৩৫ বছর বয়সি রামা* আফ্রিকার দেশ গিনি থেকে জীবনের নিরাপত্তার খুঁজে সাইপ্রাসে আসেন। ছবি: শরিফ বিবি/ইনফোমাইগ্রেন্টস
৩৫ বছর বয়সি রামা* আফ্রিকার দেশ গিনি থেকে জীবনের নিরাপত্তার খুঁজে সাইপ্রাসে আসেন। ছবি: শরিফ বিবি/ইনফোমাইগ্রেন্টস

প্রায় তিন বছর আগে আফ্রিকার দেশ গিনি ছেড়ে সাইপ্রাসে এসেছিলেন আশ্রয়প্রার্থী রামা (ছদ্মনাম )। নতুন করে জীবন গড়তে সাইপ্রাসে আসা ৩৫ বছর বয়সি অভিবাসী নারী আজ হতাশ। আশ্রয় আবেদনের প্রক্রিয়া চলাকালীন চাকরির খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরলেও কেউই একজন আশ্রয়প্রার্থীকে চাকরি দিতে রাজি হননি। বিস্তারিত পড়ুন ইনফোমাইগ্রেন্টসের সঙ্গে রামার সাক্ষাৎকারে।

সাক্ষাৎকারের শুরুতে রামা জানান, চাকরি খুঁজতে গিয়ে তার অভিজ্ঞতা কেমন৷ ইনফোমাইগ্রেন্টসকে তিনি বলেন, “আমি ভাগ্যবান যে আমাকে পুরানারা অভ্যর্থনা কেন্দ্রে মাত্র তিন দিন থাকতে হয়েছিল। সেখান থেকে চলে আসার পর আমি সাইপ্রাসের ঠিক কেন্দ্রে অবস্থিত গালাতা এলাকায় একটি হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অস্থায়ী আবাসন পাই।”

“সেখানে পৌঁছানোর এক সপ্তাহ পর আমি আশেপাশের এলাকায় কাজ খুঁজতে শুরু করি। কিন্তু প্রতিবার আমাকে মালিকপক্ষ থেকে বলা হয়: “আমরা শুধুমাত্র সাইপ্রাস অথবা ইউরোপীয় নাগরিকদের চাকুরিতে নিয়ে থাকি, কোন আশ্রয়প্রার্থীকে নয়।””

সাইপ্রাসে অবস্থানরত সকল আশ্রয়প্রার্থী তাদের আবেদন জমা দেওয়ার এক মাস পর থেকে কাজ করার জন্য অনুমতি পেয়ে থাকেন৷ তবে চাইলেই যে কোনো খাতে কাজ করার সুযোগ নেই৷ সাইপ্রাসের আইন অনুযায়ী আশ্রয়প্রার্থীরা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু কাজে যোগ দিতে পারেন৷ এগুলি হল–কৃষি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, গাড়ির গ্যারেজের কর্মচারীর কাজ, বিভিন্ন পরিষেবার ব্যবস্থা (বিশেষ করে পরিবার এবং খাদ্য সরবরাহকর্মী) এবং পর্যটন সম্পর্কিত অবকাঠামোগুলোতে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়৷

উদাহরণস্বরূপ, সাইপ্রাসে কৃষি বা গবাদি পশু পালনে কাজ করা একজন শ্রমিক প্রতি মাসে প্রায় ৪৫৫ ইউরো ব ৪৫ হাজার টাকা সমমানের বেতন পেয়ে থাকেন৷ আশ্রয়প্রার্থীদের চাকরির আবেদনের জন্য ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে পাবলিক এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস অনলাইন সিস্টেমে নাম নথিভুক্ত থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে৷

তবে আশ্রয়প্রার্থীদের মনে রাখতে হবে, একবার কেউ কাজে যোগ দিলে সেক্ষেত্রে আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে মাসিক ভাতা বাতিল করা হবে৷ এমনকি, কাজ চলে গেলে ফের সরকারি ভাতা পেতে অসুবিধা হবে৷ 

অপব্যবহার ও বকেয়া বেতন 

রামা জানান, “এই অঞ্চলে চাকরি খুঁজে পেতে ব্যর্থ হওয়ার পরে আমি ভেবেছিলাম রাজধানী নিকোসিয়াতে গেলে হয়তো সহজ হবে। সরকারের কাছ থেকে যে মাসিক ভাতা পাচ্ছি সেই অর্থ দিয়ে আমি গণপরিবহনে চলাচলের জন্য একটি বাস কার্ড কিনেছি। প্রতিদিন সকালে রাজধানীতে গিয়ে শহরের সব রেস্তোরাঁ ও হোটেলে ঘুরেছি। কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছি এবং প্রতিবার আমি একই উত্তর পেয়েছি: “কোন আশ্রয়প্রার্থী নেয়া হয় না।””

গিনি থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীর কথায়, “কাজ না করে এদেশে থাকা বেশ কঠিন। যদিও আমি ও অন্য আশ্রয়প্রার্থীরা মাসিক একটি ভাতা পাচ্ছি। কিন্তু আমরা শুধুমাত্র ভাতার উপর নির্ভর করে থাকতে পারি না”

তিনি বলেন, “আমি প্রায় এক বছর চেষ্টা করেছি কিন্তু কোন কাজ জোগাড় করতে পারি নি। পরবর্তীতে আমি সমুদ্র তীরবর্তী পর্যটন শহর লার্নাকাতে চলে আসি। সেখানে অনেক রেস্তো ও বার ছিল। আমি ভেবেছিলাম আমার জন্য অন্তত সেখানে একটি সুযোগ রয়েছে। আমি অন্যান্য আশ্রয়প্রার্থীদের সাথে একটি অ্যাপার্টমেন্টে থেকে কাজ খোঁজা শুরু করেছিলাম। অবশেষে আমি একটি রেস্টুরেন্টে কাজ খুঁজে পেতে সক্ষম হই। আমার কাজ ছিল রান্নাঘরে খাবার প্রস্তুত করা। আমি খাবার পরিবেশন করতাম না।”

