প্রায় ৪০০ অভিবাসী প্যারিসের দক্ষিণে পোর্ত দ্যো ভের্সাই এলাকায়  অবস্থিত ইউক্রেনীয়দের জন্য সংরক্ষিত একটি কেন্দ্র দখল করে আন্দোলন করেছে। ছবি: লা শাপেল দবু
প্রায় ৪০০ অভিবাসী প্যারিসের দক্ষিণে পোর্ত দ্যো ভের্সাই এলাকায় অবস্থিত ইউক্রেনীয়দের জন্য সংরক্ষিত একটি কেন্দ্র দখল করে আন্দোলন করেছে। ছবি: লা শাপেল দবু

৪০০ জনের বেশি অভিবাসী এবং অভিবাসন সংস্থার সমর্থকরা ইউক্রেনীয় নাগরিকদের জন্য সংরক্ষিত অভ্যর্থনা কেন্দ্র দখল করে প্যারিসে বিক্ষোভ দেখাল। রোববারের এই আন্দোলনে অংশ নেয়া আফ্রিকা এবং আফগান অভিবাসীদের অভিযোগ ফরাসি কর্তৃপক্ষ বাসস্থান ঠিক করে দয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের অভিবাসীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক এবং বর্ণবাদী আচরণ করছে।

১৭ জুলাই, পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে, প্রায় ৪০০ অভিবাসী প্যারিসের দক্ষিণে পোর্ত দ্যো ভের্সাই এলাকায় অবস্থিত ইউক্রেনীয়দের জন্য সংরক্ষিত একটি কেন্দ্র দখল করে আন্দোলন করেছে। ফ্রান্সে ইউক্রেনীয় অভিবাসীদের গুরুত্ব দেয়া এবং অ-ইউরোপীয় দেশ থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীদের জরুরি বাসস্থান ঠিক করতে বিলম্ব করার কারণে এই প্রতিবাদ চলে৷

অভিবাসীদের সহায়তা গোষ্ঠী ‘লা শাপেল দবু’ এর নেতৃত্বে পালিত এই কর্মসূচিতে অভিবাসীদের সমর্থন করেছেন একাধিক পড়ুয়া, অধিকার কর্মী এবং অভিবাসন সংস্থার স্বেচ্ছাসেবকরা। প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেয়া অভিবাসীদের বেশিরভাগই পূর্ব আফ্রিকা ও আফগানিস্তানের নাগরিক। অনেক নারী অভিবাসীও ছিলেন যাদের কেউ কেউ অন্তঃসত্ত্বা৷ সন্তানদের নিয়েও বিক্ষোভ দেখান অনেকে৷

ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এবং অন্যান্য জাতীয়তার অভিবাসীদের সঙ্গে বর্ণবাদী আচরণ করা হচ্ছে, এমন অভিযোগ এনেছে৷


ইউক্রেনের সংঘাত থেকে ফ্রান্সে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থার মাধ্যমে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী বাসস্থানে জরুরি ভিত্তিতে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। অপরদিকে মাসের পর মাস ধরে অনেক আশ্রয়প্রার্থী ও অনিয়মিত অভিবাসীরা ফরাসি কর্তৃপক্ষের জরুরি আবাসন জায়গা না পেয়ে প্যারিসে বা ফ্রান্সের উত্তরে অস্থায়ী শিবিরে ঘুমাতে বাধ্য হচ্ছেন৷

এক যৌথ বিবৃতিতে, অভিবাসী এবং অধিকার কর্মীরা আশ্রয় ব্যবস্থায় ‘বর্ণবাদ চর্চা’ এবং ‘বর্ণবাদী’ যুক্তির তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

“আমাদের রাস্তায় স্বাগত জানানো হয়েছিল”

আন্দোলনরত অভিবাসীদের অনেকেই অনিয়মিত অভিবাসী হওয়ায় ফরাসি সরকারের জরুরি আবাসন ব্যবস্থায় জায়গা পাচ্ছেন না। বিশেষ করে ডাবলিন বিধিমালায় থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে এটি আরও ভয়াবহ। যে সব আশ্রয়প্রার্থীদের ইতিপূর্বে ইউরোপের কোন দেশে আশ্রয় আবেদন ছিল অথবা আঙুলের ছাপ নেয়া হয়েছে তারা সাধারণত প্রথমে স্বাভাবিক নিয়মে আশ্রয় আবেদন করতে পারেন না ফ্রান্সে। 

