জার্মানির বিভিন্ন প্রান্তে দক্ষ কর্মীর খোঁজে প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে৷ ছবি: ডয়চে ভেলে
জার্মানির বিভিন্ন প্রান্তে দক্ষ কর্মীর খোঁজে প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন বিজ্ঞাপন চোখে পড়বে৷ ছবি: ডয়চে ভেলে

ভারি শিল্প থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য কিংবা গৃহস্থালি কর্মকাণ্ড, জার্মানির যে খাতের কথাই বলা হোক, কম-বেশি সবখানেই এখন কর্মী সংকট চলছে৷ বিদেশি কর্মী আকর্ষণে সরকারের দিক থেকে দেশটির অভিবাসন আইন সংস্কারের উদ্যোগও চলছে৷

জার্মানির কোনো রেস্টুরেন্টে এখন খেতে গেলে সহজে টেবিল খালি পেলেও, খাবার পরিবেশনকর্মী বা রাঁধুনির দেখা পাওয়া কঠিন হতে পারে৷ ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশটির কর্মী সংকটে থাকা খাতের মাত্র একটি উদাহরণ এটি৷ 

সাম্প্রতিক সময়ে জনবল ঘাটতির প্রভাবে রেল ও বিমানের সময়সূচিতেও বিপর্যয় দেখা দিয়েছে৷ ব্যবসায়ীদের সংগঠন জার্মান চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-র এক জরিপে প্রায় ৫৬ শতাংশ কোম্পানি কর্মী ঘাটতি থাকার কথা জানিয়েছে৷ জরিপে অংশগ্রহণকারীরা তাদের ব্যবসার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এই পরিস্থিতিকে৷ 

জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মসংস্থান সংস্থা জানিয়েছে, চাকরিক্ষেত্রে ১২২টি খাত এখন ঝুঁকিতে আর ১৪৮টি ঝুঁকির মুখে রয়েছে৷ কিন্তু কিছু কিছু খাতে চাইলেও দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলা সম্ভব নয়৷ যেমন, বয়স্ক ও অসুস্থদের সেবাকেন্দ্রগুলোতে খালি স্থান পূরণে আট মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে৷ নির্মাণ খাতে এই অপেক্ষার সময় ছয় মাস৷ এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশব্যাপী ১৭ লাখের বেশি কর্মখালি আছে৷

কঠিন পরিস্থিতিতে শিল্প

‘‘পাঁচ-দশ বছর আগে আমরা সেবা দেয়ার বিজ্ঞাপন দিতাম৷ এখন আমরা সব মাধ্যমে কর্মী আকর্ষণের বিজ্ঞাপন দিচ্ছি,’’ পরিস্থিতি কতটা খারাপ সেটি বোঝাতে এমনটি বলেছেন বাডেন-ভ্যুর্টেমবার্গ রাজ্যের প্রতিষ্ঠান আইডিএস-এর পরিচালক মার্কুস ভিন্টার৷ 

৭৫০ জন কর্মীর এই কোম্পানিতে ২০টি পদ খালি আছে৷ এর মধ্যে তালার মিস্ত্রি, রং মিস্ত্রি কিংবা ভারি যন্ত্র চালানোর মতো লোকও তাদের দরকার৷ 

ভিন্টার বলেন, ‘‘সমস্যাটা এখন আর কোনো নির্দিষ্ট খাতে নয়, বরং সবক্ষেত্রেই কর্মী সংকট চলছে৷ এমনকি অদক্ষ কর্মীর পদও খালি থাকছে৷ শিল্পে এমন সব খাতে লোক দরকার, যাদের ছাড়া কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন৷’’

পড়ুন: অভিবাসন আইন সহজ করলো স্পেন

অবসরে ‘শিশু বিস্ফোরণ’ প্রজন্ম

ন্যুরেমবার্গের দ্য ইনস্টিটিউট ফর এমপ্লয়ম্যান্ট রিসার্চ (আইএবি)-র অধ্যাপক হার্বার্ট ব্র্যুকারের মতে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা বাদ দিলে এই পরিস্থিতি যে ঘটবে তার পূর্বাভাস মোটামুটি আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল৷ তিনি বলেন, ‘‘আমরা এখন যে নাটকীয় পরিস্থিতিতে পড়েছি, তা দীর্ঘ সময় আগে থেকেই দেখতে পেয়েছি৷’’

বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জার্মানিতে প্রতি বছর সাড়ে তিন লাখ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমছে৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে জন্মহার ব্যাপক বৃদ্ধি হয়৷ ওই সময় জন্ম নেয়াদের ‘শিশু বিস্ফোরণ’ প্রজন্ম হিসেবে অভিহিত করা হয়৷ বর্তমানে এই প্রজন্ম চাকরি থেকে অবসর নিচ্ছে৷ কিন্তু পরবর্তীতে জন্মহার কমে যাওয়ায় তাদের খালি স্থান পূরণ করার মতো এখন যথেষ্ট তরুণ জনগোষ্ঠী নেই দেশটিতে৷ বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবস্থা চলতে থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ শ্রম বাজারে ৭০ লাখ কর্মী ঘাটতি থাকবে৷ 

