লিবিয়ার একটি আটক কেন্দ্রের ভেতরের দৃশ্য। ছবিঃ ইউরো মেড মনিটরের টুইটার থেকে সংগৃহীত।
লিবিয়ার একটি আটক কেন্দ্রের ভেতরের দৃশ্য। ছবিঃ ইউরো মেড মনিটরের টুইটার থেকে সংগৃহীত।

অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার ও নির্যাতন লিবিয়ায় নিয়মিত ঘটনা৷ কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলিতে এই সহিংসতায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে৷ অভিবাসী ও এনজিওগুলোর অভিযোগ, ‘এএসএস’ নামে সংগঠিত নতুন এক সশস্ত্র গোষ্ঠী গোপনে ও নৃশংস পদ্ধতিতে অভিবাসীদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে।

স্থিতিশীলতা সহায়তা কর্তৃপক্ষ-এএসএস নামে যাত্রা করা লিবিয়ার নতুন ও সংগঠিত এই মিলিশিয়া বাহিনী অভিবাসীদের মধ্যে ভয়ের বীজ বপন করেছে৷ দেশটিতে অবস্থানরত অভিবাসীদের মতে নতুন এই সংগঠনটির কার্যক্রম পূর্বের গোষ্ঠীগুলোর চেয়ে আরও সহিংস ও বিপজ্জনক৷ 

২০২১ সালের জানুয়ারিতে গঠিত বাহিনীটি বর্তমানে ত্রিপোলিতে ক্ষমতাসীন সরকারের আহবানে সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী আবদুল হামিদ দিবিবাহর নেতৃত্বে কাজ করছে৷ বাহিনীটির প্রধান হিসেবে আছেন আবদেল-গনি আল-কিকলি, ওরফে ‘ঘেনিওয়া’৷ গত দশ বছরে যুদ্ধাপরাধ এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার দায়ে তাকে ‘যুদ্ধবাজ’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছে আন্তজার্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল৷

সাম্প্রতিক সময়ে লিবিয়া উপকূলে এই মিলিশিয়া সংগঠনটির ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এর সদস্যরা এখন কোস্টগার্ডের ভূমিকায় সমুদ্রে যাত্রা করা অভিবাসীদের আটকানোর অভিযানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে৷

পড়ুন>মানবপাচারের বিরুদ্ধে লড়াই, নতুন চুক্তি স্বাক্ষর ইইউ- নাইজারের

এছাড়া লিবিয়ার বেশ কয়েকটি ডিটেনশন সেন্টার বা আটককেন্দ্র পরিচালনা করছে দলটি৷ এর মধ্যে অন্যতম ত্রিপোলির পশ্চিম শহরতলিতে অবস্থিত মায়া কারাগার৷

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেয়া সাক্ষাৎকারে বেশ কয়েকজন অভিবাসী জানান, তাদেরকে মায়া কারাগারে আটক করা করা হয়েছিল৷ তাদের সবাই এএসএস সদস্যদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন৷ 

‘৬৫০ ডলার মুক্তিপণ’ 

৩২ বছর বয়সি মিশরীয় অভিবাসী রাবেই বলেন, তিনি মায়া কারাগারে আটক থাকার সময় বারবার প্রহরীদের অভিবাসীদেকে মারধর করতে দেখেছেন৷ তারা জ্ঞান হারানো পর্যন্ত তাদের মারধর করা হতো৷ তারপর মিলিশিয়ারা অভিবাসীদের মৃতদেহ মাটিতে টানতে টানতে অন্য কোথাও নিয়ে যায়৷ এই মানুষগুলো বেঁচে আছেন কিনা সেটি তিনি জানেন না বলে জানান রাবেই৷

রাবেই বলেন, “তারা আমাদেরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মারধর করত৷ লাঠি থেকে শুরু করে রাইফেলের বাট, লোহার বারসহ হাতের কাছে থাকা যেকোন কিছু দিয়ে তারা মারা শুরু করত৷ এভাবে চলতে থাকলে শেষ পর্যন্ত আপনাকে তাদের আঘাতের নীচে মারা যেতে হবে৷” 

তিন মাস আটক থাকার পর, রাবেই ৬৫০ ডলার বা ৬৫ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিয়ে এই কারাগার ছেড়ে চলে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন৷

পড়ুন>>লিবিয়ায় ঝুঁকিতে থাকা অভিবাসীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া উচিত: এমএসএফ

