ইইউ অভ্যন্তরীন সীমান্তে ফরাসি পুলিশের বিশেষ টহল দল। ছবি: রয়টার্স
ইইউ অভ্যন্তরীন সীমান্তে ফরাসি পুলিশের বিশেষ টহল দল। ছবি: রয়টার্স

২০১৫ সালের সিরিয়া থেকে শরণার্থী সংকট শুরুর পর থেকেই অভ্যন্তরীণ সীমান্তগুলোতে নিয়মিত নিয়ন্ত্রণ শুরু করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ৷ বেশ কয়েকটি অভিবাসন সংস্থা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে৷ অবশেষে, ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত ‘কনসেই দেতা’ এই কার্যক্রমের বৈধতা দিয়েছে৷ রায়ে হতাশা ও ক্ষোভ জানিয়েছে এনজিও ও অভিবাসন সংস্থাগুলো৷

ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত ‘কনসেই দেতা’ বা কাউন্সিল অফ স্টেট ২৭ জুলাই দেয়া এক রায়ে জানিয়েছে, ২০১৫ সাল থেকে ফরাসি সরকার প্রতি ছয় মাস অন্তর মেয়াদ বাড়িয়ে ইইউ দেশগুলোর সাথে থাকা অভ্যন্তরীণ সীমান্তে যে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রেখেছে সেটি ‘বৈধ’। 

এর আগে এপ্রিলে এই ব্যবস্থাটিকে ‘অবৈধ’ আখ্যা দিয়ে রায় দিয়েছিল ইইউ কোর্ট অফ জাস্টিস৷ ফরাসি সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ে হতাশা প্রকাশ করেছে এনজিওগুলো৷ 

অপরদিকে, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরা দারমানা এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে টুইট করে বলেন, “সুসংবাদ! সন্ত্রাসবাদের সম্ভাব্য ঝুঁকি রোধ এবং অভিবাসী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে এই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়৷’’


মূলত, শেঙ্গেন চুক্তি থাকার পরও সীমান্তে ফরাসি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অবৈধ দাবি করে সর্বোচ্চ আদালতে গিয়েছিল ‘আনাফে’ সহ বেশ কয়েকটি অভিবাসন সংস্থা৷

সংস্থাগুলোর দাবি, ২০১৫ সাল থেকে এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্যারিস ব্যতিক্রমী উপায়ে ইউরোপীয় আইন লঙ্ঘন করছে৷ 

পড়ুন>>গ্রীষ্মে ফ্রান্সে অনিয়মিত অভিবাসীদের জন্য যত বিনোদন

তাদের মতে, ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি করা সম্ভাব্য নতুন সন্ত্রাসী হামলা ও অভিবাসন প্রবাহের প্রমাণ ও ন্যায্যতা দিতে ব্যর্থ হয়েছে৷ সরকার প্রতি ছয় মাস পর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া সম্প্রসারণের পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি প্রদান করেনি৷ 

আরো ছয় মাস সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের অনুমতি

২০১৫ সালে অভিবাসন সংকট ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় শেঙ্গেন সীমান্ত কোডের অধীনে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন করে ফরাসি কর্তৃপক্ষ। 

গ্রোনোবল আল্পস বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক সেরজ সালমা ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, ‘‘একটা সময়ে এসে একই পরিস্থিতিকে সবসময় ব্যতিক্রম দাবি করা যায় না৷ আইন অনুযায়ী এর সমাধান হচ্ছে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয় করা৷ এ ই কারণেই মে মাসের গোড়ার দিকে ফ্রান্সের উচিৎ ছিল সীমান্তে টহল ও নজরদারি ব্যবস্থা স্থগিত করা৷’’

