স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলায় কাঁটাতারের বেড়া ও লোহার প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টারত অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: রয়টার্স
স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলায় কাঁটাতারের বেড়া ও লোহার প্রাচীর অতিক্রমের চেষ্টারত অভিবাসীদের একটি দল। ছবি: রয়টার্স

২৪ জুন শুক্রবার সকালে প্রায় দুই হাজার অনিয়মিত অভিবাসীর একটি বিশাল দল স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলায় প্রবেশের চেষ্টা করে৷ এসময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে অভিবাসীদের সংঘর্ষ বাধলে অন্তত ২৩ অভিবাসনপ্রত্যাশী নিহত হয়েছেন বলে দাবি মরক্কোর। এ ঘটনার জন্য স্প্যানিশ প্রধানমন্ত্রী মানবপাচারে যুক্ত "মাফিয়াদের" অভিযুক্ত করেছেন। এনজিও এবং অধিকার সংগঠনগুলো এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে৷

শুক্রবার ২৩ জুন, মরক্কোর সীমান্তবর্তী ভূমধ্যসাগরের স্পানিশ ছিটমহল মেলিলায় ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। সাব-সাহারা আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা অভিবাসীদের বিশাল দল সীমান্তে প্রবেশের চেষ্টা করলে দ্রুত সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে স্পেন ও মরক্কো কর্তৃপক্ষ। সংঘর্ষ চলাকালে অভিবাসীদের উপর টিয়ার শেল ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে সীমান্ত অতিক্রমে বাঁধা দেয় দুই দেশের পুলিশ।

মরক্কোর  নাদোর প্রদেশ কর্তৃপক্ষের একটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছে, “সর্বশেষ আরও পাঁচ অভিবাসী নিয়ে মৃতের সংখ্যা ২৩-এ পৌঁছেছে। এছাড়া আরও ১৮ অভিবাসী এবং এক পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের অবস্থা আশংকাজনক।” 


মরক্কোর নাদোর শহর এবং স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলার অবস্থান। ছবি: গুগল ম্যাপ
মরক্কোর নাদোর শহর এবং স্প্যানিশ ছিটমহল মেলিলার অবস্থান। ছবি: গুগল ম্যাপ


মরক্কোর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মতে, “অনিয়মিত অভিবাসীরা সীমান্ত পাড়ির দেয়ার লক্ষ্যে অত্যন্ত ধ্বংসাত্নক পদ্ধতি ব্যবহার করেছে। যার ফলে অনেকেই সংঘর্ষের সময় কাঁটাতারের বেড়া থেকে পড়ে এবং সীমান্তে থাকা লোহার সাথে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা খেয়ে মারা যান।”


আফ্রিকা মহাদেশের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র সীমান্ত মেলিলা এবং সেউটাতে প্রবেশের জন্য সাব-সাহারা দেশগুলোর অভিবাসীরা প্রায়ই চেষ্টা চালিয়ে থাকেন। শুক্রবারের সংঘর্ষ এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় সংঘর্ষ। এ ঘটনায় ২৩ অভিবাসীর মৃত্যুর পাশপাশি ১৪০ জন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।

যুদ্ধের পরিস্থিতি

স্প্যানিশ গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, “সংঘবদ্ধ অভিবাসীরা পাথর এবং হাতুড়ি নিয়ে সজ্জিত ছিল। পুলিশ এক প্রকার বাধ্য হয়ে এই হামলার জবাব দেয়। কর্তৃপক্ষ দলটির উপর কাঁদানে গ্যাস ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে।”

অপরদিকে কয়েক সপ্তাহ ধরে মেলিলা ছিটমহলে অবস্থারত একজন সুদানের নাগরিক শুক্রবার ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানান, “আমরা বন্দুকের গুলির শব্দ শুনেছি। উভয় দেশের নিরাপত্তাবাহিনী অভিবাসীদের ব্যাপক মারধর করেছে।”

মেলিলা আটক কেন্দ্রে বন্দি ২০ বছর বয়সি এক সুদানের নাগরিক বার্তা সংস্থাকে এএফপিকে জানান, “এটি যুদ্ধ ছিল। মরক্কোর সৈন্যদের সাথে লড়াই করার জন্য আমাদের হাতে শুধু পাথর ছিল/ তারা আমাদের লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারছিল।”

একই কেন্দ্রে আটক আরেক অভিবাসী জানান, একজন পুলিশ তার হাতে আঘাত করার আগে তিনি মরোক্কোর শহর নাদোরকে স্প্যানিশ ছিটমহল থেকে পৃথককারী কাঁটাতাররে বেড়ায় আরোহণ করেছিলেন। 

তিনি আরও যোগ করেন, “আমি স্প্যানিশ সীমান্তে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। যেখানে আমাকে পুলিশ মারধর করেছিল।”

স্প্যানিশ প্রেফেকচুরের সূত্র অনুসারে, “শুক্রবার মোট ১৩০ জন অভিবাসী মেলিলায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল যাদের মধ্যে একজন হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন।”

মরক্কোর অভিবাসী স্রোতের নতুন অভিবাসীদের বেশিরভাগই সুদান থেকে এসেছে। বিশেষ করে দেশটির বহুল আলোচিত দারফুর অঞ্চল থেকে। যেখানে সম্প্রতি নতুন করে সহিংসতার ছড়িয়ে পড়েছে। অঞ্চলটিতে সংঘর্ষে শতাধিক মৃত্যু এবং ৫০ হাজার অধিবাসী বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মরক্কোর সাথে সুদানের আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও লিবিয়া এবং আলজেরিয়ার মধ্য দিয়ে হাজারো অভিবাসী মরক্কোতে প্রবেশ করে। 

‘মাফিয়াদের সংগঠিত হামলা’

স্পেনের বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই ঘটনাকে মানবপাচারে জড়িত মাফিয়াদের একটি ধ্বংসাত্মক এবং সংগঠিত আক্রমণ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। 

রাজধানী মাদ্রিদে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, “এটি আমাদের দেশের আঞ্চলিক অখণ্ডতার উপর আক্রমণ।”

মরোক্কান অ্যাসোসিয়েশন ফর হিউম্যান রাইটসের (এএমডিএইচ) এর নাদোর অঞ্চল এবং মেলিলা জোনের আশ্রয়প্রার্থীদের দায়িত্বে থাকা পরিচালক ওমর নাজি বলেন, “আমরা এই ঘটনার সঠিক কারণ উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে বিস্তারিত তদন্ত শুরুর উপর জোর দিচ্ছি। এই প্রথমবার আমরা অভিবাসীদের সাথে পুলিশের এমন সংঘর্ষ লক্ষ্য করলাম৷”

অবশ্য এই অধিকার কর্মী শুক্রবারের সংঘর্ষে সাব সাহারা আফ্রিকার ২৭ অভিবাসীর মৃত্যুর কথা দাবি করেছেন। 

অভিবাসীদের মতে, মাদ্রিদ ও রাবাতের মধ্যে কূটনৈতিক বিরোধ শেষ হওয়ার পর থেকেই মরক্কো পুলিশ স্পেনে প্রবেশ ইচ্ছুক অনিয়মিত অভিবাসীদের উপর নতুন করে গ্রেপ্তার অভিযান জোরদার করেছে। 

ওমর নাজি বলেন, “মরক্কো কর্তৃপক্ষ অভিবাসীদের সাথে অত্যন্ত কঠোর আচরণ করেছে। তারা অভিবাসীদের শিবির ঘেরাও করে রেখেছে। এতে কোন সন্দেহ নেই যে সীমান্তে কর্তৃপক্ষের নজিরবিহীন চাপ এই সহিংসতা সৃষ্টি করেছে।"


অভিবাসীদের সাহায্যকারী এনজিওগুলির সমন্বিত প্লাটফর্ম এএমডিএইচ এই ঘটনায় স্বচ্ছ এবং অধিকতর তদন্তের দাবি জানিয়েছে। 

এছাড়া অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা মরক্কোর আলোচিত ট্রেড ইউনিয়ন ডেমোক্রেটিক লেবার অর্গানাইজেশন (ওডিটি), এই মর্মান্তিক সংঘর্ষের তদন্ত শুরু করতে এবং উভয় পক্ষের ক্ষতিগ্রস্থদের প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণ দিতে দ্রুত উদ্যোগ গ্রহনের আহ্বান জানিয়েছে।

আন্তজার্তিক অভিবাসন সংস্থা (আইওম) এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) এক যৌথ বিবৃতিতে "গভীর উদ্বেগ" প্রকাশ করে জানিয়েছে, “যেকোন পরিস্থিতিতে অভিবাসী এবং শরণার্থীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় খুঁজে দিতে একটি টেকসই সমাধানের দিকে গুরুত্ব আরোপ করা উচিত।’’


এমএইউ/আরআর


















 

অন্যান্য প্রতিবেদন