ফ্রান্স-ইটালি সীমান্তের রোয়া উপত্যকা। ছবি: মেহেদি শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস
ফ্রান্স-ইটালি সীমান্তের রোয়া উপত্যকা। ছবি: মেহেদি শেবিল/ইনফোমাইগ্রেন্টস

মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী আহমেদ কাতিব চার মাস ধরে ইটালিতে আটকা পড়ে আছেন। বর্তমানে ফ্রান্সের সাথে থাকা দুর্গম সীমান্তবর্তী এলাকা ভেন্টিমিগলিয়ার একটি ক্ষেতে কাজ করছেন কাতিব। এই অভিবাসী ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, অন্য কোন বিকল্প না থাকায় একটি সেতুর নীচে রাত কাটান তিনি।

৩৩ বছর বয়সি আহমেদ কাতিব জীবনে ত্যাগ ও তিতিক্ষার পরীক্ষা দিতে দিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। প্রথমে তার নিজ দেশ মরক্কো ত্যাগ করেন। মরক্কোর বেনি মেল্লাল এলাকা থেকে আসা এই অভিবাসী একজন নাস্তিক। আদর্শিক কারণে কট্টর ইসলামপন্থিদের সাথে তার অনেক সমস্যা হয়ে বলে জানান কাতিব।

আহমেদ কাতিব জানান, মরক্কোতে ২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রেক্ষিতে সাড়া জাগানো ‘২০ ফেব্রুয়ারি’ নামক সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন তিনি। তিনি তার দেশের স্বতন্ত্র স্বাধীনতার পক্ষে একজন কর্মী হিসেবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন বলে দাবি করেন।

কিন্তু, মরক্কোতে আরব বসন্ত আন্দোলন তেমন বড় প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হবার পর নিজের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে সামাজিকভাবে ব্যাপক বৈষম্যের শিকার হন কাতিব। এরপর তিনি আলজেরিয়া হয়ে লিবিয়া চলে যান৷ সেখানে তাকে একটি ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে নৌকা দিয়ে ইটালিতে পৌঁছান।

পড়ুন>>ভূমধ্যসাগর: অভিবাসীদের মধ্যে শিশুসহ অনেকেই নির্যাতনের শিকার

আহমেদ কাতিবের লক্ষ্য ছিল জার্মানি। ধর্মীয় মৌলবাদ থেকে অনেক দূরে থাকা দেশটিতে তিনি অর্থনীতি পড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু, ইটালিতে আটকে থাকা এই ৩০ বছর বয়সি অভিবাসী আবারও তার পরিকল্পনা পরিবর্তন করেন এবং নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার সংকল্প করেন।

কাতিব বলেন, “আমি ফেব্রুয়ারিতে ইটালি-ফ্রান্স সীমান্তের ভেন্টিমিগ্লিয়ায় পৌঁছেছিলাম। আমি তখন দ্রুত জার্মানিতে চলে যেতে ফ্রান্সে প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমি ছয়বার চেষ্টা করে একবারও সফল হইনি।”

“প্রথমবার, ফেব্রুয়ারিতে আমি পায়ে হেঁটে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমাকে ফ্রান্সের মন্তো শহরে আটকে দেয়া হয়েছিল । দ্বিতীয়বার, আমি একটি ট্রেনে চড়ি। তৃতীয়বার, আমি ইটালি এবং ফ্রান্সের মধ্যে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ ‘পাস দ্যো লা মর’ পার হওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। তারপর আবার ট্রেনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করলাম। সর্বশেষ ষষ্ঠ এবং চূড়ান্ত প্রচেষ্টায় লাট্টে শহরের কাছে বনের মধ্য দিয়ে হাঁটার সময় ফরাসি কর্তৃপক্ষ আমাকে আটক করেছিল।” 

আরও পড়ুন>>ইটালির পুগলিয়ায় কৃষিশ্রমিক ঘাটতি

“যতবারই আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ততবারই ফরাসি কর্তৃপক্ষ আমার সাথে খারাপ আচরণ করেছে। পুলিশ আমাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে। কখনও কখনও আপনাকে অপমানজনক কথা শুনতে হবে। তারা আমাদের গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে তোলে। এছাড়া আমাদেরকে গ্রেপ্তারের পর এমন কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় যেখানে আমরা কম্বল ছাড়া ঘুমাই,” বলেন আহমেদ কাতিব। 

