বৃহত্তর প্যারিসের ভাল দ্যো মার্ন ডিপার্টমেন্টের ৭ নং সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক অভিবাসী ও হোটেলে পরিচ্ছন্নতা শ্রমিক হিসেবে কাজ করা রাশেল কেকে। ছবি: রয়টার্স
বৃহত্তর প্যারিসের ভাল দ্যো মার্ন ডিপার্টমেন্টের ৭ নং সংসদীয় আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক অভিবাসী ও হোটেলে পরিচ্ছন্নতা শ্রমিক হিসেবে কাজ করা রাশেল কেকে। ছবি: রয়টার্স

প্যারিসের ১৭ নং ডিসট্রিক্টের ইবিস হোটেলের কর্মরত শ্রমিকদের সাথে কর্তৃপক্ষের অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে ২২ মাস টানা আন্দোলন করে আলোচনায় এসেছিলেন হোটেলটির পরিচ্ছন্নতা কর্মী রাশেল কেকে। ১৯ জুন রোববার অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে সম্মিলিত বাম জোটের ব্যানারে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সাবেক এই অভিবাসী। ফরাসি সংসদে অভিবাসী ও পিছিয়ে পড়া পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন রাশেল কেকে।

১৯ জুন রোববার অনুষ্ঠিত ফরাসি সংসদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত দফায় যে কয়টি আসনের উপর গণমাধ্যমসহ সকলের চোখ ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল বৃহত্তর প্যারিসের ভাল-দ্যো-মার্ন ডিপার্টমেন্টের ৭ নং সংসদীয় আসন। 

এই আসন থেকে প্রার্থী হন ৪৮ বছর বয়সি সাবেক অভিবাসী রাশেল কেকে। যিনি ২২ মাস টানা শ্রমিক ধর্মঘট করে গণমাধ্যমে বারবার শিরোনাম হয়েছিলেন। 

একই সংসদীয় আসন থেকে রাশেল কেকের বিপরীতে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে ছিলেন এমানুয়েল ম্যাক্রঁ’র রাজনৈতিক দল থেকে মনোনীত সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী রোক্সানা মারাসিনানু। এই দুই প্রার্থীর মধ্যে শুরু থেকেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। 

আরও পড়ুন>>অনলাইনে রেসিডেন্স পারমিট আবেদন ছাড়াও বিকল্প ব্যবস্থার নির্দেশ ফরাসি আদালতের

পাঁচ সন্তানের জননী ও শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মী রাশেল কেকে এই নির্বাচনে বাম ও পরিবেশবাদী দলগুলোর জোট ‘নুপ্স’ থেকে মনোনয়ন লাভ করে শুরুতেই চমক দেখান।

সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে রোববার রাত ৮টায় ঘোষিত ফলে দেখা যায় বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়ায় হয় দুই প্রার্থীর মধ্যে। ৫০ দশমিক ৩১ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াই করে আসা রাশেল কেকে।


ফরাসি গণমাধ্যমগুলো তার এই জয়কে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দিয়েছে। কারণ ফরাসি রাজনীতিতে সরাসরি একজন শ্রমিক থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার অতীত রেকর্ড একেবারেই অপ্রতুল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বড় বড় আমলা, আইনজীবি, ছাত্র-নেতা অথবা প্রথাগত বড় শ্রমিক ইউনিয়নের কর্তা-ব্যক্তিরাই রাজনীতির সামনের সারিতে উঠে আসেন।

পরিচয়

১৯৭৪ সালে আইভরিকোস্টের রাজধানী আবিদজানের উত্তরের শহর আবোবাতে জন্মগ্রহণ করেন রাশেল কেকে। তার বাবা পেশায় একজন বাস চালক এবং মা একজন স্থানীয় কাপড় বিক্রেতা ছিলেন। 

১৯৯৯ সালে আইভরিকোস্টে সেনা অভ্যুত্থানের পর ২০০০ সালে ২৬ বছর বয়সে ভাগ্য বদলের লক্ষ্যে অভিবাসী হয়ে ফরাসি ভূখন্ডে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাশেল কেকে। ২০১৫ সালে ফরাসি নাগরিকত্ব লাভ করেন তিনি। 

