“ভি দ্যো প্যারিস" নামক অভিবাসন সংস্থাটি অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনিক ঠিকানা বা "ডমিসিল" সেবা প্রদানের জন্য বাংলাদেশি সহ অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যে বেশ পরিচিত লাভ করেছিল। ছবি: পিক্সাবে
“ভি দ্যো প্যারিস" নামক অভিবাসন সংস্থাটি অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনিক ঠিকানা বা "ডমিসিল" সেবা প্রদানের জন্য বাংলাদেশি সহ অনিয়মিত অভিবাসীদের মধ্যে বেশ পরিচিত লাভ করেছিল। ছবি: পিক্সাবে

প্যারিসের আদালত “ভি দ্যো প্যারিস" নামক একটি অভিবাসন সংস্থার এক প্রাক্তন সভাপতিকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। অভিযুক্ত রোনাল্ড ডি. অনথিভুক্ত অভিবাসীদের শোষণ ও মানব পাচারের সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

১০ জুন শুক্রবার প্যারিসে অভিবাসীদের প্রশাসনিক ঠিকানা বা ‘ডমিসিল‘ সেবা নিয়ে কাজ করা সংস্থা ‘ভি দ্যো প্যারিস’ এর সাবেক পরিচালককে পরোক্ষভাবে মানব পাচার জড়িত থাকা ও অনিয়মিত অভিবাসীদের শোষণ করার দায়ে দুই বছরের সাজা দিয়েছে প্যারিসের আদালত। তবে সব ধরনের নিয়ম মেনে এক বছরের কারাদণ্ড পালন করলে তার দ্বিতীয় বছরের দণ্ডাদেশ মওকুফের বিধান রাখা হয়েছে৷ 

আদালতের রায়ে বলা জয়, অভিযুক্ত রোনাল্ড ডি. তার কার্যক্রমের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে মানব পাচারের সাথে যুক্ত ছিলেন৷ তাছাড়া তিনি ফ্রান্সে থাকা অনিয়মিত অভিবাসীদের শোষণও করছিলেন৷ হাইতির বংশোদ্ভূত ৫৪ বছর বয়সি ফরাসি নাগরিক রোনাল্ড ডি. অনিয়মিত অভিবাসীদের ব্যবহার করে রাতারাতি ধনী হয়ে উঠেছিলেন।

গোপন নেটওয়ার্ক 

ফরাসি দৈনিক লিবেরাশিঁও-এর অনুসন্ধানে জানা গেছে, অভিযুক্ত রোনাল্ড ডি. একটি গোপন নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিলেন যার সাহায্যে অভিবাসীদের বৈধতা প্রাপ্তির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও বিভিন্ন বেআইনি কাজ সংগঠিত হতো।

আদালত জানায়, অভিযুক্ত সংস্থাটি অনিয়মিত অভিবাসীদের পারিশ্রমিকের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিযুক্ত করেছিল। সেখানে কর্মরত ও সদস্য হওয়া অভিবাসীদের বৈধতা পেতে সাহায্য করা হবে বলে নিশ্চয়তা প্রদান করা হতো। 

আরও পড়ুন>>কান চলচ্চিত্র উৎসবে অভিবাসী শিশুদের নিয়ে ছবি

আদালত আরও জানায়, “সংস্থাটিতে কাজ করা অভিবাসীদের কাজের পরিবেশ এবং নিযুক্ত কর্মীদের প্রতি সাবেক পরিচালক রোনাল্ড ডি.’র ব্যবহার ছিল অপমানজনক। এটি অভিবাসীদের মর্যাদাকে সম্মান করে না।”

শুনানিতে সাক্ষ্য দেয়া ব্যক্তিরা জানান, “ভি দ্যো প্যারিস" নামক সংস্থায় একটি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সদস্যপদের বিপরীতে অভিবাসীরা একটি প্রশাকনিক ডাক ঠিকানা বা ‘ডমিসিল’ পরিষেবা এবং বেশ কিছু ঘন্টা অবৈতনিক কাজ করার সুযোগ পেত। যার সাহায্যে ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রশাসনিকভাবে নিয়মিতকরণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।”

রোনাল্ড ডি. যে সিস্টেমটি তৈরি করেছিলেন সেটি হচ্ছে, সংস্থাটিতে অনিয়মিত অভিবাসীদের নির্দিষ্ট অংকের আর্থিক ঋণ এবং সংস্থার ডমিসিল সেবা ব্যবহারের সুযোগ দিত। পরবর্তীতে অভিবাসীদের ঋণ শোধ করার জন্য সংস্থাটিতে তথাকথিত স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করতে বাধ্য করা হতো।

