সাইপ্রাসের নিকোসিয়ায় রয়েছে এক বিশেষ আদালত৷ এই প্রশাসনিক আদালত শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে৷
সাইপ্রাসের নিকোসিয়ায় রয়েছে এক বিশেষ আদালত৷ এই প্রশাসনিক আদালত শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে৷

সাইপ্রাসের নিকোসিয়ায় রয়েছে এক বিশেষ আদালত৷ সকাল থেকেই সেখানে জড়ো হয়েছিলেন আশ্রয়প্রার্থীরা৷ একাধিক বাংলাদেশিও ছিলেন সেখানে৷ বছরের পর বছর পর অপেক্ষা করেও কেউ প্রয়োজনীয় কাগজ পাননি৷ কেউ বা দেশের দেনা শোধের জন্য রয়ে গিয়েছেন৷ তাদের নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন৷

সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালত শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করে৷ এই আদালতে শরণার্থীদের আবেদন যাচাইবাছাই করা হয়৷ কারো ক্ষেত্রে আবেদন গ্রহণ হয়, কারো ক্ষেত্রে হয় না৷

সাড়ে সাত বছর ধরে সাইপ্রাসে রয়েছেন বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের জামাল৷ তিনি শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছিলেন৷ পরে শরণার্থী স্ট্যাটাস চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন আদালতে৷ তিনি বলেন, ‘‘এখানকার পুলিশ খুব সমস্যা করে৷ বলে দেশে পাঠিয়ে দেব৷ তাই ফাইল ঠিক করতে হবে৷ উকিল ঠিক করেছি৷ দুই বছর যাতায়াত করছি আদালতে৷

কোন যুক্তি দেখিয়ে শরণার্থী মর্যাদা

জামালের কথায়, ‘‘শরণার্থী স্ট্যাটাস পেতে উকিল লাগে৷ উকিলই সব ঠিক করে৷ নিজে কিছু করা যায় না৷ একবার আপিলের পর বাতিল হলে ছয় মাস, আট মাস, এক বছর পর ফের আপিল করা যায়৷ আমাদের দেশে রাজনৈতিক সমস্যা আছে এ কথা বলেছি৷ কিন্তু ওরা বলে রাজনৈতিক সমস্যা নেই৷ তিন-চার বার আমার আবেদন বাতিল হয়েছে৷’’

সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতে এক বাংলাদেশী আবেদনকারীর সঙ্গে কথা বলছেন ডয়চে ভেলের সাংবাদিক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ৷ ছবি আরাফাতুল ইসলাম৷
সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতে এক বাংলাদেশী আবেদনকারীর সঙ্গে কথা বলছেন ডয়চে ভেলের সাংবাদিক অনুপম দেব কানুনজ্ঞ৷ ছবি আরাফাতুল ইসলাম৷


করোনার প্রভাব

বাংলাদেশের নোয়াখালি থেকে এসেছিলেন মহম্মদ জাকির৷ তিন বছর সাইপ্রাসে রয়েছেন তিনি৷ প্রথমে নর্থ সাইপ্রাসে শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছিলেন, কিন্তু সেখানে ছিলেন মাত্র ১০ দিন৷ করোনা শুরু হতেই দালালের মাধ্যমে চলে এসেছেন এই প্রান্তে৷



জাকির বলেন, ‘‘করোনা শুরু হয়ে গিয়েছে৷ কিছু করতে না পেরে এসেছিলাম নিকোসিয়ায়৷ ১৭-১৮ মাস লকডাউন ছিল৷ পুনারা ক্যাম্পে ছিলাম৷ তারপর অ্যাসাইলাম (আশ্রয়-আবেদন) পেতে আবেদন করি৷ এক মাস পর পেপার দেয়া হয়েছিল৷ সেটা নিয়ে নতুন বাসায় উঠি৷ তারপর ওয়েলফেয়ার অফিসে জমা দিলাম৷ সেখানে পকেট মানি দেয়া হতো৷ তবে এখন অস্থায়ী চাকরি করছি৷’’

কোন যুক্তিতে শরণার্থী মর্যাদা চেয়েছেন জাকির?

তার কথায়, ‘‘ক্যাম্পে একমাস থাকার পর এক বছরের জন্য পেপার ছিল৷ এরপর বাতিল হয়ে যায়৷ এক বছর শেষ হয়ে গিয়েছে৷ এবার আর্থিক সমস্যা দেখিয়ে আবেদন করছি৷’’

সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতের সামনে আবদেনকারীদের ভিড়৷ ছবি:আরাফাতুল ইসলাম
সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতের সামনে আবদেনকারীদের ভিড়৷ ছবি:আরাফাতুল ইসলাম


কেন রাজনৈতিক কারণ নয়?

জাকির বলেন, ‘‘অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়েছি. যতটা জানি, দুই দেশের সরকার যোগাযোগ করেছে৷ বাংলাদেশ সরকার বলেছে রাজনৈতিক সমস্যা নেই৷ ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মানবতা আছে৷ বাংলাদেশ আমাদেরকে অগ্রিম পাঠিয়ে দিতে বলছে৷ কিন্তু এই সরকারের তো মানবতা আছে৷ তাই অপেক্ষা করছি৷’’

‘দেনা শোধ করতে হবে’ 

বাংলাদেশের চুয়াডাঙা জেলা থেকে আদালতে এসেছিলেন বছর পঞ্চাশের এমডি আজমল হুডা৷ তিনি বলেন, 

‘‘তুর্কি সাইপ্রাস থেকে দালালের মাধ্যমে সাইপ্রাসে এসেছি৷ দালাল মাহবুবের কাছে সব রয়ে গিয়েছে৷ টাইসি ভিসায় পাঠিয়েছিল৷ বড় ইট নামানোর কাজ করি রাস্তায়৷ ৪৫ হাজার টাকা বেতন দেবে বলে পাঠিয়েছিল৷ দিয়েছিল ১৮ হাজার টাকা৷ পাসপোর্ট-ভিসা কিছুই করেনি দালাল৷’’

বয়স বলে কাজ নেই  

তিনি বলেন, পঞ্চাশের উপরে আমার বয়স৷ দুই বছর এখানে থাকলাম৷ বয়স্ক দেখে কাজ দেয় না৷ এ পাশে ঝুঁকি নিয়ে এসেছি৷ নোটিফিকেশন নিতে এসেছি৷ আমার কাজ নেই৷ এই কাগজ দেখালে সরকার ২৬১ ইউরো দেয়৷ দেশে দেনাপাওনা আছে৷ টাকা শোধ করে ফেলতে পারলে দেশে যাব৷ অল্পবিস্তর রোজগার হয় কাজ পেলে৷ দেশে কখনো সখনো ১০-১৫ হাজার টাকা পাঠাই৷ দুই-তিন লাখ টাকা দেনা রয়েছে বাংলাদেশে৷ দেনা শোধ হলে দেশে চলে যাব৷’’

বাংলাদেশের চুয়াডাঙা জেলা থেকে আদালতে এসেছিলেন বছর পঞ্চাশের এমডি আজমল হুদা৷ ছবি:আরাফাতুল ইসলাম
বাংলাদেশের চুয়াডাঙা জেলা থেকে আদালতে এসেছিলেন বছর পঞ্চাশের এমডি আজমল হুদা৷ ছবি:আরাফাতুল ইসলাম

আইনজীবীর খরচ?

আগে টাকা দিতে না হলেও এখন টাকা দিতে হচ্ছে আইনজীবীকে, দাবি করেছেন আশ্রয়প্রার্থীরা৷

আইনজীবীকে ৩৫০ ইউরো অর্থাৎ প্রায় ৩৫ হাজার দিতে হয়েছে আজমুলকে৷ তার কথায়, ‘‘উকিল বলেছে ফাইল ওপেন করে দেবেন৷ অর্থনৈতিক কারণে অ্যাসাইলাম চেয়েছি৷ এদিকে কোনো কাগজ না থাকলে পুলিশ ধরবে৷ কাগজ থাকলে সমস্যা নেই৷ আমার ডায়াবেটিস আছে৷ তবে সরকার বিনামূল্যে তার চিকিৎসা করেছে৷ মেডিকেল কার্ডও দিয়েছে বিনামূল্যে৷’’

বাংলাদেশের ফরিদপুর থেকে শিক্ষার্থী ভিসায় এসেছিলেন রাজু৷ পাঁচ বছর তিনি এখানে রয়েছেন৷ প্রায় আড়াই হাজার ইউরো ফি দিতে হয়েছে কলেজে৷ তাই শরণার্থী মর্যাদার আশায় আবেদন জানাতে এসেছেন তিনি৷

তিনি বলেন, ‘‘কাজের অনুমতি পাব না, জানতাম না৷ এক ভাই সাহায্য করেছিল আসতে৷ তবে আসার পর কাজ করা যাবে না জানতে পেরেছি৷ ছাত্ররা কাজ করতে পারে না৷ ফাইল বন্ধ হয়ে গিয়েছে৷ নিশ্চিতকরণ করতে এসেছি৷ এখানে স্ট্যাম্পের পর তারপর সাদা কাগজে লিখে দেবে৷’’

সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতের সামনে আশ্রয়প্রার্থীরা ভোর থেকে অপেক্ষা করেন৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম৷
সাইপ্রাসে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা সংক্রান্ত এই প্রশাসনিক আদালতের সামনে আশ্রয়প্রার্থীরা ভোর থেকে অপেক্ষা করেন৷ ছবি: আরাফাতুল ইসলাম৷


সাদা কাগজ কেন?

আশ্রয়প্রার্থীর কথায়, ‘‘সাইপ্রাসে থাকা পুরোপুরি বাতিল নাকি নিশ্চিতকরণ রয়েছে সেটা লিখে দেবে সাদা কাগজে৷

এরপর অ্যাসাইলাম ইন্টারভিউ হবে৷’’

রাজু বলেন, ‘‘সাইপ্রাসে ঝামেলা হয়৷ বাতিল করে করে ৫ বছর, ৬ বছর থেকে যেতে হয় উকিলের মাধ্যমে৷আমি ভাতা নিইনি৷ কারণ কাজ করছি৷ এখানে কাগজ দিতেই চায় না৷ এই সাদা কাগজ নিয়ে যতদিন পারব থাকব৷’’ 


আরকেসি/কেএম

 

অন্যান্য প্রতিবেদন