ফ্রান্সের লিওঁ শহরে চালু হওয়া  নতুন আটক কেন্দ্র। ছবি: স্থানীয় প্রেফেকচুর/টুইটার
ফ্রান্সের লিওঁ শহরে চালু হওয়া নতুন আটক কেন্দ্র। ছবি: স্থানীয় প্রেফেকচুর/টুইটার

ফ্রান্সে অনিয়মিত অবস্থায় আটক ও বহিষ্কারের ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসীদের ফরাসি প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে বা (সিআরএ) তে রাখা হয়। স্বাধীন ফরাসি প্রশাসনিক দপ্তর (সিজিএলপিএল) এর সমীক্ষা বলছে, এসব কেন্দ্রগুলোতে আটকের সময়কাল দীর্ঘায়িত করা, সীমিত চিকিৎসা সুবিধা এবং জরাজীর্ণ কাঠামো-সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে৷ বিস্তারিত পড়ুন প্রতিবেদনে।

২ জুন বৃহস্পতিবার, ফরাসি প্রশাসনিক আটক কেন্দ্র বা সিআরএ গুলোর সার্বিক অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মুক্ত নন এমন ব্যক্তিদের দেখাভাল এবং স্থানান্তরের শর্তগুলি পর্যবেক্ষণ করার জন্য নির্ধারিত স্বাধীন ফরাসি প্রশাসনিক দপ্তর (সিজিএলপিএল)। ইউরোপ জুড়ে এসব কেন্দ্র অভিবাসীদের কাছে ডিটেনশন সেন্টার হিসাবে পরিচিত।

ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে অবস্থিত ছয়টি আটক কেন্দ্র, বিমানবন্দরগুলোতে অবস্থিত তিনটি অস্থায়ী অপেক্ষা কেন্দ্র এবং উত্তর ফ্রান্সের ‘তুর্কুয়া’ শহরে অবস্থিত স্থানীয় আটক কেন্দ্র বেশ কয়েকবার সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন সিজিএলপিএল এর প্রধান পরিদর্শক ডমিনিক সিমোনো।


এই সাবেক সাংবাদিক ও আইনজ্ঞ ২০২০ সাল থেকে ফরাসি রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁর সুপারিশে সিজিএলপিএল’র প্রধান পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন। 

পড়ুন>>ফ্রান্সে মানবপাচারে সহায়তার দায়ে ২৪ ইরাকি নাগরিককে সাজা

প্রতিবেদনের প্রথমে বলা হয়েছে, আটককেন্দ্রগুলোতে থাকা অনিয়মিত অভিবাসীদের আটকের মেয়াদ নিয়মিত বাড়ানো হয়েছে। করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘদিন সীমান্ত বন্ধ থাকায় অভিবাসীদের নিজের দেশে ডিপোর্ট বা বহিষ্কার প্রক্রিয়া বন্ধ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে অভিবাসীদের গন্তব্য দেশের দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে ভ্রমণ পাস ইস্যু করতে অনীহা থাকার বহিষ্কারের সম্ভাবনা গিয়েছিল। কিন্তু এটি সত্ত্বেও ফরাসি কর্তৃপক্ষ আটকের মেয়াদ বাড়িয়ে অনিয়মিত অভিবাসীদের আরও দীর্ঘ সময় এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কয়েক মাস পর্যন্ত সিআরএ-গুলোতে বন্দি থাকতে বাধ্য করেছিল। 

এসব আটককেন্দ্র মূলত অনিয়মিত অভিবাসীদের নিজের দেশে ফেরানোর (বহিষ্কার) আগে অল্প সময়ের আটকে রাখার জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। বড়জোর এক মাস থাকার উপযোগী এসব ডিটেনশন সেন্টার৷ এগুলি দীর্ঘ সময় থাকার জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। 

আটক কেন্দ্রগুলোর শোচনীয় অবস্থার নিন্দা জানিয়ে সিজিএলপিএল জানায়, “নানা অসুবিধা সত্ত্বেও বন্দিদের একঘেঁয়েমি, নিষ্ক্রিয়তা এবং উদ্বেগের সমস্যা দূর করতে ভবনগুলোর সংস্কার কিংবা নিয়মের পরিবর্তন কোনোটিই করা হয়নি।” 

আরও পড়ুন>>শরণার্থী ইস্যুতে ফ্রান্সের অভ্যর্থনা নীতি বৈষম্যমূলক : অ্যামনেস্টি

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রত্যাশা, চাপ ও কঠিন আটক অবস্থার কারণে আটক অভিবাসীদের মনোবল কমে গিয়েছে৷ অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন অনেকেই৷

চলতি বছরের মার্চে পরিকাঠামো এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে নিন্দা জানিয়ে বিক্ষোভ জানায় লিওঁ শহরের নতুন সিআরএ-তে আটক অনিয়মিত অভিবাসীরা। 

অভিবাসন ও অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে এই নতুন কেন্দ্রটি বসবাসের অনুপযুক্ত একটি জায়গায় তৈরি করা হয়েছে। 

অ্যান্টি সিআরএ নামক প্ল্যাটফর্মের সদস্য মিমো ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, “এটি বিমানবন্দরের এত কাছে অবস্থিত যে বন্দিরা সারাদিন বিমানের শব্দ শুনতে পায়। এটির ফলে অনেক অভিবাসী বধির হয়ে যান।”

মানা হয়নি সামাজিক দূরত্বের নিয়ম

করোনা মহামারির সময় চলমান লকডাউন ও স্বাস্থ্য বিধিমালার কিছুই সিআরএগুলোতে মানা হয় নি বলে সিজিএলপিএলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। 

প্রতিবেদনে দুঃখ প্রকাশ করে বলা হয়, আটক কেন্দ্রগুলোতে কোনো ধরনের সামাজিক দূরত্ব বাস্তবায়নের জন্য কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। ২০২১ সালে ডিসেম্বর মাসে কোভিড ১৯-এর ঢেউ পঞ্চমবার ফ্রান্সে আঘাত হানলেও সিআরএগুলোতে থাকা লোকেদের গাদাগাদি করে এক ঘরে রাখা হয়েছিল৷ সাধারণ ঘরগুলোতে খাবার খেতে দেয়া হয়েছিল। অভিবাসীদের কোনো স্যানিটাইজারও দেয়া হয়নি।

পড়ুন>>অভিবাসী শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েদের পড়াশোনার সুযোগ

সিজিএলপিএল উল্লেখ করেছে, করোনা আক্রান্ত হওয়ার উল্লেখযোগ্য ঝুঁকির সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও আটকে রাখা ব্যক্তিদের টিকা দেওয়া হয়নি। 

ডিটেনশন সেন্টারগুলোর এসব ত্রুটি নিয়মিতভাবে সিজিপিএল এবং অভিবাসন সংস্থাগুলো কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে থাকে। কিন্তু কর্তৃপক্ষগুলি এসব প্রতিবেদন খুব বেশি আমলে নেয় না। 

সিজিএলপিএল দুঃখ প্রকাশ করে জানায়, ‘আবাসনের শর্ত’ এবং ‘খাদ্যের অপ্রতুলতা’ বিষয়ক সুপারিশগুলি সাধারণত কোন প্রকার ফলোআপ করা হয় না। 

আরও পড়ুন>>ফ্রান্সে ট্রেনের ধাক্কায় বেঁচে যাওয়া অভিবাসীকে বসবাসের অনুমতি

প্রতি বছরের মতো এখনও ‘অনুপযুক্ত’ এবং নিম্নমানের রক্ষণাবেক্ষণ করা উঠোন অভিবাসীদের আটক কেন্দ্রে৷ জরাজীর্ণ আসবাবগুলোও বদলানো হয়নি। সিআরএ-র জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে বলে মতামত দেয়া হয়।”

সিজিএলপিএলের মতে, “আটকে রাখা ব্যক্তিদের জন্য অন্তত একটি মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রাঙ্গন সংস্কার জরুরি৷ তার পরিবর্তে বর্ধিত নিরাপত্তার জন্য আবাসন খাতের বিনিয়োগগুলিকে প্রধান্য দেয়া হচ্ছে। এটি কোনো ন্যায্য সিদ্ধান্ত নয়।”




এমএইউ/আরকেসি






 

অন্যান্য প্রতিবেদন