আরেক মিশরীয় অভিবাসী রমজান এপিকে তার সাথে মায়া কারাগারে আটক এক মরক্কোর যুবকের কথা বর্ণনা করেন৷ সেই যুবক কারাগার থেকে পালানোর চেষ্টা করার পর ধরা পড়লে তাকে নির্দয়ভাবে নির্যাতন করে রক্ষীরা৷ নির্যাতনের পর তাকে কোনো চিকিৎসা না দিয়ে এক সপ্তাহের জন্য কারা অভ্যন্তরে নিথর অবস্থায় ফেলে রাখে৷

রমজান বর্ণনা অনুযায়ী, “মারধরের কারণে তার দেহ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল৷ সে সময় কারগারে আটক থাকা বেশ কয়েকজন অভিবাসী যুবকটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য রক্ষীদের কাছে বারবার অনুরোধ করেছিলেন৷ অবশেষে একদিন লিবীয়রা এসে তাকে নিয়ে যায়৷ যুবকটি তখনও প্রাণে বেঁচে ছিলেন৷ কিন্তু পরবর্তীতে তার কি হয়েছিল আমরা জানি না৷”

‘আটককেন্দ্রগুলিতে নেই জাতিসংঘের প্রবেশাধিকার’

লিবিয়া উপকূল থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে সাগরে আটকা পড়ার পর অভিবাসীদের বিভিন্ন আটককেন্দ্রে রাখা হয়৷ আটক অবস্থায় মারধর এবং অপমানের শিকার হওয়া একটি সাধারণ বিষয়৷ কিন্তু নতুন বাহিনীটির কর্মকাণ্ড সাধারণ লোকচক্ষুর একদম বাইরে রাখা হয়। 

দেশের অন্যান্য কারাগারগুলোর মতো এএসএস পরিচালিত কেন্দ্রগুলো লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রিত নয়৷ জাতিসংঘও সেখানে নিয়মিত পরিদর্শন করতে পারে না৷ 

বার্তা সংস্থা এপি লিবিয়ার একটি সরকারি সূত্র উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, এএসএস একটি সরকারি সংস্থা হিসেবে পরোক্ষভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আর্থিক সহায়তা থেকে উপকৃত হচ্ছে৷৷ 

কারণ ২০১৫ সাল থেকে লিবিয়া উপকূল থেকে ইউরোপে অভিবাসন প্রবাহ রোধে সাহায্য করতে ইইউ ত্রিপোলিকে সরকারকে ৫০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ সহায়তা দিয়েছে৷

পড়ুন>>আজীবন লিবিয়ায় থেকেও নাগরিক হতে পারেননি দাউদ

লিবিয়ার কোস্ট গার্ডের একজন সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, লিবিয়া সরকার এই মিলিশিয়া সংগঠনকে অর্থায়নের জন্য ইইউ তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দেবে৷ যেটি জাতিসংঘ এবং ইইউ মানবাধিকার আইনের সম্পূর্ন বিরোধী৷

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) এই মিলিশিয়া সংগঠন এবং এর অস্বচ্ছ কার্যক্রমের বিষয়টি ইনফোমাইগ্রেন্টসকে নিশ্চিত করেছে৷ লিবিয়ায় কর্মরত ইউএনএইচসিআর মুখপাত্র ক্যারোলিন গ্লাক বলেন, “ইউএনএইচসিআর বা জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার এএসএস পরিচালিত আটককেন্দ্রগুলোতে প্রবেশাধিকার নেই। আমরা সমুদ্রে অভিবাসীদের আটক অভিযানের সময় উপস্থিত থাকতে পারি না৷ এছাড়া উপকূল থেকে আটক হওয়া অভিবাসীদের প্রাথমিক চিকিৎসা কার্যক্রমও পরিচালনা করতে পারি না৷”

মায়া কারাগারের দুর্ব্যবহার সবারই জানা৷ অধিকার সংগঠন লিবিয়া ক্রাইমস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এই কারাগারে নির্যাতন, জোরপূর্বক শ্রমশোষণ, জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তির পাশাপাশি খবার পানি ও ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত অভিবাসীকে আটকের বিষয়ে সতর্ক করেছে৷

পড়ুন>>ফ্রন্টেক্সের বিরুদ্ধে ইউরোপের আদালতে মামলা

অভিবাসী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এই বন্দিকেন্দ্রে বছরের শুরুতে দুই মিশরীয় আশ্রয়প্রার্থীর মৃত্যু হয়েছে৷ এছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে জাতিসংঘের একটি তদন্ত পরিচালিত হয়েছিল৷ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে এই কেন্দ্রে কমপক্ষে তিনজন আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে৷





এমএইউ/এফএস


 

অন্যান্য প্রতিবেদন