রেসিডেন্স পারমিট বা ‘তিথ দ্যো সিজ্যুর’ এর আবেদন ও নবায়ন অনলাইনে জমা দিতে প্রয়োজনীয় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসীরা। ছবি: ডিআর
রেসিডেন্স পারমিট বা ‘তিথ দ্যো সিজ্যুর’ এর আবেদন ও নবায়ন অনলাইনে জমা দিতে প্রয়োজনীয় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে ভোগান্তিতে পড়েছেন ফ্রান্সে বসবাসরত অভিবাসীরা। ছবি: ডিআর

ফ্রান্সে বিদেশিদের জন্য নির্ধারিত রেসিডেন্স পারমিট বা তিথ দ্যো সিজ্যুর-এর আবেদন ও নবায়ন অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে জমা দিতে হবে উল্লেখ করে একটি ডিক্রি জারি করেছিল ফরাসি সরকার। জারিকৃত ডিক্রিটি বাতিল করে অভিবাসন সংস্থাগুলোর পক্ষে রায় দিয়েছে ফরাসি বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ শাখা ‘কনসেই দেতা’ বা কাউন্সিল অফ স্টেট।

২০২১ সালের ২৪ মার্চ ও ২৭ এপ্রিল সরকারের জারি করা এক ডিক্রিতে বলা হয়, ফ্রান্সে অবস্থানরত বিদেশিদের রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন ও নবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল প্রকার অ্যাপয়েন্টমেন্ট অনলাইনে নিতে হবে।  

কিন্তু এমন ডিক্রিকে অসম ও অগ্রহণযোগ্য দাবি করে ‘কনসেই দেতা’ বা কাউন্সিল অফ স্টেটে মামলা দায়ের করেছিল লা সিমাদ, হিউম্যান রাইটস লীগ ও এডভোকেট উইদাউট বর্ডারস (এসএএফ)সহ বেশ কয়েকটি অভিবাসন ও অধিকার সংস্থা। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর অবশেষে আলোর মুখ দেখল সংগঠনগুলোর এই চেষ্টা। 

৩ জুন শুক্রবার দেয়া এক রায়ে ডিক্রিটি বাতিল করেছে ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কনসেই দেতা বা কাউন্সিল অফ স্টেট। আদালত সরকারকে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্টের পাশাপাশি অন্য একটি 'বিকল্প সমাধান' খুঁজে বের করার নির্দেশ দিয়েছে।


এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রেফেকচুরগুলোতে অভিবাসীরা যেন সরাসরি গিয়ে সেবা নিতে পারে সেটি নিশ্চিত করতে বলেছে কাউন্সিল অফ স্টেট বা কনসেই দেতা। 

২০২১ সালের ১ মে থেকে কার্যকর হওয়া ডিক্রিটির ফলে অসংখ্য অভিবাসী বিভিন্ন জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন বলে সংস্থাগুলোর কাছে অভিযোগ জানিয়েছে। 

নতুন অনলাইন টেলিসার্ভিস ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষ তাদের রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন অথবা নবায়ন করতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে। 

পড়ুন>>ফরাসি আশ্রয় আদালতের সুরক্ষা প্রাপ্তিতে পিছিয়ে বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীরা

অনেক অভিবাসী এসব জটিল প্রশাসনিক কাজের অনলাইন সেবা এখনও রপ্ত করতে পারেননি। আবার অনেকের কাছে সার্বক্ষনিক ইন্টারনেট সেবা পাওয়ার মতো সুবিধা নেই। কারণ সরকারি সব দপ্তরের কার্যক্রম স্মার্টফোন দিয়ে করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে কম্পিউটার ছাড়া ডিজিটাল সেবাগুলোর সুবিধা ভোগ করাও সম্ভব হয় না।

অভিবাসন সংস্থাগুলো জানিয়েছে, একটি সাক্ষাৎকারের তারিখ পেতে অনেক অভিবাসীকে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। কারণ প্রেফেকচুরসহ বিভিন্ন দপ্তরগুলোতে শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট সময়ে সংশ্লিষ্ট সাক্ষাৎকারের স্লটগুলো উন্মুক্ত করা হয়। এসব নিয়ম অনুসরণ করেও অনেকে তাদের কাঙ্খিত সাক্ষাৎকার পেতে ব্যর্থ হন। 

আরও পড়ুন>>কান চলচ্চিত্র উৎসবে অভিবাসী শিশুদের নিয়ে ছবি

মূলত এমন হাজারো অভিযোগের বিষয় আমলে নিয়েছে আদালত। কাউন্সিল অফ স্টেট বা কনসেই দেতা’র মতে, “এই ধরনের বাধ্যবাধকতা কেবল তখনই আরোপ করা যাবে যখন ব্যবহারকারীদের সরাকারি দপ্তরগুলোকে স্বাভাবিক প্রবেশাধিকারের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হবে। নতুন অনলাইন কার্যক্রম অনেক বিদেশীর জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করেছে এবং অনেককে বিভিন্ন বেআইনি উপায় গ্রহণ করতে বাধ্য করছে। অনেক ভুক্তভোগী এপয়েন্টমেন্ট স্লট না পেয়ে তাদের কাজ করার অধিকারও হারাচ্ছেন।”

“অধিকার লঙ্ঘন”

অভিবাসন সংস্থাগুলো ছাড়া ফরাসি সিনেটও রেসিডেন্স পারমিটের অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়াটির সমালোচনা করেছে। 

অভিবাসন সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনে ফরাসি সংসদের উচ্চকক্ষ হিসেবে পরিচিত সিনেট এই নিয়মের নানান অসুবিধা নিয়ে সতর্ক করেছে। 

ফরাসি সিনেটে আইন কমিশনের সভাপতি ফ্রঁসোয়া-নোয়েল বুফে ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “অনলাইনে অপর্যাপ্ত সংখ্যক এপয়েন্টমেন্ট স্লট না পাওয়ার বিষয়টি দ্রুত সমাধান ও লোকজনকে ভালোভাবে প্রশাসনিক কাজে সহায়তা করতে আমাদের প্রেফেকচুরগুলোতে আরও বেশি লোকবল প্রয়োজন। অন্যথায় এসব জটিলতা অভিবাসীদের অনিয়মিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।”

আরও পড়ুন>>আশ্রয়প্রার্থীদের অভ্যর্থনার মান বাড়াতে ফ্রান্সের নতুন সংসদকে খোলা চিঠি

এছাড়া কালোবাজারিরা অনলাইনে এপয়েন্টমেন্ট প্রক্রিয়াটিকে কেন্দ্র করে একটি সমান্তরাল বাজার তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে ফরাসি সিনেট। সিনেটের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “ইতিমধ্যে অনেক অসাধু ব্যক্তি ২ হাজার টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিদেশিদের কাছে সম্পূর্ন অবৈধ উপায়ে এপয়েন্টমেন্ট স্লট বিক্রি করা শুরু করেছে।”

পড়ুন>>ডিজিটালাইজড হল ফরাসি আশ্রয়বিষয়ক দপ্তর অফপ্রা’র কিছু সেবা

করোনা মহামারির সময়ে একই সমস্যার প্রেক্ষিতে ২০২০ সালের শেষ দিকেও অধিকার সংগঠনগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের প্রতি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহনের আহ্বান জানিয়েছিল। তবে এই প্রতিক্রিয়ায় বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। সর্বশেষ আদালত রায় দিয়ে ডিক্রিটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিল। 


এমএইউ/আরআর



 

অন্যান্য প্রতিবেদন