ভূমধ্যসাগরে খ্যাতনামা জার্মান এনজিও সী আই পরিচালিত একটি উদ্ধার অভিযানের পর ভাসছে অভিবাসীদের পরিহিত লাইফ জ্যাকেট। ছবি: সী আই ইন্টারন্যাশনাল
ভূমধ্যসাগরে খ্যাতনামা জার্মান এনজিও সী আই পরিচালিত একটি উদ্ধার অভিযানের পর ভাসছে অভিবাসীদের পরিহিত লাইফ জ্যাকেট। ছবি: সী আই ইন্টারন্যাশনাল

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) সমুদ্রে মারা যাওয়া বা নিখোঁজ হওয়া অভিবাসীদের পরিচয় জানতে কাজ করছে ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয় ইনসার সাথে৷ অভিবাসীদের পরিচয় খুঁজে পেতে সহায়তা করতে চারটি সফটওয়্যার তৈরি করেছেন এই ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা।

গবেষণা ও বিজ্ঞান সর্বদা মানব সেবায় নিবেদিত একটি শাখা। এরই ধারাবাহিকতায় দুই বছর ধরে ফরাসি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যাপ্লাইড সায়েন্সেস (ইনসা) এর বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) সাথে সমুদ্রে মৃত অথবা নিখোঁজ অভিবাসীদের মৃতদেহ শনাক্ত করার মতো কঠিন বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন।

এই ফরাসি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লিওঁ এবং তুলুজ শাখার প্রায় ত্রিশজন শিক্ষার্থী দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ সক্ষমতার চারটি সফটওয়্যার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন যা রেডক্রসের এজেন্টদের কয়েক বছর ধরে ভূমধ্যসাগর এবং আটলান্টিকে নিখোঁজ হওয়া হাজারো অভিবাসীর ব্যক্তিগত পরিচয় উদ্ধারে সহায়তা করবে।

সাগরে মৃত অভিবাসীদের দেহ এবং আঙুলের ছাপ পচনের কারণে সাধারনত ব্যবহার করা যায় না। সেক্ষেত্রে ইনসা’র তরুণ বিজ্ঞানীদের তৈরি সফটওয়্যার রেডক্রসের কাজকে বহুলাংশে সহজ করে দিবে বলে আশা করা হচ্ছে। 


ইতিপূর্বে, আইসিআরসি মৃত ব্যক্তিদের অথবা তাদের সাথীদের রেখে যাওয়া বিভিন্ন বাহ্যিক উপাদান (কাগজপত্র, নথি, গয়না ইত্যাদি) সংগ্রহ করে রেখেছিল। নতুন প্রযুক্তি এই গবেষণাকে আরও দক্ষ পদ্ধতি প্রদান করবে।

আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির (আইসিআরসি) ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং নৃবিজ্ঞানী হোসে পাবলো বারেবার আনন্দের সাথে বলেন, “মৃতদেহ শনাক্ত করতে আমাদের প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করতে হয় এবং সেগুলো সফটওয়্যারে ম্যানুয়ালি স্থানান্তর করা হয়। ইনসার উদ্ভাবিত নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও নিরাপদে ডেটা সংরক্ষণ এবং মূল্যবান সময় বাঁচানো সম্ভব করবে।”

আইসিআরসি কর্মীদের সহায়তায় চারটি অ্যাপ

ফ্রান্সের দ্বিতীয় বৃহত্তর জনসংখ্যার শহর লিওঁ’র এই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালের শিক্ষার্থীরা মোট চারটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে। প্রথম দুটি হচ্ছে ডিভিডক এবং ডিভিম্যাপ। যার সাহায্যে সাগরে মৃত অভিবাসীদের উদ্ধারের স্থান থেকে দাফন পর্যন্ত মৃতদেহের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। 

প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা ইনসা লিওঁর টেলিকমিউনিকেশন বিভাগের প্রভাষক পিয়ের ফ্রসোঁয়া ইনফোমাইগ্রেন্টসকে ব্যাখ্যা করেন, “এজেন্ট বা উদ্ধারকারীরা সরাসরি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একজন অভিবাসীর সর্বশেষ দেহাবশেষের ছবি তুলতে সক্ষম হবেন। এছাড়া তারা মৃত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত একটি অনলাইন ফর্মও পূরণ করবেন। যেখানে ভুক্তভোগীদের প্রাথমিক তথ্য লিপিবদ্ধ থাকবে, যেমন লিঙ্গ, পরিহিত কাপড়, দেহ আবিষ্কারের স্থান এবং দাফন ইত্যাদি তথ্য।”

সমুদ্র থেকে উদ্ধারকৃত মৃতদেহ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রক্রিয়াকরণের আগে বন্দরে বেশ কয়েক দিন রাখার সম্ভাবনা থাকে। যার ফলে মৃত ব্যক্তির অনেক তথ্য হারিয়ে যেতে পারে বা ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করা যেতে পারে। নতুন এই প্রযুক্তির ফলে এসব সমস্যা থেকে মুক্তি মেলবে। 

আরও পড়ুন>>ভূমধ্যসাগরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের আদ্যোপান্ত

বিআরএসএসএ শিরোনামের তৃতীয় অ্যাপ্লিকেশনটি ভুক্তভোগী অভিবাসীর পরিবার থেকে সংগৃহীত ডিএনএ নমুনার প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে সহায়তা করবে।  

পিয়ের ফ্রসোঁয়া ইনফোমাইগ্রেন্টসকে আরও বলেন,

আইসিআরসি কর্মীরা জিনতত্ত্ববিদ নয়৷ এই অ্যাপ্লিকেশনটি তাদের কাজে সহায়তা করার জন্য এবং ডিএনএ নমুনার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলি হারিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য সাজানো হয়েছে৷ এটি অপরিহার্য কারণ এটি নিশ্চিতভাবে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব করে।

