গত দশ বছরে শরণার্থী সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ছবি: এএফপি
গত দশ বছরে শরণার্থী সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। ছবি: এএফপি

সংঘাত, যুদ্ধ, নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো ঘটনায় স্থানচ্যুত মানুুষের সংখ্যা টানা দশম বছরের মতো বেড়ে আবারও রেকর্ড গড়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর সদ্য প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর বিশ্বে জোরপূর্বক স্থানচ্যুত মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি স্পর্শ করেছে। তবে তার আগে গত বছরই এমন ভাগ্যাহত মানুষের সংখ্যা আগের রেকর্ড ভেঙেছে। ইউএনএইচসিআর এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিজ ঠিকানা ছাড়তে বাধ্য হওয়া মানুষের সংখ্যা ২০২১ সালের শেষে এসে দাঁড়িয়েছে আট কোটি ৯৩ লাখে, যা আগের বছরে চেয়ে আট শতাংশ এবং দশ বছর আগের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মানুষদের দুই কোটি ৭১ লাখ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেয়া শরণার্থী এবং পাঁচ কোটি ৩২ লাখ অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষ (ঘর ছেড়ে পালালেও যারা নিজ দেশে অবস্থান করছেন)। পরিসংখ্যানে বিদেশে আশ্রয় নেয়া ৪৪ লাখ ভেনেজুয়েলার মানুষ ও ৪৬ লাখ আশ্রয়প্রার্থীও আছেন।

২০২১ সালে আগস্টে তালেবানের আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের প্রেক্ষিতে স্থানচ্যুত মানুষের সংখ্যায় বড় উল্লম্ফন হয়েছে। এছাড়াও ইথিওপিয়ার ট্রিগ্রে অঞ্চলের সংঘাতে অন্তত ২৫ লাখ মানুষ দেশটির ভিতরে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। এর মধ্যে ১৫ লাখ পরবর্তীতে তাদের বাসস্থানে ফিরে আসতে সক্ষম হন। আফ্রিকার বুরকিনা ফাসো ও শাদেও বহু মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে সামরিক অভ্যুত্থানে মিয়ানমারে গৃহহীন হয়েছেন অনেকে।

বাংলাদেশ সপ্তম

বিশ্বে মোট শরণার্থীর ১৬ শতাংশই আছেন এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে। ২০২১ সালে এই অঞ্চলে শরণার্থীর সংখ্যা এক লাখ ৩৮ হাজার ৪০০ জন বেড়ে মোট ৪২ লাখে দাঁড়িয়েছে। 

এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি শরণার্থী আশ্রয়দাতা পাকিস্তান। গত বছর এক লাখ আট হাজার আফগান দেশটিতে পালিয়ে আসেন। সব মিলিয়ে দেশটিতে শরণার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখে।

পাকিস্তানের পরই এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি শরণার্থীর আশ্রয়দাতা বাংলাদেশ।  মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে বিভিন্ন সময় বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। ইউএনএইচসিআর এর হিসাবে, নয় লাখ ১৮ হাজার ৯০০ শরণাথী রয়েছেন বাংলাদেশে।

সীমান্ত পেরিয়ে আসা শরণার্থীদের আশ্রয়ের হিসাবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। তার উপরে রয়েছে সুদান, জার্মানি, পাকিস্তান, উগান্ডা, কলম্বিয়া। আর সবার উপরে রয়েছে তুরস্ক। দেশটিতে ৩৭ লাখ ৫৯ হাজার ৮০০ জন শরণার্থীর বসবাস।

শরণার্থী সংকটের সমাধান

ইউএনএইচসিআর বলছে, নিরাপদ ও সম্মানের সঙ্গে নিজ দেশে ফিরতে চান বেশিরভাগ শরণার্থী। সেটি সম্ভব না হলে বাকিদের আশ্রয় নেয়া দেশে বা তৃতীয় কোনো দেশে আত্তীকরণ করা যায়। কিন্তু স্থানচ্যুত মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলায় শরণার্থী সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হচ্ছে না।

গত বছর চার লাখ ৩০ হাজার শরণার্থী নিজ দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছেন, যা তার আগের বছরের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি। কিন্তু মোট হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা নগণ্য বলে উল্লেখ করেছে ইউএনএইচসিআর। সংস্থাটির বলছে, ২০২১ সালে ১৪ লাখ শিশু-কিশোর, নির্যাতন-সংঘাত থেকে বেঁচে ফেরা এবং বয়স্ক শরণার্থীর পুনর্বাসন প্রয়োজন ছিল। এর মধ্যে মাত্র ৫৭ হাজার ৫০০ জনের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা গেছে, যা প্রয়োজনের মাত্র চার শতাংশ। 

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেন, “এই মানবিক ট্র্যাজেডি মোকাবিলা, সংঘাত দূর করা এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান খোঁজায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এক হতে হবে নয়ত এই মর্মান্তিক এই প্রবণতা চলতেই থাকবে।”

এফএস/এআই

 

অন্যান্য প্রতিবেদন