ইটালি-ফ্রান্স সীমান্তের ইটালি অংশে ফরাসি সীমান্ত পুলিশের স্থাপিত কার্যালয়। ছবি: সিনেটর গুইয়ুম গোন্তার
ইটালি-ফ্রান্স সীমান্তের ইটালি অংশে ফরাসি সীমান্ত পুলিশের স্থাপিত কার্যালয়। ছবি: সিনেটর গুইয়ুম গোন্তার

ইটালি-ফ্রান্স সীমান্তের কাছে ইটালীয় ভূখন্ডে ফরাসি পুলিশ স্থাপিত একটি কার্যালয় ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। অবৈধভাবে ফ্রান্সে প্রবেশের আগে সীমান্ত থেকে আটককৃত অভিবাসীদের কয়েক ঘণ্টার জন্য এই কার্যালয়ে রাখা হয় বলে জানা গেছে।

অভিবাসন সংস্থা ও এনজিওগুলো এটিকে ‘বেআইনি বলে’ এই পদ্ধতির নিন্দা জানিয়েছে।

ইটালি ভূখণ্ডে ফরাসি বর্ডার পুলিশের (পিএএফ) স্থাপিত স্থানীয় কার্যালয়ের প্রক্রিয়াকে আশ্চর্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন ফরাসি সিনেটে সবুজ দল থেকে নির্বাচিত সিনেট সদস্য গুইয়ুম গোন্তার।  

সোমবার ১৬ মে সীমান্ত অঞ্চলের বেশ কয়েকটি জায়গায় পরিদর্শনের সময় এই সিনেট সদস্য বলেন, “এই জাতীয় কাঠামোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরে আমি হতবাক।”

নতুন এই ভবনের সামনের অংশ ইটালীয় গ্রাম বারডোনেচের পাহাড়ী রাস্তার দিকে এবং অপর একটি অংশ ফ্রেজুস টানেলের ফরাসি অংশ পর্যন্ত বিস্তৃত।

ফ্রান্সের মাটিতে প্রবেশের আগে আটক হওয়া অনিয়মিত অভিবাসীদের নিয়ে এই ভবনেই নিয়ে আসা হয়। আটককৃতদের অধিকাংশকেই ফ্রাঙ্কো-ইটালীয় সীমান্তে চলাচল করা বাস থেকে আটক করা হয়। 

কার্যালয়ের ভেতরের অংশ। ছবি:সিনেটর গুইয়ুম গোন্তার।
কার্যালয়ের ভেতরের অংশ। ছবি:সিনেটর গুইয়ুম গোন্তার।


সিনেটর গুইয়ুম গোন্তার ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “অনেকগুলো ডেস্ক, কম্পিউটার, একটি বড় রুম এবং একটি বড় কালো বসার বেঞ্চের সমন্বয়ে কার্যালয়টি সাজানো হয়েছে।”

‘স্বেচ্ছাচারী আটক’

ফরাসি বর্ডার পুলিশ (পিএএফ) আটককৃতদের এই কার্যালয়ে নিয়ে এসে ফরাসি ভূখণ্ডে ‘প্রবেশের অস্বীকৃতি’ নামক একটি নথি প্রদান করে তাদেরকে ইটালীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। 

সীমান্তে আটকে পড়া বিদেশীদের সহায়তাকারী জাতীয় সংস্থা (আনাফে) এবং সবুজ দলের এই সিনেটর নতুন কার্যালয়ে চলা আটক পদ্ধতিতে বেশ কয়েকটি "অবৈধ কার্যক্রম" দেখতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

বিস্ময়ের সাথে গুইয়ুম গোন্তার ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “এই কেন্দ্রের সব কাজই আমার কাছে বেশ আশ্চর্যজনক। প্রথমত ফরাসি পুলিশ কেন ইটালীয় সীমান্তে তল্লাশি চালবে। দ্বিতীয়ত, যেসব অভিবাসী এখনও ফ্রান্সে প্রবেশই করতে পারেনি তাদেরকে কীভাবে ফ্রান্সে ‘প্রবেশ প্রত্যাখ্যান' করা হয়েছে বলে নথি প্রদান করা হচ্ছে।।”

আনাফে সংস্থার পরিচালক লর পোলা ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আমরা প্রত্যাশা করি যেন আশ্রয়প্রার্থীরা সীমানা অতিক্রম করতে পারে। বর্তমানে চলা প্রক্রিয়াটির আইনি ভিত্তি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন রয়েছে। কোন আইনের ভিত্তিতে অভিবাসীদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে? কিভাবে ফ্রান্স তার ভূখণ্ডের বাইরে থেকেই 'প্রবেশ প্রত্যাখ্যান' নামক নথি জারি করতে সক্ষম হচ্ছে?”

