছেন৷

হেরাত প্রদেশে ইরান থেকে ফেরত আফগানরা | ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স/এপি
হেরাত প্রদেশে ইরান থেকে ফেরত আফগানরা | ছবি: পিকচার-অ্যালায়েন্স/এপি

তেহরানের জার্মান দূতাবাস মোহাম্মদের থেকে নির্দিষ্ট নথিগুলি জমা নিয়েছে৷ কিন্তু ভিসা নিশ্চিত হয়নি৷ এদিকে ইরানে আফগান শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে৷ এই পরিস্থিতিতে মোহাম্মদ বলেন, ‘‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবে৷’’ তার সন্তানদের স্কুলে যেতে দেয়া হচ্ছে না, কোনো স্বাস্থ্য পরিষেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি৷ তার কথায়, ‘‘আমাদের কোনো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট নেই৷ জার্মানি থেকে বাবা টাকা পাঠাচ্ছে, সেটা পেতে কালঘাম ছুটছে৷ সব জায়গায় নগদ টাকা দিতে হয়৷ অনেক দোকান আবার সেটাও নিতে চাইছে না৷’’

ইউনাইটেড ইনস্টিটিউট অফ পিসের আফগান বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু ওয়াটকিনস সংবাদসংস্থা এপিকে বলেন, ‘‘এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর শরণার্থী সংকটগুলির মধ্যে একটি৷এই সংকট ঐতিহাসিক শত্রুতায় মোড় নিতে চলেছে৷’’

মোহাম্মদ সাদেক নামে একজন আফগান অভিবাসী ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, তিনি বেশ কয়েক বছর ইরানে রয়েছেন৷ তার কথায়, ‘‘সম্প্রতি কড়াকড়ি অনেক বেড়েছে৷ ‘ফরেনার্স সেনসাস ব্যুরো’-তে আফগান শরণার্থীদের নাম লেখাতে হয়৷ জাতিসংঘ ইরানকে অর্থ দিচ্ছে যাতে তার মতো যারা আছেন তাদের সাহায্য করা যায়৷ এটি ইরানের সরকারের জন্য ইতিবাচক হলেও আমাদের জন্য মোটেও তা নয়৷’’

ফাইল থেকে: ইরানে কাজ খুঁজছেন আফগানরা ৷ ছবি: ডিডাব্লিউ
ফাইল থেকে: ইরানে কাজ খুঁজছেন আফগানরা ৷ ছবি: ডিডাব্লিউ

বেড়েছে ফেরত পাঠিয়ে দেয়ার হার

সাদেগের অভিযোগ, ‘‘আফগানিস্তানে সংকটময় পরিস্থিতি সত্ত্বেও ইরান প্রতিদিন হাজার হাজার শরণার্থীকে আটক করছে কিংবা ফেরত দিচ্ছে৷’’ আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিষয়ক সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আফগানদের ফেরত পাঠানোর পাঠানোর হার মাসিক ৬০ শতাংশ হারে বেড়েছে৷ আফগানিস্তানে আইওএমের উপপ্রধান অ্যাশলে কার্ল বলেন, ‘‘চলতি বছরে দুই লাখ ৫১ হাজার আফগান শরণার্থীকে ফেরত পাঠানো হয়েছে৷’’ কার্ল জানিয়েছেন, এদের অনেকেই চোট-আঘাত নিয়ে ফিরেছেন৷কারও ক্ষেত্রে চোট দুর্ঘটনার কারণে, আবার কেউ গুলি হামলায় চোট পেয়েছেন৷ সাদেগের অভিযোগ, ‘‘বছরের পর বছর ধরে এটা চলছে৷ ইরানের কর্মকর্তাদের কাছে এটাই স্বাভাবিক হয়ে গিয়েছে৷’’

‘ইরানের ক্ষমতা সীমিত’

আফগান শরণার্থীদের কোভিড টিকার ব্যবস্থা করেছে আইসিআরসি এবং ইরানের রেড ক্রিসেন্ট৷ ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খারাপ হয়েছে৷ পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমবে বলে মনে হচ্ছে না৷ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সঈদ কাহাতিবজাদেহ সংবাদসংস্থা এপিকে বলেন, ‘‘ইরানের ক্ষমতা সীমিত৷ এভাবে আফগান শরণার্থীদের ঢেউ ইরানে আসতে পারে না৷’’ এদিকে ইরানে তরুণদের কর্মসংস্থানের হার মাত্র ২৩ শতাংশের কাছাকাছি৷ ২০১৮ সাল থেকে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দাম ৫০ শতাংশ পড়ে গিয়েছে৷ তেহরানের একজন বিশেষজ্ঞ রেয়া গোবেইশাভি এপিকে জানিয়েছেন, শরণার্থীদের নিয়ে তৈরি হওয়া এই পরিস্থিতি সামলাতে ইরান প্রস্তুত ছিল না৷

আরকেসি/কেএম (এমা ওয়ালিস) 

 

অন্যান্য প্রতিবেদন