এক্ষেত্রে আইনের অজুহাত দেখিয়ে অনেক আশ্রয়প্রার্থীকে সরকারের জরুরি আবাসন জায়গা দেয়া হয় না বলে অভিযোগ অভিবাসী ও অধিকার কর্মীদের। 

এসব ভুক্তভোগী আশ্রয়প্রার্থীরা কার্যত কয়েক মাস ধরে প্রশাসনিক ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এ হারিয়ে যান। 

পাশাপাশি ডাবলিন বিধিমালার বাইরে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আশ্রয় আবেন করা নতুন আশ্রয়প্রার্থীরাও প্রথম দিকে প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করা পর্যন্ত রাস্তায় কিংবা কোন অস্থায়ী শিবিরে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। 

বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আশ্রয়প্রার্থীরা কোন বাসা বা অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিতে পারেন না এবং সরকারি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র এবং আবাসন গুলোতে জায়গা খালি হওয়া পর্যন্ত আশ্রয়প্রার্থীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। 

ইউক্রেনীয়দের মতো একই সুবিধার দাবি জানিয়েছে ফ্রান্সে আন্দোলনরত অভিবাসীরা।  ছবি: লা শাপেল দবু
ইউক্রেনীয়দের মতো একই সুবিধার দাবি জানিয়েছে ফ্রান্সে আন্দোলনরত অভিবাসীরা। ছবি: লা শাপেল দবু


প্রিফেকচারে অ্যাপয়েন্টমেন্ট খুঁজে পাওয়ার জন্য এবং তাদের আশ্রয়ের আবেদন প্রক্রিয়াকরণের সময় রাস্তাতেও কাটাতে হচ্ছে অনেককে৷

শরণার্থীরা অনেক সময় সামাজিক আবাসনে বা ব্যক্তিগত ভাড়ার অ্যাপার্টমেন্ট খুঁজে পায় না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জাতীয় অভ্যর্থনা ব্যবস্থা (ডিএনএ) এর আবাসনে জায়গার অভাব৷

রোববারের আন্দোলনে অংশ নেয়া অভিবাসীদের একজন ২৫ বছর বয়সি সুদানি নাগরিক আব্দুলরাহাম। তিনি ২০১৯ সালে শরণার্থী মর্যাদা পেয়েছিলেন।এরপর থেকে নিয়মিত চাকরিতে থাকা সত্ত্বেও কোনো আবাসন খুঁজে পাচ্ছেন না। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে প্যারিসে অভিবাসীদের প্লাটফর্ম লা শাপেল দবু’র সহায়তায় খোলা একটি স্কোয়াটে বসবাস করছেন। এর আগে তিনি রাজধানীর উত্তরে একটি তাঁবুতে ঘুমাতেন।

তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “ইউক্রেনীয় এবং আমাদের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট। তাদের জন্য নির্ধারিত জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রশাসনিক পদ্ধতির সুবিধার্থে কম্পিউটার কক্ষ সহ শিশুদের জন্য শৌচাগার এবং খেলাধূলার সুযোগ রয়েছে। সাধারণ আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এগুলো কখনো ছিল না। 

তার কথায়,, “পুলিশ বারবার রাস্তায় বা মহাসড়কের পাশে তৈরি অস্থায়ী ক্যাম্প সরিয়ে দেয় এবং কাঁদানে গ্যাসের মাধ্যমে আমাদের অভ্যর্থনা জানায়। আমরা যখন রাস্তায় রাত কাটাই, তখন ইউক্রেনীয়রা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন।”

“ইউক্রেনীয়দের জন্য থাকার ব্যবস্থা”

অভিবাসন কর্মীদের মতে, “পাঁচ মাসে প্রায় ১ লাখ ইউক্রেনীয় ফ্রান্সে এসেছেন। তাদের অভ্যর্থনা জানাতে কর্তৃপক্ষ আশ্রয় নীতিতে দ্বৈত ভূমিকা রাখছে।”

বাসস্থানহীন অভিবাসীদের যৌথ প্লাটফর্ম লা শাপেল দবু এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, “আমরা প্রমাণ করছি যে আশ্রয় আইনের অভ্যর্থনা নীতিতে ইউক্রেনীয়দের জন্য বিশেষ সুবিধা কোনো বিকল্প নয়। এটি একটি রাজনৈতিক পছন্দ হিসেবে বাস্তবায়ন করা হয়েছে।”