“পরবর্তীতে আমি সময় নিয়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ইটালিতে আশ্রয় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাকে এটাই করতে হবে, যদিও এটা আম্মার পছন্দের বিষয় নয়।”

নতুন কেন্দ্র খোলার সংবাদ জানেন না অভিবাসীরা

তিনি বলেন, ‘‘আমি ভেন্টিমিগলিয়ার “প্রোগেটো২০ কে” নামক অভিবাসন সংস্থাকে ধন্যবাদ জানাই, সংস্থাটি এই অঞ্চলে থাকা অভিবাসীদের অভিবাসীদের কাপড়, প্রয়োজনীয় ওষুধ এমনকি গোসলের সুযোগ দেয়। 

সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে আমার মত আটকে পড়া অভিবাসীরা ভেন্টিমিগলিয়ায় সেতুর নীচে বাস করে। 

সেখানে সুদান, মিশর, টিউনিশিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো, মৌরিতানিয়া, চাদ ও মালি থেকে আসা অভিবাসীরা একে অপরকে সাহায্য করেন। নতুন আসা অভিবাসীদের সবাই কম্বল, খাদ্যসহ বিভিন্ন জিনিস দিয়ে সাহায্য করে। আমিও এটা করি। 

পড়ুন>>ইটালির তুসকানিতে কৃষি শ্রমিকদের শোষণ

রাতের বেলা ঘুমানোর জন্য আমি শহর থেকে বের হওয়ার সময় একটি নদীর কাছে অবস্থিত সেতুর স্তম্ভে একটি গর্ত খুঁজে পেয়েছি। এটি একটি মহাসড়কের পাশে। এটাই এখন আমার স্থান। 

কোন প্রকার বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই প্রায় দুই বছর পর ভেন্টিমিগ্লিয়া কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের জন্য দুটি কাঠামো খোলার ঘোষণা দিয়েছে। যার মধ্যে একটি শনাক্তকরণ কেন্দ্র এবং একটি অস্থায়ী অভ্যর্থনা কাঠামো গ্রীষ্মের আগেই চালু করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।’’ 

তবে আহমদ কাতিব জানান তিনিসহ সেখানে থাকা অভিবাসীরা এ তথ্য জানেন না। 

“আমার ওজন কমছে”

“এক মাসের জন্য আমি সান রেমো অঞ্চলের কৃষিক্ষেতে একটি কালো কাজ (ইউরোপে কাজের অনুমতি ছাড়া ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কাজ করাকে কালো কাজ বলে) পেয়েছি। এটা ভেন্টিমিগ্লিয়া থেকে বেশি দূরে নয়। আমি প্রতিদিন ট্রেনে সেখানে যাই। আমি ইটালীয় মালিকদের হয়ে মাঠে কাজ করি।  আমরা সব সময় স্থান পরিবর্তন করি। সেখানে শুধুমাত্র অনিয়মিত অভিবাসীরা কাজ করে। এই মুহূর্তে আমি এক টুকরো জমিতে কাজ করছি যেখানে একটি পরিত্যক্ত বাড়িও আছে। যারা আমাদের বেতন দেন তারা সেই অর্থ দিনের বেলা খাবারের বিরতির সময় বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখেন, যাতে আমরা কাজ শেষ হওয়ার আগে খুঁজে না পাই,” বলেন কাতিব। 

তিনি বলেন, “আমি দৈনিক ১০ ঘন্টার কাজের জন্য তিন হাজার টাকা উপার্জন করি। আমার অনেক কষ্ট হয়। এখানে নিজের জায়গা ধরে রাখতে আপনাকে কঠোর পরিশ্রমী হতে হবে।”

আরও পড়ুন>>১৮ বছরের জেলের ঝুঁকি থেকে বাওবাব প্রধানের নিষ্কৃতি

“আমার ত্বকে ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে এবং মাসের পর মাস ধরে আমার ওজন কমছে। আমার ওজন ৫০ কেজি। ১.৭৪ মিটার উচ্চতার একজন ব্যক্তির জন্য এটা খুবই কম। কাজ এবং সার্বিক পরিস্থিতির কারণে গত তিন মাসে আমি ১২ কেজি ওজন হারিয়েছি,” যোগ করেন আহমেদ কাতিব৷ 


মূল প্রতিবেদন শার্লত ওবেরতি। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। 


এমএইউ/এআই


 

অন্যান্য প্রতিবেদন