ব্র্যুকার জানান, একটা সময় জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশ থেকে কর্মী এনে নিজেদের চাহিদা মেটাতো৷ কিন্তু এখন সেসব দেশেও কর্মী ফুরিয়ে আসছে৷ তিনি বলেন, ‘‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশগুলোরও আয় বেড়েছে এবং তাদেও জনমিতিতেও পরিবর্তন এসেছে৷ বলতে গেলে উৎসব পর্ব শেষ হয়ে গেছে৷’’

পড়ুন: মৌসুমি ভিসায় ১৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী আনার বিল পাস গ্রিক সংসদে

সমস্যা শ্রম আইনে

শ্রম বাজারের কর্মী সংকট মেটাতে শ্রম বিশেষজ্ঞ ও শিল্প উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি কর্মী আনার উপর জোর দিয়ে যাচ্ছেন৷ এক হিসাব অনুযায়ী, চাহিদা মেটাতে জার্মানিতে এখন বছরে চার লাখ বিদেশি কর্মী প্রয়োজন৷ কিন্তু সমস্যা হলো দেশটির শ্রম আইন অভিবাসীদের আসার জন্য যথেষ্ট সহায়তামূলক নয়৷ এ কারণে ২০২০ সালে নতুন আইন পাস করে সরকার৷ কিন্তু এর পরের বছরে মাত্র ৩০ হাজার জনকে নিয়োগ দিয়ে জার্মানিতে আনা সম্ভব হয়েছে, যা হতাশাজনক বলে মনে করেন ব্র্যুকার৷

জার্মানির সরকার এখন নতুন আইনটি সংস্কার করতে চায়৷ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এর মূল রূপরেখাটি তৈরি হতে পারে৷ যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রস্তাব আসতে পারে, তার মধ্যে অন্যতম হলো, স্বীকৃত সনদ না থাকলেও শুধু চুক্তিপত্রের ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ দেয়ার অনুমতি দেয়া৷ এর ফলে চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোই তাদেরকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজের জন্য প্রস্তুত করে নিতে পারবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ন্যান্সি ফেজার এবং শ্রমমন্ত্রী হুবার্টাস হেইল৷

আইডিএস পরিচালক ভিন্টার বলেন, ‘‘কোনো একটি কোম্পানির জন্য কে যোগ্য, সেটি এখন নির্ধারণ করে রাজ্য৷ কিন্তু সেটা তাদের কাজ নয়৷’’ 

তিনি বলেন, কোম্পানিগুলো এখনই অপ্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ দিয়ে তাদেরকে চাকরিরত অবস্থায় শিখতে সহযোগিতা করছে৷ এই সংখ্যাটি প্রায় ২০ শতাংশ বলে জানান ভিন্টার৷ জার্মানির চেম্বার অব কমার্স এক বিবৃতিতে বলেছে, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশেরই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা জার্মানির চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন৷ জার্মানির মতো এত জটিল ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া সবাই সব সময় অনুসরণ করে না৷ আর এ কারণে বিদেশ থেকে যথেষ্ট কর্মী আনাও সম্ভব হচ্ছে না৷ 

পড়ুন: এক বছরে শতাধিক বাংলাদেশিকে জোর করে ফেরত পাঠালো জার্মানি

কঠোর ভিসা প্রক্রিয়া

কেউ চাকরির নিয়োগপত্র পাওয়ার পরও জার্মান দূতাবাসের ভিসা প্রক্রিয়া তার জন্য বড় ঝক্কির বিষয় হয়ে উঠতে পারে৷ আইনজীবী বেটিনা অফার বলেন, ‘‘আমি অনেক ক্ষেত্রেই দেখতে পেয়েছি কর্তৃপক্ষ এমন একটি সন্দেহজনক মনোভাব পোষণ করে যেন নিয়োগকর্তারা তাদের কর্মী আনার বদলে কোনো বিদেশিকে পাচার করতে চাইছে৷’’ তিনি জার্মানির অভিবাসন কার্যালয়গুলোর এই ‘রক্ষণশীল’ মনোভাবের কড়া সমালোচনা করেন৷ 

অফার বলেন, ‘‘আমাদের দৃষ্টান্তমূলক বদল দরকার৷ আমাদের দেশে আনা প্রত্যেক কর্মী আমাদের জন্য এক একটা বিজয়৷’’ 

শরণার্থীদের কাজে লাগানো

অনেক নিয়োগকর্তা শরণার্থী নীতিতে বদল এনেও পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন চান৷ ভিন্টার ২০১৬ সাল থেকে তার প্রতিষ্ঠানে এখন পর্যন্ত ৩০০ জন কর্মী নিয়োগ দিয়েছেন৷ কিন্তু এই প্রক্রিয়াটিও খুব একটা সহজ ছিল না তার জন্য৷

তিনি বলেন, ‘‘আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে, এটা সহজ না৷ দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রথম পর্যায়ে আমাদের কাছে পর্যন্ত পৌঁছাতেই পারত না৷ এখানেও আমাদের কিছু পরিবর্তন দরকার৷’’

পড়ুন: বসনিয়ায় বৈধ বাংলাদেশি নির্মাণকর্মী, নতুন সম্ভাবনা

সাবিনে কিনকার্টজ/এফএস

 

অন্যান্য প্রতিবেদন