ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স
ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) অধিকাংশ দেশ একটি সেচ্ছা সহায়তা কর্মসূচি নিতে সম্মত হয়েছে৷ তবে, সমালোচকেরা বলছেন, ইউক্রেনের শরণার্থীদের মতো সমান চোখে অন্য শরণার্থীদের দেখছে না ইইউ৷

লুক্সেমবুর্গে যখন ইইউর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা শুক্রবার সকালে বহু বছর ধরে বিতর্কিত অভিবাসন এবং আশ্রয় নীতি নিয়ে বৈঠক শুরু করেন, তখন তার ফলাফল কী হবে তা নিয়ে নানা রকম ধারনা তৈরি হয়েছিল৷  

ফ্রান্সের জিরাল্ড ডারমেরনা ‘ছোটখাট এক বিপ্লব’ আশা করেছিলেন৷ তবে জার্মানির ন্যান্সি ফেইসার কিছুটা নিশ্চিন্ত ছিলেন, কেননা তার বিশ্বাস ছিল যে তিনি এবং তার সহকর্মীরা ইইউর সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়টি নিয়ে সামনে আগাতে পারবেন৷  

দিনের শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা সত্যিই কোনো বিপ্লব করেননি, তবে তারা নতুন এক পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন৷

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেইসার | ছবি: গ্যাটি ইমেজেস
জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেইসার | ছবি: গ্যাটি ইমেজেস

অধিকাংশ ইইউ রাষ্ট্র ইচ্ছাভিত্তিক এক সহযোগিতা কর্মসূচির পক্ষে সমর্থন দিয়েছে৷ ফেইসার জানিয়েছেন যে বারোটির মতো রাষ্ট্র ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারকৃত শরণার্থী এবং অভিবাসীদের আশ্রয় দিতে সম্মত হয়েছেন৷ এসব দেশের মধ্যে জার্মানি, ফ্রান্স, লুক্সেমবুর্গ, বুলগেরিয়া এবং রোমানিয়া রয়েছে৷  

যেসব দেশ আর শরণার্থীদের নিতে চায় না, তারা যারা নিচ্ছে তাদেরকে আর্থিক সহায়তা করার ব্যাপারে সম্মত হয়েছে৷ 

আশ্রয়প্রার্থী নিতে আগ্রহী দেশগুলোতে কতজনকে পাঠানো হবে সেটা এখনো চূড়ান্ত হয়নি৷ ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্সির শেষ মাসে ফ্রান্স সংখ্যাটি প্রতিবছর ১০ হাজার করতে প্রস্তাব করেছিল৷ আপাতত এক বছরের জন্য এসব দেশ শরণার্থী নিতে রাজি হয়েছে, তবে এই মেয়াদকাল ভবিষ্যতে বাড়ানো হতে পারে৷  

অস্ট্রিয়া হচ্ছে সেসব দেশগুলোর একটি যেগুলো নতুন এই প্রস্তাবে সায় দেয়নি৷ দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরহার্ড কার্নার এই বিষয়ে বলেন, ‘‘এটা মানবপাচারকারীদের একটি ভুল বার্তা দেবে৷ আর তাহচ্ছে, ইউরোপ মানুষ নিতে উন্মুক্ত নীতি নিয়েছে৷’’

অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরহার্ড কার্নার | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স
অস্ট্রিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গেরহার্ড কার্নার | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স

হাঙ্গেরি এবং পোল্যান্ড সম্ভবত এই রাজনৈতিক চুক্তির চূড়ান্ত নথিতে স্বাক্ষর করবে না৷ দেশ দুটো দীর্ঘদিন ধরেই আশ্রয় এবং অভিবাসন নীতিতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং অভিবাসীদের ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাধ্যতামূলক বন্টনেরক্ষেত্রেও আপত্তি জানিয়ে আসছে৷  

আশ্রয় নীতিতে নতুন উদ্যোগ 

যদিও এই নতুন উদ্যোগ ঐচ্ছিক এবং এটি মানার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, অনেকেই এটিকে জোটটির অভিবাসন এবং আশ্রয় নীতির দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের প্রাথমিক ধাপ মনে করছেন৷ 

