অফপ্রার সুরক্ষা কর্মকর্তা বা প্রটেকশন অফিসারের সামনে সাক্ষাৎকার দিতে আসা একজন নারী আশ্রয়প্রার্থী। ছবি: মেহেদি শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস
অফপ্রার সুরক্ষা কর্মকর্তা বা প্রটেকশন অফিসারের সামনে সাক্ষাৎকার দিতে আসা একজন নারী আশ্রয়প্রার্থী। ছবি: মেহেদি শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস

শরণার্থী এবং রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য নির্ধারিত একমাত্র ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘অফপ্রা’ এখন থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের কাছে পাঠানো চিঠি ও নথি অনলাইনে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার নিয়ম চালু করেছে। তবে অফপ্রা’র এই ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া প্রায়শই আশ্রয়প্রার্থীদের নতুন করে সমস্যায় ফেলে বলে দীর্ঘদিন যাবত অভিযোগ করে আসছে লা সিমাদ, সকুর ক্যাথলিকসহ অভিবাসন সংস্থাগুলো।

ফ্রান্সে আবেদন করা আশ্রয়প্রার্থীরা ‘অফপ্রা’ থেকে আর কোন চিঠি বা নথি ডাকযোগে ​​পাবেন না। 

সোমবার থেকে শরণার্থী এবং রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের কাছে পাঠানো সাক্ষাৎকারের চিঠি এবং আশ্রয় আবেদনের সিদ্ধান্ত ইন্টারনেটে অফপ্রার ওয়েবসাইটে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য তৈরী একটি ব্যক্তিগত ফাইলে প্রেরণ করা হচ্ছে।

ডাবলিন বিধিমালার আওতায় থাকা ব্যক্তিরা এবং অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্করা ছাড়া বাকি সকল এই আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নতুন এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। 


নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে বর্তমানে আশ্রয়ের আবেদনে করা প্রার্থীরা প্রেফেকচুরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস ‘গুদা’তে গেলে সেখানে ডিজিটাল ফাইলের ব্যাপারে সার্বিক নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে। 

উদাহরণস্বরুপ, আগে ‘গুদা’ বা প্রেফেকচুরের ওয়ান স্টপ সার্ভিস অফপ্রাতে আশ্রয় আবেদন পাঠানোর ফাইলসহ মাসিক ভাতা পাওয়ার কার্ড ও যাবতীয় তথ্য প্রদান করত। 

পাশাপাশি তারা ওয়েবসাইটে আশ্রয়প্রার্থীরা যেন নিজের নামে একটি ফাইল খুলতে পারেন তার জন্য প্রয়োজনীয় আইডি ও পাসওয়ার্ডও দিয়ে দিচ্ছেন। এসব তথ্য অবশ্য ৩২টি আলাদা ভাষায় অনুবাদ করে আশ্রয়প্রার্থীদের বিতরণ করা হচ্ছে। উল্লেখ্য বরাবরের মতো বাংলা এই ৩২টি ভাষার তালিকায় আছে। 

প্রেফেকচুর থেকে দেয়া আইডি ও পাসওয়ার্ডের সাহায্যে একজন আশ্রয়প্রার্থী অফপ্রার পোর্টালে নিজের নামে একটি ফাইল খুলে সেখানে অফপ্রা থেকে পাঠানো সব চিঠি এবং আশ্রয় আবেদনের সাক্ষাৎকারের তারিখ ও সিদ্ধান্ত জানতে পারবেন। 

এক্ষেত্রে মনে রাখা উচিত, পোর্টালে লগিন বা প্রবেশ করতে প্রেফেকচুর থেকে দেয়া আইডি সংখ্যাটি ফ্রান্সে একজন আশ্রয়প্রার্থীর বিদেশি পরিচয়পত্র সংখ্যা হিসেবে বিবেচিত হবে। 

অর্থ্যাৎ একজন আশ্রয়প্রার্থী পরবর্তীতে শরণার্থী মর্যাদা পেতে সক্ষম হলে এটি হবে তার ‘রেসিপিসে’ (রেসিডেন্স কার্ড পাওয়ার আগে দেয়া অস্থায়ী বসবাসের অনুমতিপত্র) ও রেসিডেন্স কার্ডের সংখ্যা । যেটিকে ফরাসি ভাষায় “AGDREF” সংখ্যা বলা হয়। 