কিন্তু কাউন্সিল অফ স্টেটের মতে, ফরাসি প্রশাসনের সীমান্তে নজরদারি ন্যায়সঙ্গত৷ 

বিশেষ করে, ২০ জানুয়ারি উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার হাসাকে কারাগারে হামলার পর থেকে আত্নঘাতী সন্ত্রাসী হামলা বৃদ্ধির ঘটে৷ এছাড়া ফ্রান্সে ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর সন্ত্রাসী হামলার সদ্য ঘোষিত রায়ের ঘটনাকেও আমলে নেয়া হয়েছে৷ এছাড়া কোভিড-১৯ এর নতুন নতুন রুপ আসার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্য নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে৷ 


কাউন্সিল অফ স্টেটের মতে, ‘‘একটি হুমকিকে তখনই নতুন হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে যখন এটির রুপ পূর্বের চিহ্নিত হুমকিগুলো থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হয়৷ পাশাপাশি কোনো নতুন ঘটনা যদি সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এর বৈশিষ্ট্যগুলিকে পরিবর্তন করে সেটিকেও ধারাবাহিকভাবে আমলে নেয়ার সুযোগ আছে৷’’

অর্থাৎ, ফরাসি সরকার এখন থেকে আইনগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সম্ভাব্য নতুন হুমকিগুলোকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে আবারও ছয় মাসের জন্য নতুন করে অভ্যন্তরীণ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে পারবে৷ 

‘ইউরোপীয় আইনের সাথে কনসেই দেতার রায় সাংঘর্ষিক’

অভিবাসন সংস্থা আনাফের পরিচালক লউর পোলা এক প্রতিক্রিয়ায় ইনফোমাইগ্রেন্টসকে বলেন, “এই রায়টি আমাদের কাছে বোধগম্য নয় এবং এটি একটি আশ্চর্যজনক সিদ্ধান্ত৷’’

তাদের মতে, চলতি বছরের এপ্রিলের শেষের দিকে ইইউ কোর্ট অফ জাস্টিস (সিজেইইউ) এক রায়ে এই বিধানকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছিল৷ মূলত এই রায় সংস্থা ও এনজিওগুলোকে আশা জাগিয়েছিল

আরও পড়ুন>>বাংলাদেশি সেজে ফ্রান্সে ‘আশ্রয়’, আটক ভারতীয় দম্পতি

সে সময় ইইউ আদালত জানিয়েছিল, ‘‘শেঙ্গেন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রগলো কোন নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে ছয় মাসের জন্য সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পুনরায় প্রবর্তন করতে পারে৷ যদিও এই ব্যবস্থাটি বাড়ানো যেতে পারে, তবে শর্ত হচ্ছে দেশের নিরাপত্তার উপর নতুন কোন হুমকি আসতে হবে যেটি আগেরটির থেকে আলাদা৷’’

লউর পোলা আরও বলেন, “এখানে আমরা এখনও সন্ত্রাসবাদের হুমকি বা স্বাস্থ্য সংকটকে হাইলাইট করে যাচ্ছি। কাউন্সিল অফ স্টেট সরাসরি ইইউ আদালতের বিরোধিতা করছে এবং সরকারের কাজের বৈধতা দিচ্ছে৷’’

কাউন্সিল অফ স্টেটের রায় অবশ্য ফরাসি সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞদেরও অবাক করেছে৷

পড়ুন>>ফ্রান্স: শরণার্থী শিক্ষার্থীরা যে যে বৃত্তি পেতে পারেন

সংবিধান বিশেষজ্ঞ নিকোলা হারভিউ টুইটারে বলেন, “উচ্চ আদালত নিজেকে একটি ‘নতুন হুমকি’ শনাক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে৷ যেখানে ইইউ আদালত পরিস্কার করে নতুন হুমকির তথ্য দাবি করেছিল। ‘কনসেই দেতা’ ইউরোপীয় ইউনিয়ন আইন লঙ্ঘনের জন্য ফ্রান্সকে সম্ভাব্য নিন্দার মুখোমুখি করেছে৷’’

অভিবাসন সংস্থা এবং এনজিওগুলো অবশ্য ইউরোপীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অন্যান্য আইনি পদক্ষেপের কথা বিবেচনা করছে৷


এমএইউ/এফএস




 

অন্যান্য প্রতিবেদন