রোববারের আন্দোলনের স্থান পোর্ট দ্যো ভের্সাই এর কেন্দ্রটি ভিন্ন জাতীয়তার অভিবাসীদের সঙ্গে আবাসন বৈষম্যের অন্যতম প্রতীক। ইউক্রেনীয়দের জন্য নির্ধারিত ৬০০ ব্যক্তির ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন এই কেন্দ্রটি বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে খালি পড়ে থাকলেও, স্থানীয় প্রেফেকচুর সেখানে অন্যান্য জাতীয়তার অনিয়মিত ও নিয়মিত অভিবাসদের স্থান দিতে অস্বীকার করেছে।

লা শাপেল দবুর কর্মী ম্যালকম ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “আমাদের আন্দোলনের সময় কেন্দ্রটিতে মাত্র ৩০টি শয্যায় ইউক্রেনীয়দের দেখেছিলাম। বাকি সব আসন সম্পূর্ণ খালি ছিল।”

অভিবাসীদের এই সম্মিলিত এবং যৌথ প্রতিবাদ এবারই প্রথম নয়। সাম্প্রতিককালে একই দাবিতে একাধিক প্রতিবাদ সমাবেশ হয়েছে। 


আলোচিত অভিবাসন সংস্থা ইতুপিয়া ৫৬ এবং মেদসাঁ দ্য মোন্দ সহ বেশ কয়েকটি সংস্থা ৯ জুলাই সব জাতীয়তার অভিবাসীদের আবাসনের দাবিতে বিক্ষোভ করেছে ।

ফরাসি সরকাররের আশ্রয় নীতির নিন্দা শুধু এনজিও এবং অভিবাসন সংস্থাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ফরাসি বাম রাজনৈতিকদলগুলোও নিয়মিত বর্তমান সরকারের অভিবাস নীতির জানিয়ে আসছে। 

একই ঘটনার প্যারিসের ক্ষেত্রেও। প্যারিসের মেয়র ফরাসি সোশ্যালিস্ট পার্টি সমর্থিত আন হিদালগো। তার নেতৃত্বে পুরো প্যানেলটি পরিবেশ ও বাম সমর্থিত দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত। স্বভাবতই অভিবাসীদের জরুরি আবাসন ইস্যুতে রাষ্ট্রপতি এমানুয়েল ম্যাক্রঁ সমর্থিত মধ্য ও মধ্য ডানপন্থি সরকারের সঙ্গে প্রায়ই বিবাদে জড়ায় নগর কর্তৃপক্ষ। 

ফরাসি কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম মুখপাত্র এবং প্যারিস নগরের জরুরি বাসস্থান ও শরণার্থীদের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা নির্বাচিত কাউন্সিলর ইয়ান ব্রোসা ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “অভিবাসীদের বাসস্থানের বিষয়টি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের দায়িত্বের আওতাভুক্ত একটি বিষয়। সরকার জেনে বুঝেও তাদের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেছে। আমাদেরকে তাদের দায়িত্ব পালন কর‍তে হচ্ছে।”

ইয়ান বোসা আরও বলেন, “সরকারের কাছে প্যারিসের ১৫ নং ডিসট্রিক্টে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত কিন্তু ফাঁকা রয়েছে এমন একটি কেন্দ্রে এই পরিবারগুলিকে রাখতে অনুরোধ জানিয়েছি।”


কিন্তু সরকার স্পষ্টভাবে এই বিকল্প প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ইল- দ্যো-ফ্রঁন্স প্রেফেকচুর বার্তা সংস্থা এএফপি কে জানায়, পোর্ত-দ্যো-ভার্সাই এলাকায় ইউক্রেনীয়দের জন্য নির্ধারিত স্থানটি মূলত অস্থায়ী ট্রানজিট পয়েন্ট। এটি আন্দোলনরত অভিবাসী পরিবারগুলোর আবাসনের অনুরোধের সঙ্গে খাপ খায় না।”

সরকারের এই যুক্তি মানতে নারাজ ইয়ান ব্রোসা। তিনি বলেন, “ইউক্রেনীয়দের জন্য জায়গা সংরক্ষিত রাখা দোষের নয়। কিন্তু যখন এইগুলো খালি পড়ে রয়েছে, সেখানে অ-ইউক্রেনীয় পরিবারগুলোকেও জায়গা দেয়া যেতে পারে। সরকার এই মানুষগুলিকে রাস্তায় বসিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।”



এমএইউ/আরকেসি


 

অন্যান্য প্রতিবেদন