বেশ কয়েকবছর ধরেই এক্ষেত্রে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছেনা জোটভুক্ত দেশগুলো৷ জোটের দক্ষিণের দেশগুলোর, বিশেষ করে ইটালি, স্পেন, মাল্টা, গ্রিস এবং সাইপ্রাসের ভৌগোলিক কারণে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী নিতে হচ্ছে৷ আরো জোটের নীতি অনুযায়ী, একজন আশ্রয়প্রার্থী ইইউভুক্ত প্রথম যে দেশটিতে পৌঁছাবেন সেখানেই তার আবেদন যাচাইবাছাই করা হবে৷ 

২০১৫ সালে দশলাখের বেশি অভিবাসী ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইইউতে প্রবেশ করে৷ সেসময় এই মানুষদের বিভিন্ন দেশে সরিয়ে নেয়া নিয়ে জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ শুরু হয়েছিল৷ 

২০২০ সালে ইউরোপীয় কমিশন এই সংকট নিরসনে নতুন এক প্রস্তাব পেশ করে৷ কিন্তু তারপর বিষয়টি আর তেমন একটা আগায়নি৷ 

ইউক্রেনীয়দের জন্য শরণার্থী নীতি ইইউর অসঙ্গতি দেখিয়ে দিচ্ছে 

গত ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া ইউক্রেনের উপর হামলা চালানোর পর দেশটি থেকে আসা শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো রকম গড়িমসি করেনি ইইউভুক্ত দেশগুলো৷ 

মার্চ মাসে প্রথমবারের মতো একটি নির্দেশনা দেয় ইইউ যা ইউক্রেনীয়দের জোটভুক্ত যেকোনো দেশে প্রাথমিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে৷ জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন এবং তাদের মধ্যে ৩২ লাখের বেশি সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নিজেদের নথিভুক্ত করেছেন৷ 

রাশিয়া হামলা শুরু করার পর লাখ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছে | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স
রাশিয়া হামলা শুরু করার পর লাখ লাখ মানুষ ইউক্রেন ছেড়ে পালিয়েছে | ছবি: পিকচার অ্যালায়েন্স

ইউক্রেনীয়দের প্রতি ইউরোপের এই সহানুভূতির অনেক প্রশংসা হলেও এর মাধ্যমে এটাও পরিষ্কার হয়েছে যে শরণার্থী ইস্যুতে জোটটির নীতিতে অসঙ্গতি রয়েছে৷ লুক্সেমবুর্গের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন এসেলবর্ন এই বিষয়ে বলেন, ‘‘আমরা যদি লাখ লাখ ইউক্রেনীয়দের নিতে আগ্রহী হই, তাহলে আমাদের একই পরিস্থিতেত থাকা অন্য ধর্মের এবং ভাষার হাজার হাজার শরণার্থীদেরও স্বাগত জানানো উচিত৷’’

‘‘এটা করতে না পারলে ইইউ তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে,’’ বলেন তিনি৷ 

বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ শেয়ার এবং শরণার্থী স্ক্রিনিংয়ে সম্মতি

সর্বশেষ আলোচনায় অভিবাসন এবং আশ্রয় ইস্যুতে নিরাপত্তা এবং সুরক্ষার বিষয়টি সবচেয়ে প্রাধান্য পেয়েছে৷ ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো জোটটির বহিঃসীমান্তে দেয়াল এবং বেড়া দেয়ার হার বাড়িয়েছে৷ বেলারুশ সীমান্তে পোল্যান্ডের দেয়া বেড়া এরকম এক উদাহরণ৷ 

ইইউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরো দুটি প্রস্তাবে সমর্থন জানিয়েছেন৷ এগুলো হচ্ছে, ইইউ সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য একটি স্ক্রিনিং সিস্টেম চালু করা হবে৷ এবং বায়োমেট্রিক ডাটাবেস ইউরোডেক এর ব্যবহার আরো বাড়ানো হবে৷ 

প্রতিবেদন: মারিনা স্ট্রাউস

এআই/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন