তরুণ সিরীয় বংশোদ্ভূত সুইডিশ ফুটবলার  রুনি বার্দঘজি এখন বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকা। ছবি: সভেরিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।
তরুণ সিরীয় বংশোদ্ভূত সুইডিশ ফুটবলার রুনি বার্দঘজি এখন বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকা। ছবি: সভেরিজ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন।

মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম পেশাদার চুক্তিতে স্বাক্ষর করে ফুটবল বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল সিরীয় শরণার্থী ফুটবলার রুনি বার্দঘজি। সুইডিশ জাতীয়তা পাওয়া এই ফুটবলার ড্যানিশ ক্লাব এফসি কোপেনহেগেনের একজন খেলোয়াড। তার পরিবারের দেশত্যাগের দুঃসহ যাত্রাসহ বিস্তারিত পড়ুন ইনফোমাইগ্রেন্টসকে দেয়া রুনি বার্দঘজির সাক্ষাৎকারে।

লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, সাদিও মানে - বর্তমানে সারা বিশ্বের ফুটবল সমর্থকদের কাছে উন্মাদনার শীর্ষে আছেন এই তারকারা। প্রতিযোগিতার এই দুনিয়ায় তারকা বনে যাওয়াটা অনেকের জন্য অনেকটা চাঁদে অবতরণ করার স্বপ্নের মতো। 

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলায় অত্যন্ত কঠিন জীবনযাত্রা এবং ক্রমাগত পরিশ্রমের পথ পেরিয়ে সাফল্যের গল্পও কম নয়। ঠিক এমনটাই ঘটেছে ডেনমার্কের ঘরোয়া লীগের চ্যাম্পিয়ন দল এফসি কোপেনহেগেনের তরুণ মিডফিল্ডার এবং সুইডেনের অনূর্ধ্ব-২১ জাতীয় দলের খেলোয়াড় রুনি বার্দঘজির ক্ষেত্রে।

২০০৫ সালের নভেম্বরে কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটিতে জন্মগ্রহণ করেন সিরীয় বংশোদ্ভূত রুনি বার্দঘজি। তিনি বার্দঘজি পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান। সিরিয়ার বাশার আল-আসাদের শাসনামলে সহিংসতা ও দারিদ্র্য থেকে পালিয়ে তার পরিবার ২০০৩ সালে পারস্য উপসাগরের তেল সমৃদ্ধ রাষ্ট্র কুয়েতে বসবাস শুরু করে।

আরও পড়ুন>>ফুটবল ও বর্ণবাদের লড়াই

রুনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “আমার বাবামা দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পাশাপাশি তারা সিরিয়ায় সার্বক্ষণিক একজন নিপীড়ক শাসনের অধীনে ভয়ার্ত জীবনযাপন করতেন। অনেক সিরীয়র মতো আমার পরিবারও নিজেদের এবং সন্তানদের একটি ভালো ভবিষ্যতের জন্য প্রিয় মাতৃভূমিত্যাগ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন।”

রুনি ব্যখা করেন, “কিন্তু আমার পরিবার যখন হাইড্রোকার্বন অর্থনীতির উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠা কুয়েতে পৌঁছান, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়েন। কুয়েতে বসবাসরত মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক। যাদের মানবাধিকার অত্যন্ত সীমিত এবং তাদেরকে প্রায়শই শোষণসহ নানা ধরনের খারাপ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়।”

রুনির পিতা আমির বার্দঘজি বলেন, “যেসব কুয়েতি মালিকদের সাহায্যে ভিসা নিয়ে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম তাদের কাছে আমরা এক প্রকার জিম্মি হয়েছিলাম। এটি ছিল একটি ভয়ানক অপমানজনক অভিজ্ঞতা। আমি সেসময় লোকদের মধ্যে মানবতার অভাব নিয়ে হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আমরা হাল ছাড়িনি। নতুন লড়াই চালিয়ে নতুন সুযোগ সৃষ্টিতে বিশ্বাসী ছিলাম আমরা। কারণ এটিই ছিল একমাত্র সমাধান।”

তীব্র গরমেও ফুটবল 

বার্দঘজি পরিবার কুয়েতে যাওয়ার প্রায় দেড় বছর পরে জন্ম হয় ছোট্ট রুনির। সে সময় তার পরিবার মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশ থেকে বের হয়ে ইউরোপের দিকে যাত্রা করার পরিকল্পনা করছিলেন। 

কিন্তু যেই কুয়েতি মালিকের মাধ্যমে তারা এসেছিলেন তিনি তাদের সবার পাসপোর্ট আটকে রেখেছিলেন। এটি তাদের পরিকল্পনাকে আরও জটিল করে তোলে।

আমির বার্দঘজি স্মরণ করে বলেন,

আমাদের জন্য সত্যিই এটি একটি কঠিন বছর ছিল। আমরা বারবার চেষ্টা করছিলাম যেন অন্যত্র একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়। আমার এখনও মনে পড়ছে সেই বছরগুলোর কথা, যখন তীব্র গরম থাকা সত্ত্বেও রুনি সারাক্ষণ ফুটবল খেলেছে। আমি তার মধ্যে অন্য শিশুদের তুলনায় আলাদা কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমি চেয়েছিলাম সে অন্য সব শিশুদের নায়্য একটি নির্মল শৈশব পার করুক।

আরব উপদ্বীপের দেশ কুয়েতে সাত বছরের সীমাবদ্ধতা এবং কষ্টের পর অবশেষে বার্দঘজি পরিবার ইউরোপে স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশ সুইডেনে যাওয়ার সুযোগ পান। পরবর্তীতে তারা সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে সুরক্ষা মর্যাদা পান। কুয়েত ছেড়ে সুইডেনের দক্ষিণ-পূর্বের একটি ছোট উপকূলীয় শহর কালিঞ্জে বসবাস শুরু করেন৷

বার্দঘজি পরিবারের জীবনের একটি নতুন পর্যায় শুরু হয় এবং ছোট্ট রুনি আরও বেশি অনুকূল পরিবেশে ফুটবল চর্চা করতে শুরু করে। 

রুনির বাবা হাসি মুখে বলেন, “আমরা জানতাম সুইডেনে রুনির জন্য নতুন একটি সুযোগ হবে এবং আমরা একটি ভাল পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে দেখতে পাবো বলে প্রস্তুত ছিলাম। আমি আমাদের জীবনকে আরও ভালো করার জন্য সুইডেনের প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করতে পারবো না। রুনি এখানকার বাচ্চাদের সাথে খুব খুশি ছিল এবং বাসায় এসে আমাকে বলেতো: “বাবা, আমি একজন ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নের কাছাকাছি যেতে যাচ্ছি।”

ডাকনাম “মাছ” 

বার্দঘজি পরিবারকে নতুন শহরে ভালোভাবে স্বাগত জানানো হয়েছিল। কিন্তু পরিবারটি ভাষাগত, আবহাওয়া এবং নতুন জীবনযাত্রার কারণে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। 

রুনি বলেন,

এটি আমাদের আগের জীবন থেকে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো ছিল, কিন্তু আমরা সর্বোত্তম উপায়ে সেটি মানিয়ে নেওয়ার জন্য সবকিছু করেছি। এমনকি আবহাওয়া, তুষার এবং বৃষ্টি শুরুতে বেশ কঠিন হলেও!

শহরের অন্যান্য শিশুদের কাছাকাছি হতে রুনিকে একটি স্থানীয় ক্লাবে ভর্তি করানো হয়। রুনি সেখান থেকে দ্রুত এই অঞ্চলের সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তিনি তখন তার থেকে ৩ বা ৪ বছরের বড় বাচ্চাদের সাথে খেলতেন এবং অনুর্ধ্ব ১২ দলের সাথে খেলে নজিরবিহীন নৈপুণ্য প্রদর্শ করেন। 

মাঠে বেশ দ্রুতগতির দক্ষতার জন্য তাঁর নাম দেয়া হয় “মাছ”। কারণ তিনি কোনো অসুবিধা ছাড়াই খুব দ্রুত ডিফেন্ডারদের মধ্যে ঢুকে পড়তেন। ১১ বছর বয়সে এক বছরের চুক্তিতে মালমো শহরের রটেবি একাডেমিতে ভর্তির সুযোগ পান রুনি। এই শহরেই অবস্থিত সুইডেনের শীর্ষ ক্লাব এফসি মালমো। সেটি সুইডিশ ফুটবলের জন্য একটি সত্যিকারের প্রতিষ্ঠান। সুইডেন জাতীয় দলে অনেক খেলোয়াড নিয়মিত এই ক্লাব থেকে সুযোগ পান। এছাড়া জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচের মতো তারকা প্রতিভার সৃষ্টি এই ক্লাব থেকে। 

১৫ বছর বয়সে প্রথম চুক্তি

সুইডেনের একটি ক্লাবে অনূর্ধ্ব ১৭ দলে খেলা শুরু করলেও ক্লাবের ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক অসুবিধার কারণে দলটি তাকে বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৪ বছর বয়সে তিনি তার পরিবারের সাথে ডেনমার্কে আসেন। সেখানে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেরা ড্যানিশ ক্লাব এফসি কোপেনহেগেনে যোগ দেন। যাদের স্পন্সর কার্লসবার্গ এবং অ্যাডিডাস। দলটি এখন উত্তর ইউরোপের এই সেরা ফুটলারকে তাদের একাদশে নিয়ে বেশ আশাবাদী।

আরও পড়ুন>>ইটালিতে অভিবাসী ও শরণার্থীদের নিয়ে ফুটবল ক্লাব

ডেনমার্কের রাজধানীতে আসার কয়েক মাস পরে মাত্র ১৫ বছর বয়সে প্রথম পেশাদার ফুটবলে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন রুনি৷ আর এটা তাকে স্ক্যান্ডিনেভীয় ফুটবলের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ স্তরের পেশাদার লীগে খেলার সুযোগ করে দেয়। 

এফসি কোপেনহেগেনের অধিনায়ক লুকাস লেরাগার বলেন, “রুনি এমন একজন তরুণ যিনি ফুটবলকে অন্য কয়েকজনের চেয়ে বেশ আলাদাভাবে অনুভব করে। তিনি সবসময় শিখতে চান এবং সত্যিই উচ্চাভিলাষী। তিনি খুব অল্প বয়সে পেশাদার গ্রুপে পুরোপুরি একীভূত হতে পেরেছেন। 

তিনি আরও বলেন,

কখনও কখনও আমি নিজেকে প্রশ্ন করি। তার বয়সে আমি একজন কিশোর হিসেবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছিলাম। সারাক্ষণ ভিডিও গেম খেলতাম এবং আমার বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখতে যেতাম। কিন্তু রুনি এত ছোট থাকতে এসব পাড়ি দিয়ে যেভাবে সমস্ত কিছু পরিচালনা করে তা সত্যিই অনুকরণীয়, তিনি অনেক দূর যাবেন।

রিয়াল, বার্সা, বায়ার্ন, ম্যান সিটি এবং ম্যান ইউ রুনির পেছনে  

২০২১-২০২২ সেশনে এফসি কোপেনহেগেনের হয়ে চ্যাম্পিয়ন লীগে খেলার সুযোগ পান রুনি। 

সবচেয়ে বড় ইউরোপিয়ান এই প্রতিযোগিতায় তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, ম্যানচেস্টার সিটি, রিয়াল মাদ্রিদ, এফসি বার্সেলোনা এবং বায়ার্ন মিউনিখের মতো দলগুলোর চোখে পড়েন। ইতিমধ্যেই ভবিষ্যতে সম্ভাব্য স্থানান্তর নিয়ে আলোচনা করতে রুনির ম্যানেজারের সাথে আলোচনা করেছে ইউরোপের এসব বড় বড় দলগুলো। 

পড়ুন>>এব্রিমা ডারবো : শরণার্থী থেকে ইটালির ফুটবল তারকা

সফলতা এবং ক্যারিয়ায়ের উড়ন্ত সূচনা হওয়া সত্ত্বেও কিশোর রুনির কাছে তার পরিবারই শেষ কথা। তিনি এবং তার পুরো পরিবার দুই বছর আগে সুইডিশ জাতীয়তা অর্জন করেছিলেন এবং তিনি ইতিমধ্যেই সুইডেনের অনূর্ধ্ব-২১ জাতীয় দলের একজন খেলোয়াড। অর্থ্যাৎ ২১ বছর হওয়ার ঠিক পাঁচ বছর আগেই এই দলে জায়গা করে নিয়েছেন রুনি। 

রুনি বলেন,

আমি মাঠের বাইরে কতটুকু মানুষের জন্য কাজ করতে পারবো সেটাকে আমি অনেক গুরুত্ব দিই। আমি এমবাপ্পের মতো খেলোয়াড়দের থেকে অনুপ্রাণিত হই। যিনি একইসাথে ফুটবলার এবং সমাজকর্মী হিসেবে সবার মডেল।


এমএউ/এআই 



 

অন্যান্য প্রতিবেদন