পর্তুগালে খামারে কাজ করেন অনেক অভিবাসী কর্মী | ছবি: ডয়চে ভেলে
পর্তুগালে খামারে কাজ করেন অনেক অভিবাসী কর্মী | ছবি: ডয়চে ভেলে

পর্তুগালে সস্তা শ্রমের চাহিদা বাড়ায় অভিবাসী কর্মীদের কাজের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে৷ তবে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শ্রমশোষণ ও মানবপাচারের আশঙ্কাও বেড়ে গেছে৷ বিষয়টির দিকে নজর দিতে তাই পর্তুগালের কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন একদল বিশেষজ্ঞ৷

আলমেইরিম এবং আলেনতেজোর মতো এলাকাগুলোতে অভিবাসী কর্মীরা বসন্ত এবং গ্রীষ্মে সারাদিন ক্ষেত থেকে ফল ও শাকসবজি তোলেন৷ ইউরোপের এই অংশে খাদ্যশস্য উৎপাদনের চাহিদা ক্রমশ বেড়েই চলেছে৷ আর এখানকার কৃষকদের পক্ষে অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগ দেয়া লাভজনক, কেননা তাদেরকে স্থানীয় পর্তুগীজদের চেয়ে কম বেতন দেয়া যায়৷ কিন্তু এই সুযোগে সেখানে মানবপাচারের শিকার অভিবাসীদের শোষণের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে৷  

এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছে পর্তুগাল৷ তবে, কাউন্সিল ফর ইউরোপের মানবপাচার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ দল জিআরইটিএ মনে করছে, দেশটির আরো অনেক কিছু করার আছে, বিশেষ করে আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষেত্রে৷  

মানবপাচারের ভুক্তভোগী বলতে তাদেরকে বোঝায় যাদেরকে শোষণের লক্ষ্যে প্রলুব্ধ বা নিয়োগ করা হয়৷ শোষণ বলতে যৌন শোষণ, জোর করে শ্রমিক হিসেবে কাজ করানো, ভিক্ষা করানো, দাস বানানো বা একজন ব্যক্তির ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার শরীরের কোনো অঙ্গ বের করে বিক্রি করা বোঝায়৷   

চলতি সপ্তাহে জিআরইটিএ-র প্রকাশিত এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এক হাজারের বেশি মানুষ পর্তুগালে শোষণের শিকার হয়েছেন৷ ভুক্তভোগীদের অধিকাংশই ভারত থেকে এসেছেন এবং তাদের প্রায় সবাই শ্রমশোষণের শিকার হয়েছেন৷ প্রতিবেদনে শুধুমাত্র সেসব ভুক্তভোগীর কথা জানানো হয়েছে যারা এই পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে এসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানাতে পেরেছেন৷ ফলে শোষণের শিকার প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতে পারে৷  

জিআরইটিএ-র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পর্তুগালে আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে মানবপাচারের শিকার মানুষের সংখ্যা শূণ্য যা অস্বাভাবিক বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ দলটি৷ 

‘‘আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে মানবপাচারের শিকাররা আছে কিনা তা শনাক্তে ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করে জিআরইটিএ,’’ বলেন বিশেষজ্ঞ দলটির সদস্য ডানিয়েলা রানাল্লি৷ 

পর্তুগালকে মানবপাচারের শিকার মানুষদের ‘গন্তব্য’ বলে মনে করা হয়৷ অনেক অভিবাসী নিজ দেশ থেকে পাচারের শিকার হয়ে ইউরোপের দেশটিতে পৌঁছান, কেউ কেউ আবার পর্তুগাল আসার পথে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েন বলে জানান রানাল্লি৷ পর্তুগালে পৌঁছানোর পরও পাচারকারীদের শোষণের শিকার হন কোনো কোনো অভিবাসী৷   

অর্জুন যোশী নামে ভারতের কেরালার এক বাসিন্দা ২০১৯ সালে পর্যটক ভিসায় পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে পৌঁছান৷ কিন্তু বিমানবন্দরেই এক কথিত ‘এমপ্লয়মেন্ট এজেন্ট’ তাকে দেশটিতে কাজ করার বৈধ অনুমতিপত্র যোগাড় করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার কাছ থেকে ১,৩৫০ ইউরো হাতিয়ে নেন৷ 

