২০১৭ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে নিহত ও নিখোঁজ অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ করছে আন্তজার্তিক রেড ক্রস কমিটি। ছবি: পিকচার এলায়েন্স
২০১৭ সাল থেকে ভূমধ্যসাগরে নিহত ও নিখোঁজ অভিবাসীদের পরিচয় শনাক্ত করার কাজ করছে আন্তজার্তিক রেড ক্রস কমিটি। ছবি: পিকচার এলায়েন্স

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি ভূমধ্যসাগরে মৃত ও নিখোঁজ অভিবাসীদের শনাক্ত করতে কয়েক বছর ধরে কাজ করছে। সমুদ্রে নৌকাডুবির পর মৃতদেহ শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে ইনফোমাইগ্রেন্টস কথা বলেছে রেড ক্রসের ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং নৃতত্ত্ববিদ হোসে পাবলো বারেবারের সঙ্গে।

৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরেস ভূমধ্যসাগরে মৃত বা নিখোঁজ ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজ করছেন হোসে পাবলো বারেবার। তিনি পেরুর নাগরিক। সেখানেই কর্মজীবন শুরু করেছিলেন এই ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ। বছরের পর বছর ধরে এই বিষয়ে কাজ করতে গিয়ে অর্জন করেছেন দক্ষতা এবং জুড়িয়েছেন খ্যাতি। 

আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) এই প্যাথলজিস্ট এবং নৃবিজ্ঞানী এখন ইউরোপে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে মারা যাওয়া অভিবাসীদের পরিচয় পুনরুদ্ধার করার কাজে নিজকে নিবেদিত করছেন।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: আপনি কীভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নিখোঁজ অভিবাসীদের শনাক্ত করতে সাহায্য করেন?

হোসে পাবলো বারেবার: আমরা ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো কাজ শুরু করি। সেসময় ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল সংঘটিত একটি নৌকা ডুবির ঘটনায় ভূমধ্যসাগরে নিহত অভিবাসীদের শনাক্তকরণের কাজ শুরু করেছিলাম। মূলত ইটালীয় কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে তাদের সাহায্য করতে বলেছিল।

প্রাথমিকভাবে ২০১৫ সালের সেই নৌকাডুবির পরে শতাধিক মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল এবং মাত্র ২৮ জন বেঁচে ছিল। কিন্তু সকল পরীক্ষা নিরীক্ষার পর আমরা আজ জানি যে নৌকাটিতে প্রায় এক হাজার লোক ছিল। আমাদের প্রথম কাজ ছিল নৌকাটিতে থাকা অভিবাসীদের সংখ্যা নির্ধারণের উপায় খুঁজে বের করা। সংক্ষেপে, যাত্রীদের তালিকা প্রাস্তুত করা। 

পড়ুন>>অভিবাসীদের ক্রমাগত আগমনে হিমশিম খাচ্ছে লাম্পেদুসা

প্রথম দিকে, আমরা আমাদের হাতে থাকা তথ্যের উপর ভিত্তি করে একটি পদ্ধতি তৈরি করি। তবে এটি শুধুমাত্র ভুক্তভোগীদের আত্মীয়দের কাছে চাওয়া লোকদের নামের উপর করা হয় নি। সেই সাথে অন্যান্য সব তথ্যও একত্রিত করা হয়েছিল। 

মৃতদেহ সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পেতে আমরা আমাদের তথ্যেকে বিভিন্ন ভাবে সমন্বয় করে একটি কাছাকাছি ফলাফল বের করার চেষ্টা করে থাকি। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন ভাবে প্রাপ্ত এসব কৌশলই আমাদের গবেষণা কাজের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করে।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: আপনারা যেসব তথ্য নিয়ে কাজ করার কথা বলছেন সেগুলো আসলে কোন ধরনের এবং কীভাবে সংগ্রহ করেন?

হোসে পাবলো বারেবার: এটি আসলে বিভিন্ন উপায়ে পাওয়া যেতে পারে। যেমন একটি নৌকাডুবির পরে বেঁচে থাকা অভিবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে, যেসব সম্ভাব্য অভিবাসীদের নৌকায় উঠার কথা ছিল কিন্তু বিভিন্ন কারণে পারেনি তাদেরকে প্রশ্ন করে এবং যিনি অভিবাসীদের নৌকায় তুলেছেন তাকে জেরা করে। 

আরও পড়ুন>>সাগরে প্রাণ হারানো অভিবাসীদের জন্য কবরস্থান

এছাড়া নৌকায় অভিবাসীদের সঠিক সংখ্যা জানতে এবং যাত্রীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে অনেক তথ্য বের করা যায়। কারণ শেষ মুহূর্তে নৌকায় উঠার আগে অভিবাসীরা তাদের প্রিয়জন এবং পরিবারের কাছে কথা বলে বিদায় নেন। 

যখন আমরা কোনো মৃতদেহ খুঁজে পাই, তখন আমরা কখনও কখনও তাদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সঙ্গে থাকা নথিগুলো পুনরুদ্ধার করি যেমন: পাসপোর্ট, স্কুল বা টিকা দেওয়ার রেকর্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কাগজের টুকরোতে উল্লেখ করা টেলিফোন নম্বর ইত্যাদি।

এই সমস্ত তথ্য আমাদের গবেষণা তালিকাকে সমৃদ্ধ করে এবং নির্ভরযোগ্যভাবে ব্যক্তিদের জন্য আলাদা ফাইল তৈরী করা সম্ভব হয়ে উঠে। সকল প্রক্রিয়া শেষ হলে আমরা সংশ্লিষ্ট অভিবাসীদের পরিবারের কাছে উত্তর দিতে পারি। তদন্তে যখন আমরা প্রায় নিশ্চিত হই যে খোঁজ করা ব্যাক্তিদের প্রিয়জন মৃত বা নিখোঁজ তখনই আমরা জানায়। তবে আমরা কোনো মৃত্যু সনদ বা ডেথ সার্টিফিকেট প্রদান করি না। শুধুমাত্র ভুক্তভোগী অভিবাসী মৃত কিংবা জীবিত এই উত্তর দিয়ে থাকি।

পড়ুন>>ইটালিতে জোরদার হচ্ছে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের আন্দোলন

উদাহরণস্বরুপ, আমাদের প্রথম কাজ ২০১৫ সালের ১৮ এপ্রিল এর নৌকাডুবির ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা নৌকাটিতে থাকা প্রায় ৫০০ জন অভিবাসীর নাম তালিকাভুক্ত করেছি। যা নৌকাটিতে ধারণা করা যাত্রী সংখ্যার অর্ধেক। এটা করতে আমাদের চার বছরের বেশি সময় লেগেছে।

এটি খুব দীর্ঘ এবং জটিল কাজ।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: মৃতদেহ শনাক্তকরণের প্রথম কাজের পদ্ধতিটি কি অন্য নৌকাডুবির নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে একটি ভিত্তি হিসাবে কাজ করেছে?

হোসে পাবলো বারেবার: হ্যাঁ, প্রথম নৌকা ডুবির কাজের পদ্ধতিটিকে মডেল হিসেবে রাখা হয়েছে। আমরা অন্যান্য প্রকল্পে কাজ করতে পেরেছি।

সেখান থেকে, আমরা ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ রুটের নিহত অভিবাসীদের স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি পাইলট প্রকল্প তৈরি করেছি। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে আমরা মোট সাতটি ঘটনা নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে ২০২১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ঘটা নৌকাডুবির ঘটআ নিয়ে। যেটি দক্ষিণ মরক্কো থেকে যাত্রা করে কেপ ভার্দে ডুবে গিয়েছিল। নৌকার ভিতরে তিনটি মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল। নৌকাটিতে মোট ৩৩ জন যাত্রী ছিল।

এটির পাশাপাশি আমরা ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে ঘটে যাওয়া ছয়টি ঘটনার বিষয়েও বেশ আগ্রহী। এই ছয়টি ঘটনায় প্রায় ২০০ জনেরও বেশি অভিবাসী নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইনফোমাইগ্রেন্টস: আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি নিখোঁজদের শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করছে। এটির জন্য তারা ফ্রান্সের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস (ইনসা) এর সব চুক্তি করেছে। এটি কী ভাবে হচ্ছে?

হোসে পাবলো বারেবার: আমরা মৃতদেহের একটি ছবি ব্যবহার করি এবং একটি কম্পিউটার প্রোগ্রাম ব্যবহার করে বিশেষভাবে ছবিটি রূপান্তর করি। এটিকে আমরা ডিজিটাল মেকআপ বলি। সমুদ্রে অভিবাসীদের দেহাবশেষ প্রায়ই খারাপ অবস্থায় থাকে: তাদের চোখ ঘোরানো, মুখে ক্ষত, তাদের ঠোঁটের কোণে ফেনা হতে পারে, মৃতদেহ পানিতে ফুলে যেতে পারে বা পচনশীল অবস্থায় থাকতে পারে। ইনসা শিক্ষার্থীদের তৈরি কম্পিউটার প্রোগ্রামটির মাধ্যমে মৃত ব্যক্তিদের ছবিগুলোকে রুপান্তর করে তাদের পরিবারের কাছে উপস্থাপনযোগ্য করে তোলা হয়।

আরও পড়ুন>>‘মাইগ্রেন্টস’: ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের কাজ খুঁজে দিতে নতুন অ্যাপ

এছাড়া এই সিস্টেমটি একটি মৃতদেহের ছবির সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তির জীবিত থাকা অবস্থায় তোলা ছবিকে তুলনা করতে সক্ষম। 

ইনফোমাইগ্রেন্টস: নিজেদের স্বজনদের খোঁজে থাকা পরিবারগুলো কীভাবে এগিয়ে যাবে?

হোসে পাবলো বারেবার: আমাদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, সমুদ্রে নৌকাডুবির ঘটনার পর সময় যত বেশি পার হয়, একজন নিখোঁজ অভিবাসীর পরিচয় খুঁজে পাওয়া তত বেশি কঠিন হয়ে পড়ে। 

তাই নৌকাডুবির ঘটনা ঘটলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিবারগুলোর উচিৎ তাদের দেশে থাকা নিকটস্থ রেড ক্রস কমিটির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে যোগাযোগ করা। সেখানে থাকা কর্মীরা পরবর্তীতে আমাদের প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবে।

পড়ুন>>প্রমোদতরীতে কোয়ারেন্টাইনের নিয়ম বাতিল

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কিন্তু একজন ব্যক্তির পরিচয়পত্রের নথি নয়। সেটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তারা কোথা থেকে যাত্রা করেছিল, কার সঙ্গে, কতজন অভিবাসী নৌকায় ছিল এবং যাত্রার আগে অন্য কোনো বন্ধুর এসব বিষয় জানা ছিল কি না। এই ধরনের বিবরণ আমাদেরকে দ্রুত একজন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় বের করতে সাহায্য করতে পারে।


মূল প্রতিবেদন লেসলি কারেতেরো। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/আরকেসি


 

অন্যান্য প্রতিবেদন