ফ্রান্সে এসে তিনি তার পুর্বের পেশা নারীদের পার্লারে কাজ শুরু করেন। ২০০৩ সালে পেশা পরিবর্তন করে কাজ নেন ফরাসি চেইন হোটেল ইবিসে পরিচ্ছন্নতা করমী বা রুম সার্ভিসে। ফ্রান্সে আবাসিক হোটেল সেক্টরে রুম সার্ভিস বা পরিচ্ছন্নতার কাজ করা নারী অভিবাসীদের বেশিভাগই আফ্রিকা ও মাগরেব অঞ্চলের দেশগুলোর থেকে আসা অথবা বংশোদ্ভূত নাগরিক। 

আরও পড়ুন>>প্যারিসে মানব পাচারের দায়ে অভিবাসন সংস্থার প্রাক্তন সভাপতির কারাদণ্ড

২০১৯ সালের ১৭ জুলাই থেকে হোটেলের ১৭ জন নারী শ্রমিক এবং দুজন উর্দ্ধতন কর্মকর্তা টানা ধর্মঘট ও আন্দোলন শুরু করেন। প্রায় ২২ মাস থরে চলা এই আন্দোলন ফ্রান্সের হোটেল সেক্টরের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ শ্রমিক আন্দোলনের খ্যাতি লাভ করে। ফরাসি শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি এর ব্যানারে পুরো আন্দোলন সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন রাশেল কেকে ও তার আরেক সহকর্মী সিলভিয়া কিমিসা এস্পের। 

আন্দোলনের চাপে ২০২১ সালের ২৫ মে সব দাবি মেনে নিয়ে শ্রমিকদের সাথে সমঝোতায় আসতে বাধ্য হয় হোটেল কর্তৃপক্ষ। 

পিছিয়ে পড়াদের কণ্ঠস্বর

রোববার সন্ধ্যায় বিজয় ঘোষণার পরে রাশেল কেকে গণমাধ্যমকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “আমাকে এই ভূখণ্ডে সাদরে গ্রহণ করার জন্য ফ্রান্সকে ধন্যবাদ। আমাকে অনেক কিছু শেখানোর জন্য ফ্রান্সকে ধন্যবাদ। আমাকে বিশ্বাস করার জন্য ফ্রান্সকে ধন্যবাদ।”

দীর্ঘ লড়াই লড়াই থেকে সাফল্য লাভ করা রাশেল কেকে সংসদ নির্বাচনের আগে জানিয়েছিলেন, তিনি অসহায় ও পিছিয়ে পড়া পেশার শ্রমিকদের কণ্ঠস্বর হবেন। যেসব শ্রমিক একদম ভোরে ঘুম থেকে উঠেন এবং প্রচন্ড শারীরিক শ্রম দেন কিন্তু বিনিময়ে শুধুই জোটে অবজ্ঞা ও অবহেলা সেসব লোকেদের জীবন মান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। 

সম্প্রতি ফরাসি টিভি চ্যানেল বিএফএম টিভি এক সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয় তিনি সংসদে প্রথম পরিচারিকা সাংসদ হিসেবে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন কি না। উত্তরে বেশ বিরক্ত প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, “এটি এমন নয়। আমার পেশা আমার গর্বের উৎস। কোন পেশাই ছোট নয়।” 

আমার গর্ব হল আমি একটি দীর্ঘ লড়াইয়ের সময় আমার সহকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখতে পেরেছিলাম। ধর্মঘটের সময যখন আমার সহকর্মীরা বারবার নিরুৎসাহিত হয়েছিল, যখন তারা আমার হাতের শক্ত হাতের মুঠি দেখতে পেয়েছিল। যখনই তারা দুর্বল হয়ে যেত আমি তাদের বলেতাম একে অপরের হাত ধরে রাখো, কখনও হাল ছেড় না। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে আমরা শেষ পর্যন্ত জয়ী হব এবং আমরা জয় হয়েছে। আজকের জয়ও ঠিক একই ঘটনা।

সংসদে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ফরাসি সংসদ পালে বুরবোঁতে কাজ করা নারী পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কাজের মান উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রাশেল কেকে। 

 


এমএইউ/আরআর


 

অন্যান্য প্রতিবেদন