স্পষ্টতই, রেড ক্রসের সদস্যরা যখন নিখোঁজদের পরিবারের কাছ থেকে তথ্যের সন্ধানে যাবেন তখন এই সফটওয়্যারে থাকা একটি বিশেষ নথি পূরণ করতে হবে।

‘নেটওয়ার্ক ফর পিপিএল’ নামে সর্বশেষ প্রযুক্তিটি আর্জেন্টিনার বুয়েনোস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করেছিল এবং ইনসা এটিকে একটি অ্যাপ্লিকেশন আকারে রুপ দিয়েছে। এটির সাহায্যে একই নৌকায় বেঁচে থাকাদের উপর একটি ফর্ম পূরণ করা সম্ভব হবে যাতে নৌকায় থাকা ব্যক্তিদের ধরণ, সামাজিক অবস্থান ইত্যাদির প্রতিনিধিত্ব পাওয়া সম্ভব হয়। কারণ বেঁচে যাওয়াদের কাছে নৌকার রুট, লোকের সংখ্যা, যাত্রার স্থান, রাস্তায় নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে। এগুলো সংগ্রহ করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। 

পড়ুন>>কেন সমুদ্রপথে ইটালিতে হাজারো মিশরীয় অভিবাসী?

এই চারটি অ্যাপ্লিকেশন রেডক্রস এজেন্টরা সরাসরি বিভিন্ন উপকূলে ব্যবহার করে সক্ষমতা নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে সবগুলো অ্যাপের সার্বক্ষণিক ও নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে একই সার্ভারে ব্যবহারযোগ্য করার প্রক্রিয়া চলছে।

মৃতদেহ শনাক্ত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ইনসা লিওঁ এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালটির তুলুজ শাখার ছাত্রছাত্রীরা ডিজিটাল মেকআপে সাহায্য করার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি ডুবে যাওয়া মৃতব্যক্তির শরীর (পানিতে ফুলে যাওয়া দেহ, ক্ষতিগ্রস্ত মুখ ইত্যাদি) পরিবারের কাছে উপস্থাপনযোগ্য করে তোলে।

তাদের এই কম্পিউটার প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য হলো একটি কৃত্রিম মুখ "পুনঃনির্মাণ" করা যা নিহত ব্যক্তিদের একটি চেহারার স্বীকৃতি দিতে সক্ষম হবে।

ইনসা তুলুজের অধ্যাপক শার্ল দোসাল বলেন,

এটা অনেকটা ফটোশপ ব্যবহার করার মতো, কিন্তু আরও দক্ষ এবং দ্রুততর। সফটওয়্যারটি ত্বকের ক্ষতিগ্রস্থ অংশগুলিকে সরিয়ে দিতে সক্ষম।

তিনি বলেন, “এই সাফল্যের জন্য রেডক্রসের সংগৃহীত একটি বিশাল ডাটাবেসকে ধন্যবাদ দিতে হবে। কারণ এই তথ্যগুলো অনুপস্থিত অংশগুলিকে অ্যালগরিদমের সাহায্যে পুনর্গঠন করে৷ উদাহরণস্বরূপ, মৃত ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্যেকে কাজে লাগিয়ে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি সুসংগত চোখ তৈরি করতে সক্ষম এটি।”

আরও পড়ুন>>সাগরে প্রাণ হারানো অভিবাসীদের জন্য কবরস্থান

তবে এই পদ্ধতিটির প্রথম সংস্করণ নিয়ে এখন কাজ চলছে এবং এটি বেশ উত্সাহজনক ফলাফল দিচ্ছে। অধ্যাপক শার্ল দোসাল আশা করেন, এক বা দুই বছরের মধ্যে প্রোগ্রামটি আরও নির্ভরযোগ্য এবং কার্যকর হয়ে উঠবে।

ইনসা লিওঁ এবং তুলুজের আবিষ্কার করা এই সমস্ত নতুন প্রযুক্তি এখনও পরীক্ষার পর্যায়ে রয়েছে। শীঘ্রই এগুলো চূড়ান্ত ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত হওয়ার কথা রয়েছে। এগুলো আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি)-এর সদস্যদের আশা জাগিয়েছে। 

ফরেনসিক বিজ্ঞানী হোসে পাবলো বারেবার পরিকল্পনা করেছেন, “বর্তমানে শনাক্তকরণের কাজটি বিস্তৃত একটি যাত্রা। এটি অনেকটা একটি ধাঁধার টুকরোর মতো যা আমরা একসাথে রাখি। আমরা কোন যাদুকরি সমাধানের অপেক্ষায় বসে থাকতে পারি না। তবে এটি আপাতত একটি বড় সমস্যা সমাধানের জন্য ছোট সমাধানগুলির একটি সম্মিলন।”

প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টায় ভূমধ্যসাগর ও আটলান্টিকে ডুবে মারা যায়। 

পড়ুন>>বলকান রুটে এ বছর দ্বিগুণেরও বেশি অভিবাসী: ফ্রন্টেক্স

আন্তজার্তিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) অনুসারে, ২০১৪ সালে প্রথম সমুদ্রে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরুর পর থেকে এপর্যন্ত ২৩ হাজারেও বেশি নেওয়া হয়েছিল তখন বেশি অভিবাসী ভূমধ্যসাগরে মারা গেছে বা নিখোঁজ হয়েছে।


মূল প্রতিবেদন লেসলি কারেতেরো। ফরাসি থেকে ভাষান্তর মোহাম্মাদ আরিফ উল্লাহ।


এমএইউ/এআই 


 

অন্যান্য প্রতিবেদন