গ্রিসের একটি কৃষিক্ষেতে কর্মরত বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানি শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ক্যানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতা রীনা কুকরেজা। ছবি: ফটোভয়েস আর্কাইভ এবং চিত্র প্রদর্শনী ‘দিস ইজ এভিডেন্স’।
গ্রিসের একটি কৃষিক্ষেতে কর্মরত বাংলাদেশি এবং পাকিস্তানি শ্রমিকদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন ক্যানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও ডকুমেন্টারি নির্মাতা রীনা কুকরেজা। ছবি: ফটোভয়েস আর্কাইভ এবং চিত্র প্রদর্শনী ‘দিস ইজ এভিডেন্স’।

গ্রিসের কৃষিখাতে পাঁচ বছরের জন্য মোট ১৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আনার জন্য সমঝোতা স্মারক চুক্তিটি ২১ জুলাই গ্রিক সংসদে পাস হয়েছে। মৌসুমি কর্মভিসায় তাদের আনা হবে৷ বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক বিল পাসের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াই জোরদার হবে বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রী নোতিস মিতারাচি।

গ্রিসে বসবাস করা অনিয়মিত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া দ্রুত এগোতে এবং বৈধ অভিবাসনের দরজা খুলে দিতে চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সমঝোতা স্মারক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল ঢাকা ও এথেন্স কর্তৃপক্ষ।

দেশটির অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রী নোতিস মিতারাচি এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমেদ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। 

দুই দেশের মধ্য হওয়া এই সমঝোতা স্মারক বিলটি অবশেষে বৃহস্পতিবার ২১ জুলাই গ্রিক সংসদে পাস হয়েছে। 

কর্মভিসায় বৈধ অভিবাসী আনা ছাড়াও অনিয়মিত বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠাতে এই চুক্তিটি বড় ভূমিকা রাখবে বলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দাবি করেছিলেন গ্রিসের অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রী নোতিস মিতারাচি। 


বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, চুক্তির আওতায় মূলত কৃষিখাতের জন্য বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিবে গ্রিস৷ এক্ষেত্রে আবেদনের সময় ভ্রমণের বৈধ কাগজপত্র, কাজের বৈধ অনুমতিপত্র, স্বাস্থ্যবিমার কাগজ জমা দিতে হবে৷ সেই সঙ্গে নির্ধারিত ফি ও ব্যয় বহন করতে হবে৷

১৫ হাজার মৌসুমি কাজের ভিসা

দুই দেশের মধ্যে এই চুক্তির ফলে গ্রিক সরকার বাংলাদেশিদের প্রতি বছর কৃষিখাতে চার হাজার মৌসুমি কর্মভিসা প্রদান করবে। 

আগামী পাঁচ বছরে সর্বমোট ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে এই ভিসা প্রদান করবে দেশটি। চুক্তি অনুযায়ী মৌসুমি ভিসা নিয়ে আসা বাংলাদেশিরা একটি নির্দিষ্ট কাজ নিয়েই গ্রিসে আসবেন এবং বছরে নয় মাস গ্রিসে থাকা ও কাজ করার সুযোগ পাবেন। 

আরও পড়ুন>>ফেরত পাঠানোর শঙ্কায় গ্রিসের অনিয়মিত বাংলাদেশিরা

কৃষিখাতে ভিসা পাওয়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে নয় মাস পরে বাংলাদেশে ফেরত যেতে হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার দায়বদ্ধ থাকবে। একজন ব্যক্তি এভাবে বছরে নয় মাস করে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর গ্রিসে বৈধ অভিবাসী হিসেবে কাজ করতে আসতে পারবেন। 

তবে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কোনো ব্যক্তি এই ভিসা নিয়ে গ্রিসে কাজ করলেও পরবর্তীতে তিনি গ্রিসে নাগরিকত্ব বা স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবেন না বলে চুক্তি উল্লেখ রয়েছে। 

মূল উদ্দেশ্য অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াই

গ্রিক সরকারের মূল উদ্দেশ্যে অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং একটি কঠোর ও ন্যায্য অভিবাসন নীতি বাস্তবায়ন করা।

২০২১ সালে গ্রিসে অভিবাসন প্রবাহ ছিল দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন, আট হাজার ৭৪৫ জন। ২০২২ সালেও এই সংখ্যা গত দশ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