মোবাইল বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অফপ্রার পোর্টালে প্রথমবারের মতো ব্যক্তিগত ফাইল খোলার আগে সেখানে যাবতীয় তথ্যের সাথে আশ্রয়প্রার্থীকে একটি সক্রিয় মোবাইল নাম্বার এবং ইমেইল ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে। 

যার সাহায্যে একজন আশ্রয়প্রার্থী প্রতিবার তার ব্যক্তিগত ফাইলে লগইন বা প্রবেশ করার সময় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গোপন সংখ্যার ধাপ অতিক্রম করতে পারবেন। এছাড়া কোনো আশ্রয়প্রার্থী তার পাসওয়ার্ড ভুলে গেলে বা হারিয়ে ফেললে নতুনভাবে একাউন্ট পুনরুদ্ধারের জন্য এই ফোন নাম্বার ও ইমেইল প্রয়োজন হবে। 

২০২০ সালে নেয়া উদ্যোগ 

ফরাসি আশ্রয়দপ্তর অফপ্রার এই ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালের জুলাই মাসে এই প্রকল্পটি পরীক্ষামূলকভাবে ফ্রান্সের ‘ব্রোতাইন’ এবং ‘নুভেল আকিতেন’ অঞ্চলে কার্যকর হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পরিষেবাটি এখন পুরো ফরাসি ভূখন্ডে প্রয়োগ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে লা সিমাদের আশ্রয় বিশেষজ্ঞ জেরা সাদিক ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ‘২০২০ সালে চালু হওয়া এ দুটি অঞ্চলে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা সমগ্র ফ্রান্সের আশ্রয়ের আবেদনের মাত্র ৩ থেকে ৫ শতাংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে এই উদ্যোগটি এখন পুরো দেশের আশ্রয় আবেদনগুলিকে পরিচালনা করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী হবে কি না তা দেখার বিষয়। কারণ শুধুমাত্র বৃহত্তর প্যারিস বা ইল-দ্যো-ফ্রান্সঁ অঞ্চলেই প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার আশ্রয় আবেদন জমা পড়ে।” 

আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নিবেদিত এই নতুন পরিষেবা সম্পর্কে ‘অফপ্রা’ নিশ্চিত করেছে, “এই সুবিধাগুলি অসংখ্য আশ্রয়প্রার্থীকে প্রশাসনিকভাবে স্বাবলম্বী করবে। এছাড়া এটি আশ্রয়প্রার্থীদের সময় সাশ্রয় করে যেকোন জায়গা থেকে তাদের ফাইলে প্রবেশের সুযোগ দিবে।”

তবে কোনো আশ্রয়প্রার্থী যদি ডিজিটাল পোর্টালে প্রবেশ নিয়ে সাময়িক কোন সমস্যা পড়ে সেক্ষেত্রে প্রেফেকচুরের নির্ধারতি আশ্রয়বিষয়ক কার্যালয় স্পাডা অথবা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা সামাজিক কর্মকর্তা বা এসিস্ট্যান্ট সোশ্যালের মাধ্যমে সমস্যা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেবা দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হবে বলে জানায় অফপ্রা। 

কিন্তু সিমাদের আশ্রয় বিশেষজ্ঞ জেরা সাদিক মন করেন, কোন সমস্যার ক্ষেত্রে সমাধানের যেই কৌশলের কথা বলা হচ্ছে সেটি শুধুমাত্র বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে ’সংযুক্ত ব্যক্তিদের জন্য’ উপকারী হবে। বিশেষ করে যারা কোন প্রকার আশ্রয় কাঠামোতে বসবাস করেন না তাদের জন্য এটি বেশ জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। 

তিনি আরও যোগ করেন, আমাদেরকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে ফ্রান্সে সরকারি প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি ডিজিটাল বৈষম্য রয়েছ। সবাই চাইলেই এসব তথ্য-প্রযুক্তিগত বিষয় সহজে আয়ত্ত করতে পারেন না। তাদের জন্য এরকম ডিজিটাল পদক্ষেপ বেশ জটিল। কারণ ডিজিটাল ক্ষেত্রে সরাসরি সাহায্য পাওয়ার জন্য দ্রুত কাউকে পাওয়া যায় না। একটি ভালো বিকল্প বেশ গুরুত্বপূর্ণ।”


মূল প্রতিবেদন মার্লেন পানারা, ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন