ঢাকায় সৌদি এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ের সামনে টিকিটের অপেক্ষায় দুই বাংলাদেশি | ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
ঢাকায় সৌদি এয়ারলাইন্সের কার্যালয়ের সামনে টিকিটের অপেক্ষায় দুই বাংলাদেশি | ছবি: সাজ্জাদ হোসেন

কোভিড-১৯ মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক অভিবাসন অনেকটাই থমকে গেছে৷ অভিবাসী কর্মীরাও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে৷ এক্ষেত্রে বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের অবস্থা অবশ্য বিস্ময়করভাবে ভিন্ন৷

আবুল বাশার ১৪ বছর ধরে সৌদি আরবে রয়েছেন৷ দেশে চাকুরি পেতে ব্যর্থ হওয়ার পর অভিবাসী কর্মী হিসেবে তেলসমৃদ্ধ মরুদেশ সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি৷ প্রথমে রিয়াদে কাজ করেছেন, তারপর জেদ্দায়৷ সর্বশেষ তিনি যখন আল কাশিম প্রদেশের একটি পানি শোধনাগারে প্লাম্বার হিসেবে কাজ করছিলেন, তখনই করোনা মহামারি গোটা বিশ্বে আঘাত হানে৷

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মী আবুল বাশার
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি কর্মী আবুল বাশার

এখন অবধি বাশার হচ্ছেন ২৬ কোটি অভিবাসীর একজন যারা নিজ দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন৷ প্রতিমাসে তিনি যা আয় করেন তার নব্বই শতাংশই দেশে তার চার সদস্যের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেন৷ সৌদি আরবে তার মাসিক আয় পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো৷  

অর্ধেকের বেশি অভিবাসী কর্মী দক্ষিণ, পূর্ব এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের নাগরিক৷ পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণ ইউরোপের মোট শ্রমশক্তির ২০ শতাংশ তাদের দখলে রয়েছে৷ আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে সংখ্যাটি ৪১ শতাংশ৷  

ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর শ্রমবাজার এসব অভিবাসীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ৷ আর তারা দেশে যে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন সেগুলোর মূল উৎসও এসব অঞ্চল৷

অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করছে রেমিটেন্স

দেশে টাকা পাঠিয়ে অভিবাসী কর্মীরা শুধু নিজের পরিবারেরই উপকার করছেন না৷ তারা যে দেশ থেকে এসেছেন সেদেশের অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায়ও বড় ভূমিকা রাখছে অভিবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স৷ জিম্বাবোয়ে, জর্জিয়া, নিকারাগুয়া এবং সেনেগালের মতো দেশগুলোর জাতীয় অর্থনীতির ১০ শতাংশের বেশি আসছে রেমিটেন্স থেকে৷ সালভাদোর, গাম্বিয়া, জামাইকা, এবং নেপালের ক্ষেত্রে এই হার ২০ শতাংশের বেশি৷   

উত্তর এবং সাব-সাহারান আফ্রিকা, দক্ষিণ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, এবং মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন দেশও রেমিটেন্স থেকে লাভবান হচ্ছে৷

তবে করোনো মহামারি শুরুর পর এক্ষেত্রে বেশ গোলমেলে পরিস্থিতি তৈরি হয়৷ বিভিন্ন দেশে লকডাউন এবং ঢালাওভাবে চাকুরিচ্যুতির ঘটনা রেমিটেন্সের প্রবাহে হুমকি সৃষ্টি করে৷ ২০২০ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক ধারনা করেছিল, মহামারির প্রথম বছরে অভিবাসী কর্মীরা নিজ নিজ দেশে ১২ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা পাঠাবেন, যা আগেব বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ কম৷

তবে দেখা গেছে, একটি খাড়া পতনের পর রেমিটেন্সের প্রবাহ আবারও বেড়ে গেছে৷ ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং তুরস্কের মতো দেশগুলোর মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটলেও মান বিবেচনায় ডলার এবং ইউরো অর্থনীতি থেকে রেমিটেন্স পাঠানো বেড়েছে৷ অভিবাসীদের অনেকে চাকুরি হারানোর পর তাদের সঞ্চিত অর্থ পরিবারের জন্য দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন৷  

‘‘প্রতিবছর আমি পাঁচ লাখ টাকার মতো দেশে পাঠাই,’’ বলেন আবুল বাশার৷ 

কিন্তু মহামারির সময় সেই পরিস্থিতি বদলে যায়৷ গত দুই বছরে তিনি দেশে আরো বেশি টাকা পাঠানোর চেষ্টা করেছেন৷ 

‘‘গতবছর আমার বাবা করোনায় আক্রান্ত হন৷ তখন তার চিকিৎসার জন্য একলাখ টাকা খরচ হয়েছে৷ ফলে সেবছর আমি সঞ্চয়েরক্ষেত্রে আপস করে ছয়লাখ টাকা দেশে পাঠিয়েছি যাতে আমার পরিবার চিকিৎসার বাড়তি খরচও বহন করতে পারে,’’ বলেন তিনি৷ 

স্থানীয়দের চেয়ে অভিবাসীরা চাকুরি হারিয়েছেন বেশি

ফলে মহামারির কারণে অভিবাসী কর্মীদের উপর চাপ যেমন বেড়েছে তেমনি চাকুরিও হারিয়েছেন অনেকে৷ বিশেষ করে মৌসুমি অভিবাসী কর্মীরা, যারা খুব একটা আইনি সুরক্ষার মধ্যে ছিলেন না, তাদের চাকুরি দ্রুত গেছে৷ অনেক দেশের স্থানীয় মানুষদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়েছে৷ কিন্তু অভিবাসী কর্মীদের কাজ গেছে বেশি৷ হাঙ্গেরি, স্পেন এবং ইটালির মতো দেশগুলোতে মৌসুমি অভিবাসী কর্মীদের চাকুরি যাওয়ার হার স্থানীয়দের তুলনায় ৫০% বেশি ছিল৷ 

জাতিসংঘের শ্রম বিষয়ক সংস্থা আইএলও-র বিশ্লেষণ হচ্ছে, যেহেতু অভিবাসী কর্মীরা অন্যের ইচ্ছাধীন এবং কম মজুরীর খাতে কাজ বেশি করেন, তাই তাদেরক্ষেত্রে চাকুরি যাওয়ার হার বেশি ছিল৷ কেননা মহামারির কারণে এসব খাত, বিশেষ করে রেস্তরাঁ, পর্যটন, সংস্কৃতি, ছোট দোকান এবং নির্মাণ খাত, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি৷

এক্ষেত্রে বেকারত্বের সঠিক সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে কেননা পরিসংখ্যানে সেসব অভিবাসীদের বিবেচনা করা হয়নি যারা চাকুরি হারানোর পর দেশে ফিরে গেছেন৷ 

করোনা মহামারি শুরুর পর শুধু ভারতেই ফিরে গেছেন ৬০ লাখের বেশি মানুষ যারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী কর্মী হিসেবে কাজ করতেন৷ থাইল্যান্ড, নেপাল, মালয়েশিয়া এবং শ্রীলঙ্কাতেও ফিরে গেছেন সেসব দেশের লাখ লাখ নাগরিক৷ দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার পরিস্থিতিও একই ছিল বলে জানিয়েছে আইএলও৷

আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে কর্মরত অভিবাসী কর্মীরা আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷   

অভিবাসী যেসব কর্মীরা নিজ নিজ দেশে ফেরত গেছেন তারা আবার শীঘ্রই বিভিন্ন দেশে ফিরতে পারবেন কিনা তা নিশ্চিত নয়৷ মহামারি শুরুর পর বিশ্বের প্রায় সবদেশই নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করে ভ্রমণের উপর বিধিনিষেধ জারি করেছিল৷ সেসময় অভিবাসন নীতিতেও পরিবর্তন আনে অনেক দেশ৷ করোনা পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়ার পর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আবার তুলে নেয়া হচ্ছে৷

সৌদি আরবের নতুন নীতি

উপসাগরীয় অঞ্চলে তথাকথিত ‘সৌদিকরণ’ নীতি অভিবাসী কর্মীদের জন্য এক জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে৷ ২০১৮ সাল থেকে সৌদি সরকার এক নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে৷ আর তাহচ্ছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সৌদি কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে৷ যেসব প্রতিষ্ঠানে সৌদি কর্মীর সংখ্যা কম এবং ‘অনাবশ্যক’ বিদেশি কর্মী বেশি, সেগুলোর বিরুদ্ধে নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে৷   

মহামারির সময় বিদেশি কর্মীরা নানা ধরনের বৈষম্যেরও শিকার হয়েছেন যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে৷ করোনা সংক্রমণের হার অভিবাসীরা বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে৷ 

তবে সৌদি আরবে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীরা বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে অল্প সময়ের জন্যই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন৷ বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেব অনুযায়ী, ২০১৯ এবং ২০২০ সালের মধ্যে কাজের জন্য বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা দুই-তৃতীয়াংশের বেশি কমে গিয়েছিল৷ কিন্তু ২০২১ সাল থেকে সেই সংখ্যা আবারো বাড়তে শুরু করেছে৷

টানা তিন বছর অভিবাসী কর্মীরা বাংলাদেশে রেকর্ড হারে রেমিটেন্স পাঠিয়েছেন৷ আনুষ্ঠানিক হিসেবে ২০২১ সালে সংখ্যাটি দুই লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা৷ 

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেকর্ড রেমিটেন্স পাঠানোর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে৷ প্রথমত, অভিবাসী কর্মীরা মহামারির আগে আনুষ্ঠানিক পন্থার চেয়ে অনানুষ্ঠানিক পন্থায় বেশি টাকা দেশে পাঠাতেন৷

‘‘যেহেতু মহামারির সময় সেই অনানুষ্ঠানিক পন্থায় পুরোপুরি বিঘ্ন ঘটেছিল, তাই তারা আনুষ্ঠানিক পথে টাকা পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন,’’ বলেন হোসেন৷  

দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে, চাকুরি হারানোর ভয়ে অনেক অভিবাসী তাদের সঞ্চিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন৷ 

‘‘কেউ কেউ হয়ত চাকুরি হারানোর পর জমা করা সব অর্থ নিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন যা দেশে রেমিটেন্সের প্রবাহ গত দুই বছরে বাড়াতে সহায়তা করেছে,’’ বলেন এই অর্থনীতিবিদ৷ 

প্রতিবেদন: মিশেল পেনকে, ফয়সাল আহমেদ

এআই/এডিকে

 

অন্যান্য প্রতিবেদন