যৌন নিপীড়নের অভিযোগ

২০১১ সালের নভেম্বরে চালু হওয়া এই সংস্থাটির কর্মকাণ্ডে ভুক্তভোগী পুরুষ এবং নারীরা তাদের সাথে ঘটা নির্যাতনের কথা চলতি বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত আদালতের শুনানিতে বর্ণনা করেছেন। অনিয়মিত অভিবাসীরা জানান, প্রতি ঘন্টায় মাত্র ১ থেকে ৩ ইউরোর বিনিময়ে তাদেরক কাজ করানো হতো। এছাড়া অনেক নারী কর্মী যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেছেন।

আদালতে সাক্ষ্যদাতাদের মধ্যে, “ভি দ্যো প্যারিস" সংস্থার সাবেক এই সভাপতি সেখানে এক প্রকার সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করেছিলেন।

আরও পড়ুন>>‘গত তিন মাসে আমার ১২ কেজি ওজন কমেছে”

রোনাল্ড ডি., যিনি নিজেকে "মিস্টার প্রেসিডেন্ট", "বস" এমনকি “মহামান্য” হিসেবে অভিহিত করতে নির্দেশ দিতেন। তিনি অভিবাসীদের নিয়মিত অপমান করতেন এবং প্রতিবাদ করলে বহিষ্কারের হুমকি দিতেন বলে অভিযোগ করেছে সংস্থাটিতে কাজ করা অভিবাসীরা।

মাগরেব অঞ্চল থেকে আসা একজন নারী ভুক্তভোগী দৈনিক লিবেরাশিঁওকে বলেন, “তিনি আমাকে সংস্থায় কাজ করা অবস্থায় একঘরে করে রেখেছিলেন। তিনি আমাকে অপমান করে বলেছিলেন, তিনি পুলিশের সাথে কাজ করছেন এবং আমাকে ফ্রান্স থেকে বহিষ্কার করে আমার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিবেন।”

এক নারী অভিবাসীর উদ্ধৃতি দিয়ে লিবেরাশিঁও জনায়, “একদিন আমি সন্ধ্যায় রিসেপশনে একা ছিলাম। তিনি আমার সামনে ঝুঁকে পড়ে এবং স্পষ্টভাবে আমার মুখে চুমু খাওয়ার চেষ্টা করেছিলন।”

দ্বিতীয় আরেকজন নারী জানান, “আমার সম্মতি ছাড়াই তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে জোর করে চুম্বন করেন।”

অভিযুক্তরা আপিল করবে না

ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি এবং অধিকার সংগঠন (সিসিইএম)-সহ মোট প্রায় ৫০ জন নাগরিক আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন। ফরাসি সরকারের শ্রম পরিদর্শক এবং অনুমতি ছাড়া কাজ ঠেকাতে নির্ধারিত ফরাসি দপ্তর (ওসিএলটিআই) যৌথভাবে ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে তদন্ত শুরু করেছিল। তদন্তে সর্বমোট ১৫৯ জন ভুক্তভোগী তথ্য প্রদান করে। 

এ মামলায় “ভি দ্যো প্যারিস" সংস্থার দুই সাবেক কর্মকর্তাকেও মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে একজনকে পরোক্ষভাবে মানব পাচারে জড়িত থাকার দায়ে আট মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দ্বিতীয় জনকে অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। 

পড়ুন>>অনলাইনে রেসিডেন্স পারমিট আবেদন ছাড়াও বিকল্প ব্যবস্থার নির্দেশ ফরাসি আদালতের

ভুক্তভোগীদের একজনের আইনজীবী মাক্সিম সেসিউ এটিকে “একটি সত্যিকারের বিজয়” আখ্যা দিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বিচার কার্যের শুরু থেকেই এই কর্মকান্ডকে “মানব পাচারের’’ স্বীকৃতির গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছিলেন যেন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা তাদের মর্যাদা “পুনরুদ্ধার” করতে পারে।

রোনাল্ড ডি’র আইনজীবী গুইলাম তেবোউলের মতে, “অভিযুক্ত শুনানির সময় সমস্ত কিছু অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন। তিনি রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন না।”

এই আইনজীবী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত যা আমাদের কাছে ন্যায়সঙ্গত ও সঠিক বলে মনে হয়।”


এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন