সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ায় অবস্থিত পুরনারা শরণার্থী ক্যাম্পে সামনে বাংলাদেশি অবিবাসন-প্রত্যাশীদের সাথে কথা বলছেন ডয়চে ভেলের সাংবাদিক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ৷
সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ায় অবস্থিত পুরনারা শরণার্থী ক্যাম্পে সামনে বাংলাদেশি অবিবাসন-প্রত্যাশীদের সাথে কথা বলছেন ডয়চে ভেলের সাংবাদিক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ৷

সাইপ্রাসের রাজধানী নিকোসিয়ায় অবস্থিত পুরনারা শরণার্থী ক্যাম্পে বর্তমানে দুইশর অধিক বাংলাদেশি রয়েছেন। লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে, দালালদের কাছে প্রতারিত হয়ে এই দেশটিতে এসে এখন ঠাঁই মিলল শরণার্থী ক্যাম্পে।

বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার ফিরোজ মৃধা এক মাস ধরে সাইপ্রাসের নিকোসিয়ায় অবস্থিত পুরনারা শরণার্থী ক্যাম্পে আছেন। বাংলাদেশ থেকে আরব আমিরাত হয়ে সাইপ্রাসে এসেছেন তিনি। তাকে এখানে নিয়ে এসেছেন দালালরা। আর এই পর্যন্ত আসতে তার খরচ হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ টাকা।

তার দাবি, কয়েক লাখ টাকা খরচ করে যে উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি দেশ ছেড়েছেন, সাইপ্রাসে এসে দেখেন এর সবই মিথ্যা। তাকে বলা হয়েছিল, ওয়ার্কশপে কাজ দেওয়া হবে আর আয় হবে এক হাজার ইউরোর অর্থাৎ বাংলাদেশি টাকায় প্রায় এক লাখ টাকা। সেই সাথে প্রতি মাসে তিনশ ইউরো অর্থাৎ প্রায় ৩০ হাজার টাকা করে ভাতা পাবেন তিনি। আর এসব মিলিয়ে তার মাসিক আয় হবে এক লাখ ৩০ হাজার টাকার মতো।

কিন্তু এই টাকা আয় তো দূরের কথা, এখন তার ঠিক মতো মাথা গোঁজার ঠাঁই-ই মিলছে না।  

"দালালেরা বলেছে, এক হাজার ইউরো বেতন দিব। তিনশ ইউরো ভাতা দিব। এই কথা বইলা আমারে আইনা নর্থ সাইপ্রাসে ফালাইয়া দিছে। পরে যখন বর্ডার ক্রস করছি, দেখি আমার কোনো ভিসাই নাই।"

দালালেরা যা বলেছেন তার সাথে এখানকার পরিস্থিতির কোনো মিল নেই এমন প্রশ্ন দালারদেরকে করেছেন কি না জানতে চাইলে মৃধা বলেন, ''এরা যে খারাপ ব্যবহারগুলো করে, খারাপ ব্যবহার কইরা এরা কুল পায় না ওরারে জিগামু ক্যামনে, কোন সময় আবার, যে আমগুরে কেমনে আনলেন। আইনাই লাথ্থি মাইরা রুমে ঢুকায়, ট্যাকা দে। মাইর, গুতা শুরু কইরা দেয়। ট্যাকা দে। ট্যাকা না দিলে এইখানেই আটকাইয়া রাখে। আর ট্যাকা দিলে রাতে বর্ডার ক্রস করাইয়া দেয়। ওদেরকে জিগামো ক্যামনে। এরা এমন একটা মুড লইয়া থাকে, হিংস্র বাঘের মতো।"

তিনি জানান, সাইপ্রাস আসতে গিয়ে পথের মধ্যে বেশ কয়েকজন দালালকে টাকা দিতে হয়েছে তার।

নিজে এমন পরিস্থিতিতে পড়ে বাংলাদেশ থেকে যেন আর কেউ এভাবে না আসেন সেই পরামর্শ দেন তিনি।  


"হাতজোড় কইরা কমু, ৬-৭ লাখ টাকা দিয়া দ্যাশে অটোরিকশা চালান। আমগুর মতো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আইসেন না। বাংলাদেশে রোহিঙ্গারা ভালো, আমরা ভাল নাই।"

নিকোসিয়ার এই ক্যাম্পে যে বাংলাদেশিরা আছেন তাদের সবার গল্পই এরকম। নিকোসিয়া পর্যন্ত আসতে কারো খরচ হয়েছে ছয় লাখ কারো সাত লাখ। বাংলাদেশ থেকে ম্যধপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হয়ে তাদেরকে প্রথমে নিয়ে আসা হয় তুরস্ক অধ্যুষিত উত্তর সাইপ্রাসে। সেখান থেকে রাজধানীর বর্ডার পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ সাইপ্রাসে। বলা হয়, সেখানে চাকরি আছে, ভালো বেতন আছে।  

এমনকি বর্ডার পাড়ি দেওয়ার সময় তাদের পাসপোর্টটিও রেখে দেয় দালালেরা। এরপর সহায়সম্বলহীন হয়ে শুধুমাত্র পাসপোর্টের একটি ফটোকপি নিয়ে তারা এসে হাজির হন নিকোসিয়ায় আর আশ্রয় চান এই ক্যাম্পেটিতে।

পড়ুন: সাইপ্রাসে যেভাবে দালালদের হাতে প্রতারিত হন বাংলাদেশিরা

আর আশ্রয় পেলেই যে সব হযে গেল তা কিন্তু নয়। এখানে আশ্রয় দেওয়ার পর চলতে থাকে তাদের আশ্রয়-আবেদন যাচাই বাছাই প্রক্রিয়া। প্রক্রিয়া শেষে হয় এখানে কাজের সুযোগ দেওয়া হবে কিংবা আশ্রয়-আবেদন বাতিল করে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। বেশিরভাগ বাংলাদেশিদের বেলায়ই হয় দ্বিতীয়টি। অর্থাৎ আশ্রয়-আবেদন বাতিল। আর তখন ফিরতে হয় দেশে।

গাজীপুর জেলার টঙ্গি থেকে তিন মাস আগে এসেছেন জীবন আলম। অন্য সবার মতো তার গল্পটিও একই রকম। মধ্যপ্রাচ্য হয়ে তিনি সাইপ্রাসে এসে আপাতত এই ক্যাম্পটিতে আছেন। এখন পর্যন্ত খরচ করেছেন সাত লাখ টাকা। মাসখানেক আগে আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছেন তিনি।  

আবেদন গ্রহণ হবে কি না জানেন না। তবে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানালেন, বাংলাদেশিদের আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়।

পড়ুন: সাইপ্রাসে যেমন আছেন বাংলাদেশি নারীরা

তিনি জানান, আবেদন বাতিল করে দেওয়ার পর সাধারণত আইনজীবীর সহায়তায় এখানে থাকার মেয়াদ কয়েকমাস বাড়ানো যায়। এভাবে বেশির ভাগ আশ্রয়প্রার্থী আইনজীবীর সহায়তায় থাকার চেষ্টা করেন। নিজের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানালেন, "এখন আর দেশেও ফিরতে পারতেছি না। আবেদন বাতিল হয়ে গেলে এখানেই কোনো একটা ব্যবস্থা করতে হবে।"  

এদিকে ক্যাম্পেও তারা নানা ধরনের কষ্টের মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছেন। নিকোসিয়ার এই ক্যাম্পটিতে থাকার সুযোগ সুবিধা নিয়ে আশ্রয়প্রার্থীরা অনেক দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন। সুযোগসুবিধার দাবিতে কিছুদিন আগে বিক্ষোভ করেছেন তারা।

বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীরা জানান, এখানকার খাবারদাবার তারা খেতে পারেন না। নেই টয়লেটের ভাল ব্যবস্থা। টয়লেটের দরজা নেই, তাই রাতের আঁধারে খোলা মাঠে প্রাকৃতিক কাজ সারেন তারা। 

প্রায় দেড় মাস আগে এই ক্যাম্পটিতে আসা বাংলেদেশি আশ্রয়প্রার্থী এনামউদ্দীন জানান অন্য সবার মতো তার পাসপোর্টও দালালেরা রেখে দিয়েছে। 

তার দাবি, এখানে ক্যাম্পে কোনো ভাতা দেওয়া হয় না। আর তাই নিজের খরচেই চলতে হয় তাকে। "এইখানে চলতে মাসে দুইশ ইউরো লাগি যায়, কি করমু কষ্ট কইরা চলতেছি।" 

এই টাকা কোথা থেকে পান জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি দেশ থেকে টাকা আনান এবং কাজ না পাওয়ার আগ পর্যন্ত এভাবেই চলতে হবে তাকে।    

    

 

অন্যান্য প্রতিবেদন