কিন্তু সেই বৈধ কাগজ আর পাননি যোশি৷ বরং বেশ কয়েকমাস তাকে মাসিক দুশো ইউরো বেতনে ক্ষেত থেকে ফল তুলতে হয়েছে৷ একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে নিজের পকেট থেকে আটশো ইউরো খরচ করে চিকিৎসা নিতে হয়েছে৷ 

পর্তুগালে গাড়ি ঠিক করার একটি দোকান চালু করেছেন যোশী | ছবি: ডয়চে ভেলে
পর্তুগালে গাড়ি ঠিক করার একটি দোকান চালু করেছেন যোশী | ছবি: ডয়চে ভেলে

আরো উদ্যোগ প্রয়োজন 

রানাল্লি জানান, মানবপাচারের শিকারদের শনাক্তে এবং পাচারকারীদের বিচারের মুখোমুখি করারক্ষেত্রে কাঠামোগত দিক থেকে অনেকটা এগিয়েছে পর্তুগাল৷ তবে প্রকৃত ভুক্তভোগী শনাক্তে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে এবং অনেকে পাচারকারী আইনে ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন৷ 

এর একটি কারণ হিসেবে রানাল্লি জানান যে মানবপাচারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু হলেও অনেকক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত তা অবৈধ অভিবাসন, পতিতাবৃত্তি বা শ্রমশোষণের মামলায় পরিনত হয়৷ 

‘‘মানবপাচারকারীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হলেও তা শেষ পর্যন্ত অন্য অপরাধে পরিনত হয়,’’ বলেন তিনি৷ 

পর্তুগালের ভাষা না জানায় শোষণের শিকার অনেক অভিবাসী তাদের অধিকার সম্পর্কে জানতে পারে না যা আইনি সুবিধা পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা বলেও মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ৷ 

তদন্ত প্রক্রিয়ায় ধীরগতি

পর্তুগালে মূলত দুইভাবে একজন মানুষ নিজেকে মানবপাচারের শিকার হিসেবে তুলে ধরতে পারেন৷ প্রথমত, তিনি সরাসরি পুলিশের কাছে গিয়ে অভিযোগ করতে পারেন৷ পুলিশ তখন তদন্ত শুরু করবে৷ দ্বিতীয়ত, একজন ভুক্তভোগী বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন যারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানাবেন৷

একজন ব্যক্তি ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর আশ্রয় পাবেন, যেখানে তিনি যতদিন দরকার থাকতে পারবেন৷ আশ্রয়কেন্দ্রে ভুক্তভোগীরা মানসিক চিকিৎসার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের জন্য সহায়তা পান৷  

কিন্তু আইনি সহায়তার প্রশ্ন যখন আসে তখন বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে৷ অনিবন্ধিত অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার পথ দেশটির প্রচলিত নিয়মে বেশ সীমিত৷ 

তবে, পর্তুগালের আইনে এটাও আছে যে কোনো একজন ব্যক্তি যদি পাচারের শিকার হিসেবে শনাক্ত হন, তাহলে সঙ্গে সেই তিনি দেশটিতে থাকার অধিকার পেয়ে যান৷

সমস্যা হচ্ছে, কখনো কখনো একজন ভুক্তভোগীর আবেদন যাচাইবাছাইয়ে দুই বছরের মতো সময় লেগে যায়৷ রানাল্লি এই বিষয়ে বলেন, ‘‘বসবাসের আবেদন পেতে অনেক সময় লেগে যায় এবং খুব সীমিত সংখ্যক মানুষকে এই অনুমতি দেয়া হয়৷’’

‘‘আর একারণে একজন ভুক্তভোগী একটি অনিশ্চিত সময়ের মুখোমুখি হন যা তার অসহায়ত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়,’’ বলেন তিনি৷ 

এই পরিস্থিতিতে খামারে কাজ করা ভারতীয় অনেক কর্মী দীর্ঘদিন ধরে পর্তুগালে বসবাসের অনুমতি পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন৷ তারা ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় মানবপাচারকারীদের টাকা দিতে যে ঋণ নিয়েছিলেন সেটা ফেরত দেয়ার জন্য বছরের পর বছর ধরে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন৷

এআই/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন