যুক্তরাজ্যের একটি সবজিক্ষেত৷ ফাইল ফটো: পিকচার অ্যালায়েন্স৷
যুক্তরাজ্যের একটি সবজিক্ষেত৷ ফাইল ফটো: পিকচার অ্যালায়েন্স৷

ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্যে ফলের মৌসুম শুরু হয়েছে৷ কিন্তু ব্রেক্সিট ও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শ্রমিক সংকটে ভুগছেন খামারিরা৷ সমস্যার সমাধানে তারা ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কিরগিজস্তান এবং কাজাখস্তান থেকে শ্রমিক আনার কথা ভাবছে৷

শ্রমিকের অভাবে যেন জমিতে ফল পচে নষ্ট না হয় সেই কারণে যুক্তরাজ্য সরকার চলতি বছর মৌসুমি শ্রমিক আনার ভিসা প্রদানে সম্মত হয়৷ কিন্তু সরকাররে হিসাবের চেয়েও দেশটির খামারগুলোতে আসলে আরো বেশি শ্রমিক দরকার৷ যেমন ২০২০ সালে যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড পলিটিক্যাল ইকোনোমি রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, প্রতি বছর ফল কুড়ানোর জন্য যুক্তরাজ্যের ৭০ হাজার শ্রমিক দরকার৷  

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের বাইরের দেশ থেকে শ্রমিক আনার কথা বলছে খামারিরা৷

পড়ুন: ইটালির কৃষিখাতে সাড়ে তিন লাখ বিদেশি

ক্লকহাউস ফার্ম নামে একটি খামারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলি প্যাসকাল বিবিসি ফার্মিং টুডেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, সিজনাল শ্রমিক আনতে সরকারের যেই পরিকল্পনা সেই পরিকল্পনার কারণে তাদেরকে শতকরা ১৪ ভাগের বেশি অতিরিক্ত খরচ করতে হবে৷ তার মতে, চলতি মরসুমে ফল কুড়ানোর শ্রমিক পাওয়াই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷  

শ্রমিক টানতে অতিরিক্ত বিনিয়োগ

শ্রমিকদের কাজে আকৃষ্ট করতে তাদেরকে নানা ধরনের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে খামারিরা৷ যেমন, ক্লকহাউস ফার্মের মালিক শ্রমিকদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন৷ সেই সাথে বারবিকিউ করার জায়গা, কাজে যাওয়ার জন্য যানবাহন সুবিধাও দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি৷

জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত মৌসুমি শ্রমিকদের বেশিরভাগই ছিলেন ইউক্রেনের৷ কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় এবছর খামারটিতে ইউক্রেন থেকে শ্রমিক আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে৷

ক্লকহাউস নামের এই খামারে প্রতি বছর ১২শ শ্রমিকের দরকার হয়৷ কিন্তু স্থানীয়রা এসব কাজ করতে চান না৷

পেকম্যান বলেন, ‘‘কাজগুলো কঠিন৷ আমি নিজেই তো এই কাজ করতে পারি না৷’’ তার মতে, কাজের বিষয়ে ব্রিটিশদের প্রত্যাশা একটু ভিন্ন৷  

তিনি জানান, মহামারির সময়ে তারা স্থানীয়দের নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন৷ আর সেসময় কাজের জন্য হাজার হাজার আবেদনও জমা পড়েছিল৷ কিন্তু সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর দেখা গেল মাত্র দশজন কাজ করতে আগ্রহী৷

পড়ুন: আশ্রয়প্রার্থীদের ইলেকট্রনিক ব্রেসলেট পরানোর পরিকল্পনা যুক্তরাজ্যের

তবে যুক্তরাজ্যের এই খামারগুলোতে মূলত ইউরোপের অনুন্নত দেশগুলোর অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপের দেশ থেকে শ্রমিকরা কাজ করতেন৷ কিন্তু ব্রেক্সিটের পর এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে৷ কারণ এই দেশগুলো থেকে শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া আগের তুলনায় অনেক কঠিন হয়ে পড়েছে৷

কাজ করছেন অনেকেই

তবে যুক্তরাজ্যের খামারগুলোতে যে শুধু ইউরোপীয় এবং ইউক্রেন থেকে আসা শ্রমিকেরাই কাজ করতেন বিষয়টি তেমন নয়৷ মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান অনেকেই৷

তেমনই একজন ওসি৷ ইন্দোনেশিয়ার এই শ্রমিকের গত ১২ বছর ধরে বিভিন্ন দেশে কাজের অভিজ্ঞতা আছে৷ এবার তিনি যুক্তরাজ্যের একটি ফলের খামারে কাজ করতে এসেছেন৷ কেন তিনি যুক্তরাজ্যে কাজ করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে, ওসি বলেন, ‘‘আমি আসলে টাকা আয় করতে চাই৷ ইন্দোনেশিয়াতে আমার মাসিক আয় ১৫০ পাউন্ড৷ কিন্তু যুক্তরাজ্যে কাজ করলে আমি ৩৫০ পাউন্ড পাব বলে আশা করি৷’’

তবে এভাবে কাজ করতে এসে অনেকেই আবার দালালদের হাতে প্রতারিত হচ্ছেন ৷ চলতি বছরের মে মাসে দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, নেপাল থেকে আসা শ্রমিকদেরকে যুক্তরাজ্যে চাকরি পাওযার জন্য নিজ দেশের দালালদেরকে তিন হাজার পাউন্ড করে দিতে হয়েছে৷    

যুক্তরাজ্যের মৌসুমি শ্রমিকেরা

২০২১ সালে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশটির কৃষিখাতে মোট শ্রমিকের সংখ্যা চার লাখ ৬৭ হাজার৷ যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে বছর প্রতি তাদের অবদান ১৩০০ কোটি (১৩০ বিলিয়ন) পাউন্ড৷ আর গত দুই বছরে দেখা যাচ্ছে, দেশটির কৃষিখাতের শতকরা ৯৯ জনই বিদেশি৷

পরিসংখ্যান বলছে ২০১৯ সাল থেকে ২০২১ সাল সময়ে মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি হলেন ইউক্রেনের নাগরিকেরা৷ এসময়ে ইউক্রেন থেকে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক ব্রিটেনে কাজ করতে এসেছেন৷ তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রযেছেন রাশয়ানরা৷ তাছাড়া বুলগেরিয়া এবং বেলারুশ থেকে আসা শ্রমিকেরা তালিকার তৃতীয় এবং চতুর্থ স্থানে রয়েছেন৷

তবে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এ অঞ্চল থেকে মৌসুমি শ্রমিক আসার বিষয়টি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে৷ আর এ কারণে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কিছু দেশের উপর নজর খামারিদের৷

আরআর/এফএস

পড়ুন: যুক্তরাজ্য: সরকারি বাসস্থানে মারা গেছেন ৮২ আশ্রয়প্রার্থী  

 

অন্যান্য প্রতিবেদন