অধিকন্তু, যখন একজন অভিবাসীর প্রবেশ প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখন তাকে অবশ্যই আশ্রয় আবেদন করতে সক্ষম হওয়াসহ তার অধিকার সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে সেটি করা হচ্ছে না। সীমান্তে গ্রেপ্তার হওয়া অভিবাসী ও আশ্রয়প্রার্থীদের তাদের অধিকার সম্পর্কে না জানিয়েই ইটালীয় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে৷

এছাড়া সীমান্তে স্থাপিত এই কার্যালয়টির অন্য পদক্ষেপ নিয়েও অধিকারকর্মীরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। 

সেটি হল, ইটালীয় ভূখন্ডে স্থাপিত প্রাঙ্গন থেকে অভিবাসীদের ইটালির বারডোনেচে থানায় নিয়ে যেতে কয়েক ঘন্টা সময় লাগতে পারে। অভিবাসীদের এই মধ্যবর্তী সময়ে আইনি কাঠামোর বাইরে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আটকে রাখা হয়। অনেক অভিবাসীকে সেখানে রাতও কাটাতে হয়েছে।

সিনেটর বলেন, “আমাদের কাছে এমনও লোক রয়েছে যাদের কোন প্রকার আইনী ব্যাখ্যা ও কাঠামো ছাড়াই ইটালীয় মাটিতে ফরাসি পুলিশ পরিচালিত একটি কার্যালয়ে ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত কাটাতে হয়েছে।”

অপর দিকে লর পোলা যোগ করেন, “আটক ব্যক্তির আটকের স্থায়িত্ব কাল কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘন্টা যাই হোক না কেন এটি নির্বিচারে আটক এবং ইউরোপীয় আইনের লঙ্ঘন।” 

অভিবাসন সংস্থাগুলো এই প্রক্রিয়ার উল্টো প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, এখন ফরাসি বর্ডার পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ও তাদের নজর এড়াতে অভিবাসীরা আরও বিপজ্জনক পথে তাদের ভাগ্য খোঁজার চেষ্টা করবে। তারা পাহাড়ের উঁচুতে গিয়ে আরও ঝুঁকি নেবে যা প্রাণহানির দিকে নিয়ে যেতে পারে।”

ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা

এই বিতর্কে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তা সংস্থা এএফপি’র জানায়, “এখানে কোনভাবেই আইনকে সংকুচিত করা হয়নি। প্রতিটি ধাপে আইনকে সম্মান করা হয়েছে। যাদেরকে আটক করা হয়েছে তাদের কাউকেই আইনি আধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়নি কারণ তারা যে অঞ্চল থেকে এসেছিল সেখানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।”

অপরদিকে আনাফে সংস্থার পরিচালক লর পোলা বলেন, “যে প্রাঙ্গনে কার্যালয়টি অবস্থিত সেটি একটি ব্যস্ত মহাসড়কের কাছে অবস্থিত। সে কারণে জিজ্ঞাসাবাদের পর অভিবাসীরা পুলিশের কাছে থাকতে বাধ্য হয়। কারণ গাড়ি ছাড়া নিজে নিজে কার্যালয় থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও যাওয়া খুবই বিপজ্জনক।”

মন্ত্রণালয়ের মতে, “২০১৫ সালের অভ্যন্তরীণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা অনুযায়ী এই কার্যালয়টি পুরোপুরি বৈধ। এই ভবনটিতে সীমান্ত পুলিশের একটি বিশেষ নিরাপত্তা কার্যালয় (বিসিএনজে) রয়েছে।”

সর্বশেষ ২০২১ সালের হিসেব অনুযায়ী ফ্রান্সে বিশেষ নিরাপত্তা চৌকিসহ প্রশাসনিক কার্যালয়ের সংখ্যা আট হাজার ৭২। ১৯৬৫ সালে জারি হওয়া একটি ডিক্রি এবং ‘বিসিএনজে’ সম্পর্কিত ফ্রান্স এবং ইটালির মধ্যে একটি যৌথ কনভেনশনের উপর ভিত্তি করে এসব প্রশাসনিক কার্যালয় বা নিরাপত্তা চৌকি তৈরি করা হয়েছিল। যৌথ কনভেনশনের শর্তে অনুযায়ী, সীমান্ত অঞ্চলে ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূখণ্ড’ হিসাবে নিরাপত্তা যাচাই করা বৈধ।

অর্থাৎ, সীমান্তের এই ইটালীয় অংশটিতে ‘ফরাসি আইন’ প্রযোজ্য হবে৷ যেমনটি সিনেটরের সফরের সময় ফরাসি সীমান্ত পুলিশের বিভাগীয় কমান্ডার স্টেফেন কুইভাল এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন।  

শেঙ্গেন জোনের মধ্যে পুনরায় সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আইন পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে আনাফেসহ বেশ কয়েকটি অভিবাসন সংস্থা ও এনজিও নিন্দা জানিয়েছে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোর্ট অফ জাস্টিস (সিজেইইউ) গত ২৬ এপ্রিল একটি পর্যবেক্ষণে এ জাতীয় ব্যবস্থার ভুল আইনি ব্যাখ্যার ব্যাপারেও স্মরণ করিয়ে দেয়। আদালতের পক্ষ থেকে জোর দিয়ে বলা হয়, শেঙ্গেন এলাকার সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করতে পারবে।


মূল প্রতিবেদন লেসলি কারেতেরো। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। 


এমএইউ/আরআর   


 

অন্যান্য প্রতিবেদন