তুরস্ক সীমান্ত থেকে প্রবল চাপ সত্ত্বেও চলতি বছর গ্রিসে অনিয়মিত অভিবাসী প্রবেশের সংখ্যা সহনীয় মাত্রায় রয়েছে বলে দাবি করেছে গ্রিক কর্তৃপক্ষ। 

গ্রিসের অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রী আরো উল্লেখ করেছেন, এই মুহূর্তে গ্রিক অর্থনীতিতে বিপুল সংখ্যক জনবল প্রয়োজন। বিশেষত কৃষি খাতে, গার্হস্থ্য কাজ, পর্যটন এবং নির্মাণে খাতে প্রচুর কর্মীর প্রয়োজন রয়েছে।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “মানবসম্পদ নিয়োগ অবশ্যই আইনিভাবে হওয়া উচিত। মানবপাচার চক্র যেন কোনোভাবেই সুযোগ নিতে না পারে সেক্ষেত্রে নজর রাখতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে এই সমঝোতা স্মারক চুক্তিটি বৈধ অভিবাসন পদ্ধতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে আরো একটি বড় পদক্ষেপ এবং দেশের শ্রমিক সংকটের চাহিদা পূরণ করবে।”

২১ জুলাই সংসদে দেয়া বক্তব্যে নোতিস মিতারাচি,

তৃতীয়-দেশের বা অ-ইউরোপীয় নাগরিকদের এক থেকে পাঁচ বছরের মৌসুমী কর্মভিসা দেয়া সহজ করতে একটি নতুন রেসিডেন্স পারমিট প্রবর্তনের কথা উল্লেখ করেছেন। এর ফলে মৌসুমি ভিসায় আসা অভিবাসী এবং গ্রিক দূতাবাসগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে। নতুন রেসিডেন্স পারমিট দেয়া হলে দূতাবাসগুলোকে একজন মৌসুমি কর্মীকে প্রতি বছর দীর্ঘমেয়াদি বা ডি ক্যাটাগরির ভিসা প্রদান করতে হবে না। 


চুক্তিতে অবশ্য মৌসুমি কর্মীদের বেতন, কর্মঘণ্টা, কাজ এবং জীবনযাত্রার অবস্থা সম্পর্কে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি। 

অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে কীভাবে গ্রিসে মৌসুমি কর্মী আনা হবে সেই প্রক্রিয়াটি ফেব্রুয়ারিতে দেয়া দুই দেশের মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ ছিল না৷ 

এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব ড. আহমেদ মুনিরুছ সালেহীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে জানিয়েছিলেন, মূলত সমঝোতা স্মারকটি গ্রিসের সংসদে অনুমোদিত হওয়ার পরই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে৷ তখন নিয়োগ প্রক্রিয়া কী হবে সেই বিষয়টি দুই দেশ মিলে ঠিক করবে৷ এক্ষেত্রে কোনো মধ্যসত্ত্বভোগী থাকবে কি না তা এখনও বলার সময় আসেনি৷ তবে খুব দ্রুতই এই কার্যক্রম শেষ হবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই গ্রিসে কর্মী পাঠানো যাবে বলে তিনি আশাবাবাদী৷

পড়ুন>>বাংলাদেশ, পাকিস্তানের অনিয়মিত অভিবাসীদের আলোকচিত্রে গ্রিসের প্রবাস জীবন

প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হলে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে উল্লেখ করেন সরকারের এই কর্মকর্তা৷ তার কথায়, ‘‘(আগ্রহীদের) আমরা অনুরোধ করব সরকার জানানোর আগে যাতে এই বিষয়ে কেউ কারো সঙ্গে কোনো লেনদেনে জড়িত না হন৷’’ 

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রীও এই বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন৷ চুক্তি শেষে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার পর সম্পূর্ণ নিয়োগকারীদের ব্যয়ে গ্রিসে যাওয়া যাবে৷ আগ্রহী ব্যক্তি যেন কোনোভাবে দালাল বা প্রতারকের খপ্পরে না পড়েন সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে৷


(কাথিমেরিনি, নিউজ বুলেটিন২৪/৭, গ্রিক অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক মন্ত্রণালয়)


এমমএইউ/আরকেসি  


 

অন্যান্য প্রতিবেদন