সন্তানের কবরের পাশে বসে আছেন এসফান্দিয়ার ফাগকিরি। ফটো আরিস মেসিনিস/এএফপি।
সন্তানের কবরের পাশে বসে আছেন এসফান্দিয়ার ফাগকিরি। ফটো আরিস মেসিনিস/এএফপি।

গ্রিসের রাজধানী এথেন্সের শহরতলী সিসতো অঞ্চলে স্থানীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কবর। সেখানে সমাহিত পাঁচ বছর বয়সি ছেলের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এসফান্দিয়ার ফাগকিরি বলেন, ছেলের কথা মনে হলে নানা কারণেই তার কষ্ট হয়।

শুধু সন্তান হারানোর বেদনাই নয়, যেহেতু এটি খ্রিস্টানদের কবরস্থান তাই সন্তানের কবরের সামনে মুসলিম রীতি অনুযায়ী সব সময় আচার পালন করতে পারেন না, সেই কষ্টও তার।

২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে ছেলে হাসিবোল্লাহ ফাকগিরি উত্তর এথেন্সের রিফিউজি ক্যাম্পর সামনে আরো কয়েজন ছেলেমেয়ের সাথে খেলাধুলা করার সময় ট্রাকের ধাক্কায় মারা যায়। 

দুর্ঘটনার জন্য শরণার্থী ক্যাম্পের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দায়ী করে এনজিওগুলো।  

সন্তানকে সিসতো অঞ্চলের অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের কবরস্থানে দাফন করার পর ফাগকিরি পরিবারকে জানতে পারে, তিন বছর পর অর্থাৎ, ২০২৩ সালে এখানে আরেকটি কবর করা হবে। 

এথেন্সের এই অঞ্চলে এটিই নাকি নিয়ম। কারণ প্রায় এক কোটি লোকের এই অঞ্চলে মানুষ মারা যাওয়ার পর কবরস্থ করার যথেষ্ট জায়গা নেই। যে কারণে একই কবরের উপর কয়েক বছর পর নতুন কবর খোঁড়া হয়। 

স্থানীয় নিয়ম এটি হলেও ফাগকিরি পরিবারের কাছে এটি ছিল এমন একটি বিষয় যা তারা ভাবতেই পারে না। 

এথেন্সের মিউনিসিপ্যালিটি অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান দিমোসথেনিস স্তামাতাতোস বলেন, কবরস্থান ব্যবহারের জন্য যাদের পরিবার পয়সা দেয় না, তিন বছর পর তাদের দেহ সরিয়ে এখানে নতুন কবর দেওয়া হয়। আর সরিয়ে ফেলা দেহাবশেষ এখানকার চার্চে রাখা হয়।   

অর্থোডক্স খ্রিস্টান প্রধান দেশ গ্রিসে মুসলমানদের জন্য আলাদা কবরের তেমন একটা ব্যবস্থা নেই। রাজধানী এথেন্সের বাসিন্দা মুসলিমদের জন্য নিকটবর্তী কবরস্থানটি হলো শহর থেকে ৭৫০ কিলোমিটার দূরে তুরস্ক সীমান্তের কাছে। 

২০১৫ সালের শরণার্থী সংকটের আগে অবশ্য গ্রিসের রাজধানী এথেন্সে মুসলমানদেনর সংখ্যা তেমন বেশি ছিল না। তবে গত কয়েক বছরে আফ্রিকা ও এশিয়া থেকে শরণার্থীরা আসায় রাজধানীতে বর্তমানে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখে দাঁড়িয়েছে। 

রাজধানী থেকে ৭৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কবরস্থানে দাফন করার বিষয়টি তাদের জন্য ব্যয়বহুল। 

গ্রিসে বসবাসরত আফগান নাগরিকদের নিয়ে গঠিত সংগঠনের সভাপতি রেজাই মোহতার বলেন, মৃতদেহ ৭৫০ কিলোমিটার দূরে নিয়ে যাওয়ার খরচ বেশি হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে অর্থোডক্সদের কবরস্থানেই মুসলিমদের সমাহিত করা হচ্ছে। 

এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে রাজধানী এথেন্সে মুসলিমদের জন্য আলাদা একটি কবরস্থানের দাবি জানান দেশটিতে বসবাসরত পাকিস্তান কমিউনিটির সভাপতি জাভেদ আসলাম। 

এদিকে কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১৬ সালে স্থানীয় অর্থডোক্স চার্চ সিসতো অঞ্চলে অবস্থিত তাদের সিমেট্রিতে আলাদা করে পাঁচ একর জমি মুসলমানদের কবরের জন্য দান করেছিল। কিন্তু প্রশাসনিক জটিলতায় আটক আছে প্রক্রিয়াটি।   

দেশটির শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, এথেন্সে মুসলিমদের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে জমি দান করার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ চলছে। উল্লেখ্য, গ্রিসের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই দেশটির ধর্মীয় বিষয়াদি দেখাশোনা করে। 

অবশ্য মন্ত্রণালয় থেকে কবরের জায়গা দেওয়ার ব্যপারে আশার কথা শোনা গেলেও, মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশটির বাম রাজনীতিক দল সিরিজা এ বিষয়ে হতাশার কথা জানায়।

তাদের দাবি,বার্তমানে ক্ষমতাসীন কট্টরপন্থী দল খুব একটা অভিবাসীবান্ধব নয়। যেমন সরকার সীমান্তে অবৈধভাবে অভিবাসীদের পুশব্যাক করে এমন অভিযোগও আছে। 

সিরিজার সাংসদ গিওরগোস সাইকোগিওস বলেন, শরণার্থীদের প্রাপ্য মর্যাদা এবং অধিকার প্রদানের বিষয়ে গ্রিসের অবস্থান ইতিবাচক নয়।  

উল্লেখ্য, এথেন্সে সরকার অনুমোদিত প্রথম মসজিদটি নির্মাণ হয় ২০২০ সালে। তার আগে প্রায় এক দশক ধরে মসজিদ নির্মাণের বিরোধিতা করছিল অর্থোডক্স চার্চের কিছু নেতা এবং কট্টরপন্থীরা রাজনীতিবিদেরা। 

আরআর/কেএম (এএফপি)

 

অন্যান্য প্রতিবেদন