তিনি জানান, “কিন্তু কাজ শুরু বেশ কিছুদিন পর, রেস্তোরাঁর মালিক আমাকে তার শরীরে ম্যাসাজ বা মালিশ করতে বলেন। এভাবে একবার বা দুই বার, তারপর দিনে কয়েকবার একই কাজ করতে অনুরোধ করেন। একদিন রাত দুইটায় হঠাৎ কল দিয়ে তিনি আমাকে রেস্তোরাঁয় আসতে বলেন। এভাবে চলার এক মাস পর আমি রাগে ক্ষোভে কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমাকে এক মাস কাজের জন্য মাত্র ১৫০ ইউরো বেতন দেয়া হয়েছিল। আমি মালিকের কাছে আরও ৪৫০ ইউরো পাব। আমি প্রতিবাদ করেছিলাম কিন্তু সে পাত্তা দেয়নি। আমি আর কী করতে পারি?”

“বিবাদ করার ক্ষমতা আমার নেই”

নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে অবশেষে একটি চাকরি পাওয়ার গল্প বলতে গিয়ে রামা বলেন, “এরপর আমি লার্নাকাতে স্যালাড তৈরির কারখানায় নতুন চাকরি খুঁজে পাই। সেটা ছিল ২০ জানুয়ারি। সেখানে আমার কাজ ছিল বিভিন্ন স্যালাড পাতাগুলোকে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে প্লাস্টিকের ব্যাগে প্যাক করা। এই কাজ আমি করেছি৷ ঘণ্টায় ৩ ইউরো দেয়ার কথা ছিল। আমার প্রথম বেতন পেতে আমাকে ফেব্রুয়ারির শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল, যেটি ছিল প্রায় ৬০০ ইউরো। আবার আমার সাইপ্রাসে কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ছিল না। আমি এটি কারখানার কর্তৃপক্ষকে বলেছিলাম তারা কোন প্রতিক্রিয়া জানায়নি। আমি সেখানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম।”

“গত দুই বছর ধরে চাকরি খুঁজে পেতে আমার এত কঠিন সময় গিয়েছে যে আমি এই পথ ছেড়ে যেতে পারিনি। আমার হাতে কোনো বিকল্প ছিল না।” 

সাইপ্রাসে “স্বেচ্ছায় বেকার” বলে বিবেচিত যে কোনো আশ্রয়প্রার্থীর কাছ থেকে মাসিক ভাতা তুলে নেওয়া হয়। কোনো ব্যক্তি দুই বার চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে এই নিয়ম প্রয়োগ করা হয়। সেক্ষেত্রে কারণ যাই হোক না কেন (উদাহরণস্বরূপ কর্মক্ষেত্রে যাওয়া বা তাদের সন্তানদের দেখাশোনা) সেটি ধর্তব্যে নেওয়া হয় না। 

রামা বলেন, “নতুন স্যালাড কারখানায় কাজ চলা অবস্থায় আমার একদিন ভয়ানক পেট ব্যথা শুরু হয়। ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি আমাকে কারখানায় কাজ বন্ধ করার পরামর্শ দেন। সারাদিন পরিশ্রম করা আমার জন্য ভালো নয়। গত বছর, আমাকে একটি অপারেশন করতে হয়েছিল, তারা জরায়ু থেকে একটি ফাইব্রয়েড বাদ দিতে হয়েছিল। আমি কাজের মালিকের সঙ্গে আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলাম, যাতে করে আমি কাজের সময় একটু বসতে বা বিশ্রাম নিতে পারি। কিন্তু তারা সেই অনুরোধ শুনতে ইচ্ছুক ছিল না। ২২ এপ্রিল আমি কাজ ছেড়ে চলে আসি। তাদের কাছে এখনও আমার টাকা পাওনা আছে কারণ তারা আমাকে বেতন ছাড়াই প্রচুর কাজ করিয়েছিল৷’’

‘‘একজন আশ্রয়প্রার্থী হিসাবে তাদেরকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা নেই আমার। এখানে অধিকাংশ নিয়োগকর্তা আমাদের অবজ্ঞা করে। তাদের সঙ্গে কথা বলা ও যোগাযোগ কঠিন, কারণ তারা ইংরেজি বলতে চায় না। তারা শুধুমাত্র গ্রিক ভাষায় কথা বলতে চান। তো এখন কী করার আছে? আমি পুলিশের কাছে যাব না!

তার বক্তব্য, “আমি এখনও চাকরি খুঁজছি। এই মুহূর্তে, আমি সমুদ্রসৈকতের পাশে অনেক রেস্তোরাঁয় আবেদন করছি, কারণ শীঘ্রই পর্যটন মৌসুম শুরু হবে। এখানে বেঁচে থাকা খুব কঠিন, তবে আমি অন্তত বেঁচে আছি। আমি যদি আজ গিনিতে থাকতাম, তাহলে আমি মারা যেতাম।”


*সাক্ষাৎকার প্রদানকারীর অনুরোধে নাম পরিবর্তন করে ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে। সাইপ্রাস থেকে ফিরে মূল প্রতিবেদন মার্লেন পানারা। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/আরকেসি

 

অন্যান্য প্রতিবেদন